শিক্ষা ব্যাবস্থায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ যত দ্রুত তত মঙ্গল
লতিফ রানা
প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৯:১২ এএম
# পুরো বেতনসহ এসাইনমেন্ট এর জন্য প্রতিমাসে একশত টাকা করে আদায় করছে : অভিভাবক
# সরকার ঝুঁকি ও ভবিষ্যত এই দুই দিকে লক্ষ্য রেখেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে : রুমন রেজা
# শিক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জীবনের চেয়ে বড় নয় : শিক্ষা অফিসার
# শিক্ষার্থীদের ডিভাইস আসক্তি রোধে অভিভাবকদের নজর দিতে হবে : জেলা প্রশাসক
কোন একটি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য সেখানে পারমাণবিক হামলা কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের প্রয়োজন নেই। সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মাধ্যমেই সেই জাতিকে ধ্বংস করা সম্ভব। আর তাইতো শিক্ষাকে জাতির মেরুদন্ড বলা হয়। আর এই মেরুদন্ডকে সচল এবং সোজা রাখতে যে কোন প্রকারেই হোক না কেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে গতিশীল রাখতেই হবে। এর কোন বিকল্প নেই। তাই শিক্ষার্থী ও অভিভাকরা যে হতাশায় ভূগছেন তার জন্য খুব দ্রুতই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। না হলে একবার তাদের মনোবল ভেঙ্গে পড়লে সেটা পূরণ করা খুবই কষ্টকর এমনকি অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে মনে করেন অভিভাবকসহ সচেতন মহল।
এ বিষয়ে খালেদা পারভীন নামের এক অভিভাবক জানান, আমরা সব সময়ই বলি, শিক্ষার্থীরা দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু বাস্তব অর্থে আমরা এক মুহূর্তের জন্যও দেশের ভবিষ্যতের কথা ভাবছি না। আমাদের আচার-আচরণ, চিন্তা-ভাবনাসহ এ যাবতকালের কর্মকাণ্ডে তা ভালোভাবেই পরিস্ফূট হয়েছে। তা না হলে সকল কিছু খোলা থাকার পর করোনা বিস্তার রোধে আমরা শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেই কেন টার্গেট করছি ? প্রায় দুই বছর হয়ে গেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। এরমধ্যে সপ্তাহে একদিন ক্লাসের সিদ্ধান্ত নিয়ে গত সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস শুরু হলেও নতুন করে আবার বন্ধ ঘোষণা। আসলে কেউ দায়িত্ব নিতে চায় না। সরকার স্কুলগুলোর বিধিনিষেধ ব্যবস্থা শক্তভাবে মনিটরিং করতে পারলে শিক্ষার্থীদের ঝুঁকির মাত্রা অনেকটাই কমে যেত। যে যা-ই বলুক, আমাদের কিছুটা ঝুঁকি কিন্তু নিতেই হবে। একদিন শুধু একশ্রেণির পাঠ্যদান করা হলে একাধিক রুম ব্যবহারসহ নিরাপদ দুরত্ব বজায় রাখাও সম্ভব। এ সময় তিনি অভিযোগ করে বলেন, করোনা মহামারির সময় মানবিক কারণে যেখানে আংশিক বেতন মওকুফ করার কথা। সেখানে স্কুল বন্ধ থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকরা প্রতি মাসের পুরো বেতন তো আদায় করছেনই, সপ্তাহে একটি এসাইনমেন্টের জন্য তাদেরকে প্রতিমাসে আলাদা একশত করে টাকা দিতে হচ্ছে।
হাজীগঞ্জ এলাকার অভিভাবক আলমগীর শেখ বলেন, বিভিন্ন জায়গায় মেলা চলে, পার্ক, রেস্টুরেন্ট বাজার সব কিছু খোলা। সম্মেলন, অভ্যর্থনা, সমাবেশ সব চালু, বন্ধ আছে শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন জরুরী অবস্থায় সরকার যেমন বিশেষ নজরদারীর ব্যবস্থা করে তেমনি শিক্ষাটাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এখানে বিশেষ এবং কঠোর নজরদারীর ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশেষ নিয়মে শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে চালু রাখার পরিকল্পনা করতে হবে। তা নাহলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই শুধু সরকার নয়, সমগ্র জাতি এর মারাত্মক ফলাফল পেতে শুরু করবে। তখন আর কিছু করার থাকবে না। তিনি বলেন, দুধের স্বাধ গোলে মিটানো সম্ভব নয়। সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে অনলাইন ক্লাস কিংবা এসাইনমেন্ট’র কোন প্রকার এমনকি আংশিক তুলনা করাও সমীচিন নয়। তাই স্কুলগুলোর বিধিনিষেধ মনিটরিংয়ের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে।
এবিষয়ে নারায়ণগঞ্জ কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রুমন রেজা বলেন, করোনা মহামারির কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার পর আবারও চালুর ব্যবস্থা করেছিল। এখন সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতির বিবেচনায় বাধ্য হয়েই পুনরায় বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। বাস্তবতা হলো সংক্রমণ বাড়লে শিক্ষার্থীরা ঝুঁকির মুখে পড়বে। সংক্রমণের বিস্তৃতি ঘটিয়ে শিক্ষার্থীরা যেন ক্ষতিগ্রস্থ না হয় এটাও যেমন লক্ষ্য রাখতে হবে তার পাশাপাশি শিক্ষার কার্যক্রমকে গতিশীল করতে হবে। আমার বিশ্বাস সরকার এই দুটো বিষয়কে লক্ষ্য রেখেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এই বিষয়টি অভিভাবক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীসহ সকলকে সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করতে হবে। তিনি বলেন, তবে অনলাইনের ক্লাসের জন্য ঘরে ঘরে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ও লেপটপের প্রতি একটি আসক্তি তৈরি হচ্ছে। অভিভাকরা যেহেতু সার্বক্ষণিক শিক্ষার্থীদের সাথে থাকে তাই এগুলোর ইতিবাচক ব্যবহারের প্রতি তাদেরই লক্ষ্য রাখতে হবে। এই সংকট উত্তোলনে সকলকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। রুমন রেজা বলেন, সরকার ১২ বছরের উর্দ্ধে সকল শিক্ষার্থীদের মাঝে যে টিকা প্রদান কর্মসূচী গ্রহণ করেছেন তা শিক্ষার বিষয়ে একটি বড় অগ্রগতি, বড় সাফল্য। এই কার্যক্রম দ্রুত শেষ করতে পারলে আমি মনে করি পরিস্থিতির অনেক উন্নয়ন হবে। টিকা গ্রহণে শিক্ষার্থীরা স্বতস্ফুর্তভাবে অংশগ্রহণ করছে।
এ বিষয়ে কথা বললে জেলা শিক্ষা অফিসার শরীফুল ইসলাম বলেন, করোনার বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের কি করার আছে। কোভিড মহামারির কারণে প্রায় দুই বছর হয়ে গেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে। এর মধ্যে আমরা যারা শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করছি তারা সকলেই মারাত্মকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। শিক্ষার ভবিষ্যতটা হৃদয়ঙ্গম করে সে বিষয়টা বিবেচনা করে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি দৃষ্টিপাত করেছে। আমরা সকলে অবশ্যই একমত হতে বাধ্য যে, শিক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জীবনের চেয়ে শিক্ষা বড় নয়, আগে জীবন পরে শিক্ষা। তিনি বলেন জীবনের জন্য শিক্ষা, শিক্ষার জন্য জীবন না। এই বিষয়টাকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা সচিবসহ আমরা যারা সংশ্লিষ্ট আছি এই বিশ^াসকে ধারণ করে এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বঙ্গন্ধু ১৯৭১ সালে যেমন বলেছিলেন তোমাদের যার যা কিছু আছে তা নিয়ে বেরিয়ে পড়, ঠিক তেমনি আমরা আমাদের যার যা কিছু আছে তার সব নিয়েই চেষ্টা করেছি। বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে আমাদের সবার উচিৎ দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত রাখা। শিক্ষকরাও অনলাইন প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সচল রাখার চেষ্টা করছেন। আমরা কাজ করতেছি শিক্ষকদের সাথে, তারা কাজ করতেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে। আমাদের উদ্ধর্তন কর্মকর্তাদের নির্দেশ আছে আমরা যেন শিক্ষার্থীদের মানসিক দিকটায় বেশি নজর দেই এবং যত্ন নেই। তারা যেন হতাশ না হয়, সেজন্য বাড়িতে তাদের পড়ালেখার মাত্রাটা বাড়িয়ে দিতে হবে। এসাইনম্যান্ট কার্যক্রমটা জোরদার করার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে আমরা যার যার অবস্থানে থেকে চেষ্টা করেছি এই দুর্দিনে শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতিটা আমরা যেন যতটা সম্ভব পূরণ করতে পারি। ক্ষতিটা যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা যায়। তবে ধারাবাহিক বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাবটা অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে পূরন করা সম্ভব না বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ এর জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ বলেন, এ সময় বাচ্চাদের বাসায় থাকতে হবে লেখাপড়ার সাথে সম্পর্ক রাখতে হবে, নিয়মিত অনলাইন ক্লাসগুলো করতে হবে। মোবাইল ডিভাইস থেকে তাদের দুরে রাখাসহ লেখাপড়ার বিষয়ে বাবা-মায়েদের ঠিকমতো মনিটরিং করতে হবে। তারা যেন মোবাইলে এডিক্টেড না হয়ে যায়। প্রয়োজনে তাদেরকে পর্যাপ্ত পরিমান সময় দিতে হবে। আর সব সময় শিক্ষকদের সাথে সংস্পর্শে থাকতে হবে। বিশেষ ব্যবস্থায় চালু রাখা যায় কি না এটা সরকার সিদ্ধান্ত নিবেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে আমরা সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আমরা বলেছি অভিভাবক ও বাচ্চাদের সাথে যোগাযোগ রাখার জন্য। যেসব বাচ্চারা ক্লাসের (অনলাইনে) সাথে সংযুক্ত না হবে তাদের তালিকা তৈরি করে অভিভাবকদের কাছে জানতে চাইবে যে বাচ্চার কি সমস্যা। বিশেষ করে বালবিবাহ ঠেকানোর জন্য বিশেষ দৃষ্টিপাত দেওয়া এবং তাদের সমস্যাগুলো আমাদেরকে জানালে আমরা তাদেরকে সাহায্য করব।


