শিক্ষার সঙ্কট থেকে সামাজিক অবক্ষয়, বেড়েছে অপরাধ
রাকিবুল ইসলাম
প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৫:৪৭ পিএম
# রাজনৈতিক প্রভাবে দুবৃর্ত্তায়ন
# শিক্ষার্থীরা কিশোর গ্যাংয়ে পরিণত হচ্ছে
এ বছরের শিক্ষাবর্ষে করোনা মহামারির কারণে এবার উৎসব বিহীন শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেয়া হয়। তবে শিক্ষার্থীরা নতুন বই পেলেও বিদ্যালয়ে গিয়ে এখনো পাঠদানে বসতে পারছেন না। জেলা শিক্ষা শাখার তথ্য অনুযায়ী স্কুল কলেজ সহ ২৮২ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭ লক্ষ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ। শিক্ষাবিদদের মতে দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী পড়া থেকে দুরে সরে গেছে।
তার প্রভাভে বিশেষ করে কিশোর বয়সী শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন অপরাধে জরিয়ে পড়ছে। তার মাঝে কিশোর গ্যায়েরর বাহিনী তৈরী করে কিশোর বয়সী শিক্ষার্থীরা চুরি, ছিন্তাই, ডাকাতি, ধর্ষণ, মাদক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এমনকি অনেকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুনের ঘটনায় জড়াচ্ছে। সচেতন মহল মনে করছেন আর্থিক অভারে কারণে অনেক শিক্ষার্থী অপরাধে জড়াচ্ছে। এতে এক দিক দিয়ে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা থেকে ঝরে পরেছে আরেক দিক দিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
তাই শিক্ষাবিদরা মনে করছেন এই সকল অপরাধের মূলে শিক্ষার সঙ্কট ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ। আর এ জন্য ছাত্র ছাত্রীদের পড়া লেখায় মনোযোগী করতে কষ্ট লাগব হবে বলে মনে করেন শিক্ষক সমাজ। শিক্ষায় নানা ধরণের বৈষম্য, বিশৃঙ্খলা, যথেচ্ছ অনৈতিক মুনাফাবাজির কারণে পুরো শিক্ষাকাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে।
প্রাক-প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রত্যেক শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক একটি অনৈতিক প্রতিযোগিতা ও মুনাফাবাজি ও জিম্মিদশায় উপনিত হয়েছে। আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ণের মূল উৎসই হচ্ছে অনৈতিক শিক্ষা কারিকুলাম, বিশৃঙ্খল ও বৈষম্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা এবং নীতিহীন-দলবাজ শিক্ষক সমাজ।
এদিকে সাংস্কৃতিক ব্যক্তি রফিউর রাব্বির ছেলে ও মেধাবী ছাত্র ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছে আগামী মাসের ৯ তারিখ ৯ বছল হতে যাচ্ছে। এই হত্যা মামলার ৯ বছল হলেও এখনো পর্যন্ত প্রশাসন থেকে প্রতিবেদন জমা দেয়া হয় নাই। দীর্ঘ ১০৭ মাস যাবৎ প্রতিবাদ করে ত্বকী হত্যার বিচার চেয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ।
প্রতি মাসে ৮ তারিখ মোমবাতি প্রজ্জ্বলন জালিয়ে মানববন্ধন করে ত্বকী হত্যার বিচারের দাবী জানিয়ে কোন প্রতিকার পাচ্ছে না। এছাড়া আশিক, চঞ্চল হত্যার বিচার পায় নাই। সেই রাজনৈতিক ব্যক্তি মাকসুদের গুম হওয়ার বিষয়ে বিচারে চেয়ে সংবাদ সম্মেলন করবেন বলে জানিয়েছেন জেলার প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধ। তিনি ত্বকী হত্যার বিচারও চান এক সভায় বলেন। কিন্তু তার সংবাদ সম্মেলন কবে হবে তা কেউ জানে না।
খোঁজ নিয়ে জানাযায়, ইদানিং নগরীসহ আশ পাশের এলাকা গুলোতে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি বেড়ে গেছে। এমনকি ছোট ছোট কারনে খুনের ঘটনা পর্যন্ত ঘটছে। ভোর সাড়ে ৫ টার সময় ফতুল্লা লঞ্চঘাট থেকে ইজি বাইক নিয়ে কাশিপুর কাউন্সিলের দিকে দুইজন কন্যাসন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে যাচ্ছিলেন কামাল হোসেন।
কাশিপুর জেলেপাড়া ব্রিজের উপর তাদের ইজি বাইকটি আটক করে ৩ জন্য ব্যক্তি তাদের সাথে থাকা টাকা পয়সা ডাকাতি করে নিয়ে যায়। সিদ্ধিরগঞ্জের ইপিজেড এলাকর একটি গার্মেন্টস থেকে গত রোববার রাতে বাসায় ফিরছিলেন কেয়া (ছদ্মনাম)সহ আরো ৩ জন সহকর্মী। সিদ্ধিরগঞ্জপুলে তাদের ইজি বাইকটি আটক করে বেশ কয়েকজন ছিনতাইকারী।
তারা দেশীয় অস্ত্র দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে মোবাইল ও টাকা ছিনতাই করে নিয়ে যায়। প্রতিদিন রাত ২টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত অভিনব কায়দায় ফতুল্লা, সদর ও সিদ্ধরগঞ্জ থানা এলাকার বিভিন্ন সড়কে চলছে ছিনতাই। ২৮ জানুয়ারি রাতে ফতুল্লা মাসদাইর এলাকায় দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে নিহত কিশোর আমান আলী।
এছাড়া ১৪ জানুয়ারি সিদ্ধিরগঞ্জ এরাকায় ভোরে গাড়ির হেল্পার আকাশকে ঘুম থেকে উঠে গাড়িতে থাকা মালামাল আনলোড করার নির্দেশ দেয় গাড়ির ড্রাইভার টিপু। এক পর্যায় সকালে ঘুম থেকে উঠা নিয়ে গালাগালের ক্ষোভকে কেন্দ্র করে হেল্পার আকাশকে গলাটিপে হত্যা করে মহাসড়কের পাশে ফেলে রেখে দেয় খুনি।
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বিচারহীন হত্যাকান্ড, শিক্ষায় ব্যবস্থা থমকে যাওয়া সহ শহরের প্রতিটি এলাকায় লাগামহীন চুরি, ছিনতাই, সন্ত্রাস, খুন ধর্ষনের ঘটনায় চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় নগরবাসী দলমত নির্বিশেষে নগরীর প্রায় সব মানুষই এই ভয়াবহ অবক্ষয় ও এর পাশবিকতার বিস্তার নিয়ে শঙ্কিত-সংক্ষুব্ধ।
সচেতন মহল মনে করেন বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারনে এই সকল অপরাধ বেড়েছে। ভয়ঙ্কর সব হত্যাকান্ডের ঘটনা জনসমাজে উন্মোচিত হয়ে পড়ার পরও যদি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক পরা এসব দুর্র্ধষ অপরাধীরা কারাগারে-আদালতে বিশেষ মর্যাদা নিয়ে আয়েশে দিন কাটাতে পারে আর নানাভাবে বিচারকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা করে তাহলে তাদের শেঁকড় কতটা মজবুত আর কতটা বিস্তৃত তা সহজেই অনুমেয়।
শত কিশোর গ্যাং ও গ্যাংকালচার গড়ে ওঠার পেছনের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কারণ নিয়ে এখন নানামুখী বিচার-বিশ্লেষণ চলছে। সেখানে বারংবার উঠে আসছে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কথা। সেই সাথে পারিবারিক সঠিক শিক্ষার অভাব রয়েছে বলে মনে করেন সচেতন মহল।
আজকের সামাজিক অস্থিরতা, অবক্ষয়, দুর্নীতি, নারী ও শিশু ধর্ষন, কিশোর গ্যাং কালচার, মাদকাসক্তি, পর্ণগ্রাফির মত সামাজিক-মানবিক সমস্যাগুলোর জন্য সমাজ ব্যবস্থার অবক্ষয় ও ব্যর্থতার কথা বলা হলেও এর উত্তরণের জন্য যদি কোনো সুনির্দিষ্ট সেক্টরের কথা বলা যায়, তা হচ্ছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষানীতি ও শিক্ষাদর্শন।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা, বৈষম্য, দলীয়করণ, মুনাফাবাজি, জাতীয়-সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে লক্ষ্যহীন, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অনৈতিক শিক্ষা কারিকুলাম আমাদের আজকের সর্বব্যাপী অবক্ষয়ের মহামারীর জন্য দায়ী। তবে এর থেকে বের হওয়ার জন্য নানা উপায় খোঁজা হলেও তার জন্য সঠিক নির্দেশনা পাচ্ছে না অভিভাবক মহল।
সচেতন মহলের মতে সামাজিক, পারিবারিক ভাবে সকল অপরাধে মানুষকে সবার আগে সতর্ক হতে হবে । সেই সাথে অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পাশা পাশি সন্তানদের প্রতি অভিভাবকদের সজাগ থাকতে হবে।


