Logo
Logo
×

শিক্ষা

ভিন্ন পেশায় কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকরা

Icon

রাকিবুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৪:৩০ পিএম

ভিন্ন পেশায় কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকরা
Swapno

# সাড়ে সাত হাজার শিক্ষকের অবস্থা করুণ
# কোন সাহায্য-সহযোগিতা পাইনি : এসোসিয়েশন সভাপতি
# সরকারিভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ : রুমন রেজা

 

করোনাকালে দেশের প্রায় ৬০ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধ হয়ে ছিল। এতে সারাদেশে প্রায় এক কোটি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ ছিল। এতে করে অনেক নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের লেখাপড়া প্রায় পুরোপুরি বন্ধ। সেই সাথে অনেক শিক্ষার্থী লেখাপড়া থেকে ঝরে পড়ে যায়। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে সরকার নানা পদক্ষেপ নিলেও কিন্ডারগার্টেন ছাত্র ছাত্রীদের বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেই নাই।

 

তারা অনেকটা শিক্ষাবীহিন সময় অতিবাহিত করেছে করোনা কালীন সময়ে। ফলে এসব স্কুলের শিশুদের ভবিষ্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে আছে। তবে এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা হলেও কিন্ডারগার্টেন বন্ধ থাকায় আগের মত শিক্ষার্থী নেই। এমনকি অনেক কিন্ডার গার্টেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশুরা কোথায় পড়বে তাও তাদের জানা নেই।


শিক্ষাবিদদের সূত্রে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জে প্রায় ৫’শ কিন্ডারগার্টেন রয়েছে। এসব কিন্ডাগার্টেনে কমপক্ষে ১৫ জন শিক্ষক কর্মরত ছিলেন। প্রায় সাড়ে ৭ হাজারের বেশি শিক্ষকের জীবনজীবিকা নির্ভর করতো এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এর মাঝে দুই বছর যাবৎ করোনার ছোবলে শিক্ষা ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে থাকায় জেলার অনেক কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে।

 

নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অলিতে গলিতে গড়ে উঠা প্রায় দুই শতাধিক কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। ওই সকল প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকরা এখন পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় চলে গেছে। আবার অনেকে প্রতিষ্ঠানের ভাড়া এবং শিক্ষকদের বেতন পরিশোধ করতে না পেরে কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধ করে অন্য পেশায় চলে গেছে। তবে যারা টিকে আছে তারা দুর্বিসহ পথ থেকে বের হওয়ার জন্য শিক্ষাবিদদের বিভিন্ন পরামর্শ নিয়েও কাটিয়ে উঠতে পারে নাই প্রতিষ্ঠান গুলো।


খোঁজ নিয়ে জানাযায়, করোনার কারণে গত ২০২০ সনের জেএসসি, পিইসি ও এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। মাধ্যমিকের বার্ষিক পরীক্ষাও নেওয়া হয় নাই। সেই সাথে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে কোন পরীক্ষা নেয়া হয় নাই। এতে কিন্ডারগার্টেন স্কুল গুলোর সমস্যা বেড়ে গেছে।

 

জেলা কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, করোনার কারণে জেলায় অন্তত প্রায় ২ শতাধিক কিন্ডারগার্টেন বন্ধ হয়ে গেছে। এরমধ্যে অনেকে স্কুল বিক্রির নোটিশ দিয়ে বিক্রি করে চেলেগেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অন্তত প্রায় হাজার খানিক শিক্ষক-কর্মচারী পেশা পরিবর্তন করেছেন। অনেকে নানা ধরনের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। আবার অনেকে গ্রামে ফিরে গেছেন।


এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে সদর উপজেলার আলীরটেক এলাকার ইকবাল মোমরিয়াল কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক হারুনুর রশিদ বলেন, করোনার কারনে প্রায় ২০ মাস শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিত বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বেতন পেলেও আমরা কোন বেতন পাই নাই।

 

তার মাঝে আবার আমাদের প্রতিষ্ঠানটি একেবারে বন্ধ করে দেয়া হয়। তখন অনেক দিন অন্য কোন পেশায় কাজ না পেয়ে সর্বশেষ নিরূপায় হয়ে নিজেদের পেশা পরিবর্তন করে এখন ব্যবসা করার চেষ্টা করছি। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে ওয়াল্টনের একটি শোরুম দিয়ে ফ্রিজ সহ বিভিন্ন ইলেট্রিক ব্যবসা মালামাল বিক্রি করে জীবন পরিচালনা করছি।

 

তিনি আরও জানান, আমার এমন অনেক কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকরা নিজেদের পেশা পরিবর্তন করে প্রবাসে চলে গেছেন। আবার কেউ কেউ চাকরী করে কোন রকম জীবিকা নির্বাহ করছে।

 
সদর উপজেলার আফাজ উদ্দিন কিন্ডারগার্টেনের দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বাবা মো. আসাদ বলেন, ‘আমি তেমন পড়ালেখা জানি না, স্ত্রীও জানে না। সেজন্যই ছেলেকে কিন্ডারগার্টেনে দিয়েছি, যাতে ভালো পড়ালেখা শিখতে পারে। কিন্তু স্কুল বন্ধের পর ছেলের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন পড়া লেখা মনোযোগি করে তুলতে অনেক কষ্ট হচ্ছে।


নগরীর স্কলার্স ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের পরিচালক ইমন আহমেদ বলেন, ২০২০ সনের মার্চের পর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আর টিউশন ফি পাইনি। বার্ষিক পরীক্ষার মাধ্যমে স্কুল চাঙ্গা হবে আশা ছিল। কিন্তু তাতেও আমাদের কপালে চিন্তার ভাঝ পড়ে। কেননা বার্ষিক পরীক্ষাও বাতিল ঘোষনা হয়। এতে এ বছর স্কুল না খুলতে না পাড়ায়  এবং শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন দিতে না পেরে সর্বশেষ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই।


শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর টিকে থাকা কিন্ডারগার্টেনর স্কুলগুলো আগের মত ছাত্র-ছাত্রী পাচ্ছে না। শিক্ষাবিদরাও নানা ভাবে এই সংকট থেকে বের হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে সচেতন শিক্ষক মহল মনে করছেন অভিভাবকরা তাদের সন্তানের প্রতি যত্নশিল হলে এই সংকট কাটিয়ে উঠতে বেশি দিন সময় লাগবে না। সেই সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি আর বন্ধ না থাকে তাহলে শিগ্রই শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় মুখি করা যাবে।


এব্যাপারে  নারায়ণগঞ্জ জেলা কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের সভাপতি ফাতেমা বেগম যুগের চিন্তাকে জানান,  ‘আমরা এখন পর্যন্ত কোন সহযোগিতা পাইনি। একবার চাল-ডাল কিছু দেয়া হয়েছিল একটি স্কুলের মাধ্যমে। শিক্ষকরা আত্মসম্মানের জন্য সেখানে যায়নি নেয়ওনি।

 

করোনার প্রকোপের পর এখন অবধি অনেক কিন্ডারগার্টেন বন্ধ হয়ে গিয়েছি। শিক্ষকরা পেশা পরিবর্তন করে ফেলেছেন অনেক। ভাড়ায় চালিত অধিকাংশ কিন্ডারগার্টেনগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছে। জীবন-জীবিকার রক্ষার জন্যই শিক্ষকরা করুণ অবস্থায় পড়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুল ছেড়ে চলে গেছে।


নারায়ণগঞ্জ কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রুমন রেজা যুগের চিন্তাকে বলেন, করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি শিক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তার মাঝে যে সকল শিক্ষক এমপিওভূক্ত না, তারা বেশি দূর্বিসহ জীবন-যাপন করেছে। এখনও করে যাচ্ছে।

 

বিশেষ করে কিন্ডাগার্টেনের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওই সকল প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীরা জীবিকার তাগিদে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হন। কেননা তাদের বেতন বন্ধ থাকায় নিজেদের পরিবার পরিচালনার জন্য কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকরা পেশা ছেড়ে বিভিন্ন পেশায় চলে যান

 

 সরকারের পক্ষ হতে টিকা প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষামুখী করতে হবে। সেই সাথে যে সকল শিক্ষক অন্য পেশায় চলে গেছে তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারিভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ।

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন