Logo
Logo
×

শিক্ষা

শিক্ষা ব্যয় বাড়ায় দিশেহারা অভিভাবক

Icon

আবু সুফিয়ান

প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২২, ০৫:৩৩ পিএম

শিক্ষা ব্যয় বাড়ায় দিশেহারা অভিভাবক
Swapno

 

# ভর্তি বাণিজ্যে প্রতারিত শত শত শিক্ষার্থী
# সরকারের নানামুখী উদ্যোগে নেই সুফল
# প্রতিবছর ঝরে পড়ছে অসংখ্য শিক্ষার্থী

 

নারায়ণগঞ্জে শিক্ষা প্রদান এখন ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এই শহরের বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং শিক্ষকরা এখন ব্যবসার উদ্দেশ্যেই শিক্ষা দিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ অভিভাবকদের। নারায়ণগঞ্জের এই শিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধের দাবিতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আলোচনা সমালোচনা শোনা যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাবলিক এডুকেশনের দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সরকারের উচিত শিক্ষার বাস্তব চিত্র জানার জন্য গবেষণা এবং একাধিক বিকল্প মাধ্যম থেকে শিক্ষার তথ্য সংগ্রহ করা। শিক্ষার জন্য নারায়ণগঞ্জের অভিভাবকদের এক তৃতীয়াংশ ব্যয়ের কারণে তারা এখন দিশেহারা।

 

নারায়ণগঞ্জের সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধারা উপধারার বিচিত্র পাঠদান পদ্ধতি বিদ্যমান। কিন্তু এতে আশা আকাঙ্ক্ষা ও চেতনার প্রতিফলন খুব কমই প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অবৈতনিক হলেও ইংরেজি মাধ্যম স্কুল এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাব্যয় অতি উঁচু। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগেই লক্ষাধিক টাকা ভর্তি ফি নেয়া হয়। মাসিক বেতন নেয়া হয় হাজার হাজার টাকা। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষের পক্ষে ছেলেমেয়ে পড়ানো দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়।

 

সমাজের উচ্চবিত্তরাই নামী-দামি এসব স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেমেয়েদের পড়ানোর সুযোগ পান। বিভিন্ন ধরনের সুবিধা সংবলিত এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুযোগ সীমিত সংখ্যক সুবিধাভোগী ভোগ করে থাকেন। শিক্ষায় সরকারের নানামুখী উদ্যোগ রয়েছে। রয়েছে নানা অর্জনও। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য বছরের শুরুতে বিনামূল্যের বই দেওয়া হয়, মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি-মেধাবৃত্তি, শিক্ষার ভালো পরিবেশের জন্য আধুনিক ভবন, শিক্ষা উপকরণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

 

সরকার শিক্ষার্থীদের পাঠদান, মান উন্নয়ন ও প্রশাসনিক তদারকিসহ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগকে, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার পেছনে বছরে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে। অভিভাবকদের প্রশ্ন, সরকারের এত উদ্যোগ ও এত টাকা ব্যয়ের পরও কেন অভিভাবকদের আয়ের প্রায় অর্ধেক ব্যয় করতে হবে ? নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশুনার মান নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে অভিভাবকদের। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষকস্বল্পতা এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে অনিয়ম নিয়মে পরিণত হওয়া। এতে করে অভিভাবকদের বাধ্য হয়ে ঝুঁকতে হচ্ছে কোচিং সেন্টারের প্রতি।

 

অথচ শ্রেণিকক্ষে সঠিকভাবে পাঠদান করানো হলে প্রাইভেট পড়ানোর প্রয়োজন হতো না। এ অবস্থা বিদ্যমান থাকায় প্রাইভেট পড়ানো এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে নিম্ন এবং নির্দিষ্ট আয়ের অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের শিক্ষার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন, বিপাকে পড়ছেন। এখন কোচিং ছাড়া শিক্ষা গ্রহণ সম্ভব হয় না। এটা এখন শিক্ষার অনুষঙ্গ হয়ে পড়েছে। আর কোচিংয়ের যে খরচ তা শুনলে রীতিমতো মাথা ঘোরানো অবস্থা হয়ে পড়ে। শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় গলদ থাকার কারণেই অভিভাবকদের এত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে বলে মনে করেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।

 

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা বলছে, বর্তমানে প্রায় ৫০ ভাগ শিক্ষার্থী বিভিন্ন স্তরে ঝরে পড়ে। ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ অভিভাবকদের দারিদ্রতা। শিক্ষা ব্যয় কম হলে ঝরে পড়ার হার অনেক কমতো বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। নারায়ণগঞ্জের অভিভাবকরা বলছেন, প্রতিবছরই কাগজের দাম যেমন বেড়েছে তেমনি টিউশন ফি, কোচিং ফি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত ভাড়া-সবই বেড়েছে। কিন্তু অভিভাবকদের আয় তেমন বাড়ছে না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যারা চাকরি করছেন তারা খুব একটা ভালো নেই। বাসা ভাড়াসহ নানা খাতে সংসারের ব্যয় রয়েছে, যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

 

সুখী বেগম নামের একজন অভিভাবক যুগের চিন্তাকে বলেন, সন্তানের শিক্ষা ব্যয় এখন মধ্য আয়ের পরিবারের খরচের অন্যতম প্রধান খাত। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি মোট সংসার খরচের ২০-২৫ শতাংশের মধ্যে থাকলেও শিক্ষার মাধ্যম ও স্তর অনুযায়ী এটি অনেক পরিবারের খাবারের ব্যয়কে ছাড়িয়ে যায়।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক যুগের চিন্তাকে জানিয়েছেন, সন্তানরা আজ ভালো ফল করছে। এর পেছনে অভিভাবকদের শ্রম ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে। সরকারের কি সাফল্য আছে তা মেলানো কষ্টকর। আর শহরের ছাত্রছাত্রীদের সাফল্যের জন্য অনেক দাম দিতে হচ্ছে অভিভাবকদের।

 

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আজিজুল ইসলাম জানান, আমার মাসিক বেতন ৪২ হাজার টাকা। একটি বেসরকারি স্কুলে আমার মেয়ে ৮ম শ্রেণিতে পড়ে। আমাকে স্কুলের মাসিক টিউশন ফি ১৫শ টাকা। প্রাইভেট কোচিং পড়তে খরচ প্রায় ৪ হাজার। স্কুলে আসা যাওয়ার পেছনে ব্যয় ২ হাজার। টিফিন ও অন্যান্য খাত মিলে এক সন্তানের পেছনে প্রতিমাসে খরচ ১২ হাজার। এছাড়া নোট গাইড কিনতে বছরের শুরুতে গুনতে হয়েছে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। ভর্তি ও সেশন চার্জ বাবদ বছরের শুরুতে গুনতে হয়েছে ১২ হাজার টাকা। তিনবার পরীক্ষার ফি’র পেছনে খরচ হয়েছে ২৫শ টাকা। বছরে দুবার ইউনিফরমের পেছনে ব্যয় করতে হয় সাড়ে ৩ হাজার টাকা। এভাবে বছরের শিক্ষায় নানা প্রকারের ব্যয়ে আমি দিশেহারা।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নারায়ণগঞ্জের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক যুগের চিন্তাকে জানিয়েছেন, নিত্যপণ্যের অগ্নিমূল্যে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জীবনযাত্রার অন্যান্য সেবা, খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসার ব্যয়ও। প্রায় সব খাতেই বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়ার মতো আয় বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কমাতে হচ্ছে খাদ্য, বিনোদন ও অন্যান্য চাহিদা।

 

জাতি গঠনের প্রধান উপাদান শিক্ষা। আমাদের সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ের ২৬ থেকে ৪৭ ধারার ভেতরে নাগরিক অধিকারের কথা বিবৃত রয়েছে। শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অধিকার সমভাবে সব নাগরিক লাভ করবে তা স্পষ্ট করে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখছি? সাধারণত শিক্ষার সমান সুযোগ সবাই পাচ্ছে না। বিশেষায়িত ও উচ্চ শিক্ষায় বৈষম্য আরো প্রকট। মোটকথা শিক্ষার আলো থেকে নারায়ণগঞ্জ সহ দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী বঞ্চিত থাকছে। এর কারণ, শিক্ষার অতিরিক্ত ব্যয়। জীবনমানের সাথে সাথে শিক্ষার ব্যয়ও লাগামহীন বেড়েছে। নারায়ণগঞ্জের সাধারণ নাগরিক ও সীমিত আয়ের মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার চাপে এখন দিশাহারা। হতাশায় নিমজ্জিত তাদের জীবন।

এস.এ/জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন