Logo
Logo
×

অর্থ ও বাণিজ্য

চালের মূল্যে চালবাজিতে অতিষ্ঠ জনগণ

Icon

লতিফ রানা

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২২, ০৪:৩৪ পিএম

চালের মূল্যে চালবাজিতে অতিষ্ঠ জনগণ
Swapno

# ৬/৭টি গ্রুপ চালের কৃত্রিম সংকটের মাধ্যমে মূল্য বৃদ্ধি করেছে : চাল ব্যবসায়ী নেতা
# এ মজুদকারীরা চালেরও মালিক আবার তেলেরও মালিক : এড. মাসুম
 

মাছ ও ভাতের সাথে বাঙালির সম্পর্কটা বহুকালের। আর এজন্যই একসময় আমাদের দেশে মাছে ভাতে বাঙালি বলে একটি প্রবাদের প্রচলন ছিল। তবে সেই প্রবাদ থেকে মাছের নামটি হারিয়ে যেতে বসেছে অনেক কাল ধরেই। এখন দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতির রেসে চালের মূল্য যেভাবে উপরের দিকে দৌড়াচ্ছে, তাতে হয়তো বাঙালির সাথে চালের সম্পর্কটাও একদিন হারিয়ে যাবে।

 

বিশেষ করে এই ভরা মৌসুমে যখন চালের দাম অন্যান্য সময়ের তুলনায় কম হওয়ার কথা সে সময় উল্টো চালের দাম বৃদ্ধিটা যে কোন একটা কারসাজি তা বুঝতে কারও বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন হয় না। কিছু মুনাফা লোভী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেট চালের কৃত্রিম মজুদ সংকট তৈরি করে অল্প সময়ে বেশি পরিমান টাকা কামিয়ে নিচ্ছে। এরই মধ্যে সরকারও চালের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে তদন্ত সহ ব্যবস্থা নেওয়ার দিকে মনোনিবেশ করেছেন।

 

এই তৎপরতা যত বেশি বৃদ্ধি পাবে সাধারণ মানুষ ততই উপকৃত হবেন বলে সাধারণ মানুষের ধারণা। সম্প্রতি তেলের তেলেসমাতির পর এবার চালের তেলেসমাতিতে দিশেহারা সাধারণ মানুষের দিশেহারা অবস্থায় জরুরী ব্যবস্থা গ্রহণে এখনি কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে না পারলে খুবই বিপর্যয়ের মুখে পড়বে দরিদ্র, নিম্নবিত্তসহ মধ্যবিত্তের অসহায় পরিবার।


 
গতকাল সরেজমিনে নারায়ণগঞ্জের চালের অন্যতম পাইকারী বাজার নিতাইগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে যে চিত্র পাওয়া যায় তাতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠে যে হাতে গোনা কয়েকটি গ্রুপের কারসাজিতে তেল ও চালের এমন মূল্য বৃদ্ধি ঘটেছে। এর জন্য তাদের অতিমাত্রায় আর্থিক লাভের লোভ এবং তাদের নিজেদের অনেক শক্তিশালী হিসেবে দেখাকেই দায়ী করছেন পাইকারী ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ।

 

এই সময় বিভিন্ন আড়তের মালিক জানান, গত কয়েক সপ্তাহে মিল মালিকরা চালের মূল্য বস্তা প্রতি (৫০কেজি) ৩শত থেকে ৪শত টাকা বৃদ্ধি করেছে। আমরা এখানে সীমিত লাভে চাল বিক্রি করছি। বড় বড় কোম্পানীগুলো যেমন প্রাণ কোম্পানী, এসিআই কোম্পানী, মজুমদার, আকিজ, সিটি, তীর বসুন্ধরা গ্রুপসহ বড় বড় কোম্পানী এখন চালের ব্যবসায় চলে আসে। এরা বাজার থেকে প্রচুর চাল কিনে নিয়ে লাখ লাখ বস্তা চাল মজুদ করে রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। এর ফলে চালের এই ভরা মৌসুমে চালের মূল্য না কমে উল্টো প্রতি ৫০ কেজির বস্তা প্রতি বেড়েছে ৩শত থেকে ৪শত টাকা।

 

এখানকার ব্যবসায়ীরা জানান, তাদের ব্যবসা আগের মতো নেই। কারণ, আগে ২৫শত টাকা বস্তা বিক্রি করলে লাভ হতো ৩০ থেকে ৪০টাকা। এখন সেই চাল তিন হাজার টাকায় বিক্রি করে সেই একই লাভ আসে। এখানকার অনেক ব্যবসায়ী জানান, গতকাল (বুধবার) ম্যাজিস্ট্রেট এসে আমাদের এখানে মূল্য বৃদ্ধিসহ মজুদ সম্পর্কে জেনে গেছেন। আমাদের ক্রয় মূল্যের সাথে বিক্রয় মূল্যের তফাৎ দেখে যাচাই করে গেছেন।


 
এখানে বেশ কয়েকটি দোকানে চালের মূল্য যাচাই করে দেখা যায় মিনিকেট চালের দাম ব্রান্ড অনুযায়ী প্রতি ৫০ কেজির বস্তা ২৯শত টাকা থেকে ৩৪শত টাকা, মোটা স্বর্ণা চাল ২ হাজার টাকা থেকে ২২শত টাকা, লতা চাল ২৫শতা টাকা থেকে ২৭শত টাকা, নাজির শাইল বিক্রি হচ্ছে ৩৩৫০ টাকা থেকে ৩৫শত টাকা, কাটারি ভোগ ৫৮শত টাকা, কাটারী নাজির শাইল ৪ হাজার টাকা বস্তা।

 

তবে ব্যবসায়ীরা জানান, কিছু দিনের মধ্যে লতা, মিনিকেট চালের দাম কমে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। বিশেষ করে সরকারী নজরদারী যদি আরও বৃদ্ধি পায় তাহলে এই দাম কমতে বাধ্য। ব্যবসায়ীরা জানান, মোকামের দামের উপর নির্ভর করবে বাজারে চালের দাম বাড়বে নাকি কমবে। আমরা বেশি দামে কিনলে বেশি দামেই বিক্রি করতে হবে।


 
এই বিষয়ে জানতে চাইলে নিতাইগঞ্জ চাল আড়তদার মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম লিটন বলেন, আমাদের এখানে ১০ হাজার বস্তা চাল মজুদ করারও কারো ক্ষমতা নেই। আমাদের উপর যারা দোষ প্রদান করেন তারা মিথ্যে দোষ প্রদান করেন।

 

এখানে গতকাল জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট এসে কাগজপত্র দেখে গিয়েছে। আমাদের কোন দোষ পায় নাই। এখানে মূল কারণটা হলো ৬/৭ কর্পোরেট সিটি গ্রুপ, তীর, আকিজসহ ৬/৭টি গ্রুপ মিলে চাল মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মূল্য বৃদ্ধি করেছে। ভরা মৌসুমে চালের মূল্য এভাবে বৃদ্ধি পেতে আমার ব্যবসায়ীক জীবনের ৩৫ বছরেও দেখিনি। এখানে আমাদের কোন দোষ নেই। আমাদের বেশি দামে চাল কিনতে হয় বিধায় বেশি দামে বিক্রি করতে হয়।

 

তিনি আরও জানান, আমাদের শতকরা ৬০ ভাগ চাল আসে শেরপুর জেলা থেকে। সেখানকার ওয়াহেদ রাইস মিলের মালিক হায়দার যিনি চেম্বারেরও একজন নেতা, তিনি ঘন্টায় ঘন্টায় চালের দাম বৃদ্ধি করে। চালের মূল্য বৃৃদ্ধির মূল অভিযোগ তার বিরুদ্ধেই। চাপাই নবাবগঞ্জের এরফান গ্রুপ ও সাগর গ্রুপসহ তিনটি গ্রুপ, কুষ্টিয়ায় রশিদসহ যেসব এলাকা থেকে চাল কিনি সেসব এলাকায় বিভিন্ন গ্রুপ সিন্ডিকেট করে চালের মজুদ করে মূল্য বৃদ্ধি করেছে। এরা সেসব এলাকার বাজার থেকে চাল সংগ্রহ করে মজুদ করে রাখে। এবারও তারা প্রচুর পরিমাণ মজুদ করে রেখেছে একই সাথে ৬/৭টা কর্পোরেটও লাখ লাখ বস্তা চাল মজুদ করে রেখে এই সংকট তৈরি করে চালের দাম বৃদ্ধি করছে।


 
এই বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, আমাদের দেশের মানুষ বিভিন্নভাবেই চালের উপর নির্ভরশীল। যে সময় চালের মূল্য কমার কথা সেসময় চালের মূল্য বৃদ্ধির কারণ হলো তেলের ঘটনার পর তাদের আস্কারা পেয়ে যাওয়া। হাতে গোনা কয়েকটি মিল মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিতে পারার কারণে আজকে এই অবস্থা। তারা এখন অনেকটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এই সরকারের কোন লোকের সাথে তাদের কোন লিংক আছে কি না তা দেখার বিষয়। রাজনৈতিক অঙ্গনটাকে প্রধানমন্ত্রী যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন, চালের বাজারটাকেও সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

 

তিনি আরও বলেন, তেল মজুদ করে মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে, চাল মজুদ করে মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। সামনে কোরবানীর ঈদকে কেন্দ্র করে আরও কোন পণ্যের যে মূল্য বৃদ্ধি হবে না এটারও কোন গ্যারান্টি নেই। সেজন্য আগে থেকেই সচেতন হতে হবে। যেখানে সরকার বলেছে ১০টাকা কেজি চাল খাওয়াবে সেখানে চালের এমন নিয়ন্ত্রণহীন দামের বিষয়ে সরকারের লোকজন কি করেছে। এদেরকে খুব গুরুত্ব সহকারে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তিনি বলেন, যেই সিন্ডিকেট চালের মূল্য বৃদ্ধির কারণ, তারাই কিন্তু তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণ। চালেরও মালিক তারা, তেলেরও মালিক তারা। এসব গ্রুপকে ছাড় দেওয়ার মনমানসিকতা থেকে সরকারকে বেড়িয়ে আসতে হবে। না হলে একসময় সরকারও জনগণের চাপে পড়বে।এমই/জেসি
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন