Logo
Logo
×

নগরের বাইরে

অমঙ্গলে দিনগণে মঙ্গলখালীর দুলাল

Icon

মাহবুব আলম প্রিয়

প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২১, ০৪:৫০ পিএম

অমঙ্গলে দিনগণে মঙ্গলখালীর দুলাল
Swapno

মামা সঁই! হুম মামা সঁই!! যে কাউকে মুঠোফোনে কল দিয়ে এমন অবুঝ বাক্যে কথা বলতে চাওয়ার ঘটনা নারায়ণগঞ্জের  রূপগঞ্জে প্রায় নিত্য ঘটনা। তবে কে সেই তরুণ? এমন সন্ধানে নামলে খোঁজ মেলে একটি পরিবারের করুণ অসহায়ত্বের। সেই তরুণের নাম সাইদুর রহমান। বয়স ২০ বছর। জন্ম থেকেই  বুদ্ধি ও  অর্ধবাক প্রতিবন্ধি সে।  মুঠোফোনে কল দিয়ে সঁই শব্দটি ব্যবহার করায় স্থানীয়রা তাকে সঁই বলে ডাকে। সে উপজেলার মুড়াপাড়া ইউনিয়নের মঙ্গলখালীর বাসিন্দা দুলাল মিয়ার একমাত্র ছেলে। তাছাড়া সাইদুরের মা ও বড় বোনও প্রতিবন্ধির তালিকায়।  


সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার  মঙ্গলখালীর পাউবোর খালপাড়ে একটি ঘরে বসবাস করেন দরিদ্র দুলাল মিয়া। তিনি ৩৬ বছর আগে এ গ্রামের ফজলুর রহমানের মেয়ে ফাতেমা বেগমকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে ১ ছেলে ২ মেয়ের জন্ম হয়। বড় মেয়ে সনিয়া(২৪) এবং ছেলে সাইদুর রহমান সঁই(২০) এবং ছোট মেয়ে সাদিয়া (১৪)। তাদের মাঝে সনিয়া ও সাইদুর দুজনেই প্রতিবন্ধি। আর সাদিয়া সহিতুন্নেছা বালিকা বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ছাত্রী।


সনিয়া জন্ম থেকেই মানষিক রোগী। হঠাৎ করে খিঁচুনি হয়ে অজ্ঞান হয়ে যায় সে। এমন করে মাসে ২  থেকে ৫ বার অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। আর এমন পরিস্থিতিতেও সনিয়া মুড়াপাড়াস্থ সহিতুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখা পড়া করে। পরে তাকে বিয়ে দেয়া হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার  নাসিরনগর থানার ভুরিস্বর গ্রামের হারুন মিয়ার সনে। সনিয়ার এমন অসুস্থ্যতার কথা জানতে পেরে শশুড় বাড়ির লোকজন তাকে দুলাল মিয়ার বাড়িতে ফেরত দিয়ে যায়। ৮ বছর ধরে সনিয়ার স্বামী হারুন মিয়া তার সনে যোগাযোগ বন্ধ করে অন্যস্থানে বিয়ে করে সংসার শুরু করে। কিন্তু তাকে তালাক না দিলেও কোন প্রকার ভরন পোষণ কিংবা যোগাযোগ করেনা হারুন মিয়া। এ নিয়ে দরিদ্র দুলাল মিয়া বিচার চাইতে গিয়ে মেয়ের অসহায়ত্বের জন্য সনিয়ার শশুড় বাড়ির লোকজনের কাছে লাঞ্চিত হয়েছেন। মাতাব্বরদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে টাকা খুইয়েছেন কিন্তু মেয়ের বিচার পাননি তিনি। 


তাই বাবার বাড়িতে থেকে বাড়ির কাজ করেই চলে সনিয়ার জীবন যাপন। হঠাৎ একদিন  চুলায় রান্নার সময় খিঁচুনি ওঠে তার । অসাবধানতাবশত সনিয়ার হাত আগুনে পুড়ে যায়। এতে একটি হাতের কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে সে। একদিকে খিচুনি অন্যদিকে হাতে পোড়া।এসব কারনে শুধু সনিয়ার চিকিৎসার জন্য প্রতিমাসে দুলাল মিয়ার ৩ হাজারের অধিক টাকা ব্যয় হয়। 


শুধু তাই নয়, সনিয়ার ছোট ভাই সাইদুর জন্ম থেকেই বাক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধি। সব কথা গুছিয়ে বলতে পারে না। এমনকি নিজের ঠিকানাও। তবে বাটন  মোবাইলে নতুন কোন নাম্বার পেলে কিংবা মনগড়া নাম্বার দিয়ে যে কাউকে দিনে কিংবা রাতে কল দেয় সে। অপরপ্রান্ত থেকে কল রিসিভড করলেই সাইদুর তার অবুঝ কন্ঠে বলে, সঁই! হুম, মামা সঁই!!  এমন কলে দূরের বা নতুন কেউ বিরক্ত হয় বটে। তবে তাকে যারা চিনে তারা আদরের ভাষায় প্রতিউত্তরে ‘হুম মামা সঁই’ বললেই শান্ত হয় সে। অবুঝ এ বালক সকালে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যায় । ফেরে রাতে। সারাদিন আশপাশের কয়েক গ্রামে ঘুরাফেরা করে সে। সে সময় কারো ইচ্ছে হলে কিছু টাকা দিলে গ্রহণ করে সে। তবে সেই টাকা পথের দ্বারে কোন শিশু পেলে তাকে দিয়ে দেয়। শুধু যে শিশুদের তা নয়, পথের ভিক্ষুকদের পুরো টাকা দেয়ার ঘটনায় পরিচিতজনদের কাছে আদরের বালক সে।


এদিকে দরিদ্র দুলাল মিয়া মুড়াপাড়া বাজার এলাকায় বাংলালিংক টাওয়ারে প্রহরী হিসেবে মাত্র ৮ হাজার টাকা বেতনে চাকুরী করেন। আর ঐ বেতন থেকে সনিয়ার জন্য মাসে ৩ হাজার, আবার সাইদুরের জন্য মাসে২ হাজার টাকার ঔষুধ লাগে। আবার তাদের চিকিৎসার জন্য যাতায়াত খরচ, সংসারের খাবার খরচ , ছোট মেয়ে সাদিয়ার লেখা পড়ার খরচ সব মিলিয়ে হিমসিম ও করুণ পরিণতির দিকে দুলাল মিয়ার সংসার। এসব নানা দুশ্চিন্তায় দুলাল মিয়ার স্ত্রী ফাতেমা বেগমের স্ট্রোক হয়। এতে ২০১৫ ইং সন থেকে একপাশ প্যারালাইসিস হয়ে যায়। অনেকটা অচল হয়ে পড়েন তিনি। সব মিলিয়ে একই পরিবারের ৩জনই প্রতিবন্ধি হয়ে পড়েন। তারা  যে বাড়িটিতে বসবাস করছেন তাতে মাত্র ৪ শতক জমি। এর উপর তাদের বসবাস। বিক্রি করতে গেলে ভিক্ষে করা ছাড়া উপায় থাকবে না তার। 


 এসব বিষয়ে কথা হলে দুলাল মিয়া বলেন, বিগত ২৪ বছর ধরে নিজ সন্তান নিয়ে চিকিৎসার পেছনে ঘুরতে হচ্ছে। এতে কোনমতে বেঁচে থাকা। আমার পরিবারে এখন ৩জনই প্রতিবন্ধি। তাদের মাঝে শুধুমাত্র সাইদুরকে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে প্রতিবন্ধি কার্ড করে দেয়া হয়েছে। সে মাসে মাত্র ৪শত টাকা করে পায়। এ টাকায় কি হয় বলেন? দুলাল মিয়া আরো বলেন, বিগত দিনে কোন জনপ্রতিনিধি তার পরিবারের খোঁজ খবর নেননি। আতœীয়দের কাছ থেকে ঋণ করে কোনমতে জীবন যাপন করছি। আমার স্ত্রী চিন্তায় চিন্তায় আজ স্ট্রোক করে প্যারালাইস হয়ে গেছে। আমিও মানুষ। আমার চিন্তার শেষ কি তা জানা নাই।  


সূত্র জানায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জড়িপ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবন্ধির সংখ্যার হার গড়ে ১৫ শতাংশ। তবে সে হিসেবের বাইরে রূপগঞ্জ উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভায় প্রায় ৬ লাখ জনসংখ্যার মাঝে কেবল ৭ শতাংশ প্রতিবন্ধি রয়েছে। এ সংখ্যা ৩০ হাজারের মতো। এদের মাঝে জন্মগত, দূর্ঘটনা কবলিত, শিশু ও অটিজ, সেরিবল পালসি, এএমসি, বাক, দৃষ্টি, শ্রবণ ¯œায়ুবিক ইত্যাদি ধরনের রোগী রয়েছে।


উপজেলার বাগবের এলাকায় অনির্বাণ ডিজেবল চাইল্ড কেয়ার স্কুলের প্রধান শিক্ষক সোহেল রানা বলেন, ২০১০ইং সন থেকে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করছি। তবে উপজেলা পর্যায় তাদের কোন জন্য সরকারীভাবে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা নেই। তাছাড়া শিক্ষা ভাতা ও প্রতিবন্ধিভাতা পর্যাপ্ত নয়। এছাড়াও নানাভাবে অবহেলিত হয়ে আছে এমন বিশেষ চাহিদা সম্পন্নরা। 


এসব বিষয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ নুসরাত জাহান বলেন, প্রতিবন্ধিরা সমাজের বোঝা নয়। তাদের প্রতি সরকারী বেসরকারী নজরদারী থাকলে তাদের পরিবারের লোকজন সাপোর্ট পাবে। সরকার বিধি অনুযায়ী তাদের পাশে আছে। তবে যে পরিবারটির কথা জানলাম। তাদের খোঁজ নেব । সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়াবো। 
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন