পূর্ব থেকেই রাজনৈতিক উত্তাপ আর খুন মতো ঘটনা থাকায় রক্তাক্ত জনপদ হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া ইউনিয়ন। এখানে রাজনৈতিক, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিগত ৩৫ বছরে ৫০টি খুনের ঘটনা রয়েছে। বর্তমানে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতির মতো ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারাও রয়েছেন আতঙ্কে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের নজরদারীর অভাবে চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন রূপগঞ্জের ঐতিহাসিক অঞ্চল মুড়াপাড়ায় ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা।
সূত্র জানায়, এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সবশেষ ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, ল্যাম্পপোস্ট বাড়িয়ে রাতে আলোর ব্যবস্থা করেছে উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসন। তবে সেইসব সিসিটিভি ক্যামেরা এখন বিকল। এখানে ঘুরতে আসা দম্পতি বা কপোত কপোতি হলে স্থানীয় মাদকসেবী ও বখাটের দ্বারা লাঞ্চিতসহ সর্বস্ব খুঁইয়ে নেয়ার ঘটনা রয়েছে অহরহ।
সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, রূপগঞ্জের প্রাচীন জনপদ মুড়াপাড়া ইউনিয়ন। এখানে রয়েছে জমিদার আমলের স্মৃতি বিজরিত নানা স্থাপনা। এসব স্থাপনার অধিনে বিপুল পরিমাণ জমি সরকারী খাস খতিয়ান ভুক্ত। তবে অরক্ষিত। স্থানীয় বখাটে ও মাদকসেবীরা আড্ডা জমায় এসব নির্জন স্থানে। তারা এখানে আসা দর্শনার্থীদের টার্গেট করে হামলা চালায়। খুইয়ে নেয় সব। আবার মুড়াপাড়া বাজার এলাকায় আসা নিরীহদের টাকা পয়সাও ছিনতাই করে তারা। নিরাপদ নয়, রূপগঞ্জ প্রেসক্লাব ভবনও। রাতের আঁধারে ঘরের চালা কেটে কম্পিউটার চুরি করে নিয়ে যায় চোরের দল। পরে পুলিশের তৎপরতায় জড়িত ৩ চোরের ১ জন ধরা খেলেও মালামাল উদ্ধার করতে পারেনি। এমনই এক ঘটনায় উপজেলার মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি এলাকায় ঘুরতে আসা দর্শনার্থীকে জিন্মি করে সব কিছু ছিনিয়ে নিতে চাইলে স্থানীয় লোকজনের কাছে গণধোলাইয়ের শিকার হয় আবুল হাসনাতসহ ৩ বখাটে। পরে ভুক্তভোগী আদালতে মামলা দিলে পুলিশ ওই ছিনতাইকারীদের গ্রেফতার করে আদালতে পাঠায়। আদালত তাদের জেলে আটক রাখে।
এছাড়াও বর্তমানে মুড়াপাড়া সদর গ্রাম ঘিরেই রয়েছে উপজেলা পরিষদ কার্যালয়, উপজেলা প্রশাসনের দাপ্তরিক কার্যালয়,জমিদার জগদিস চন্দ্র ব্যানার্জির বাড়ি,চিনি ও জিনিস বাবুসহ পুরানো জমিদারদের নানা স্থাপনা। রয়েছে ৫শত বছরের পুরানো শাহী মসজিদ। বেসরকারীভাবে গড়ে ওঠা রাসেল পার্ক ও মিনি চিরিয়াখানা জনপ্রিয় বেড়ানোর স্থান। একদিকে শীতলক্ষ্যা পাড়ের এ জনপদে ঐতিহাসিক স্থাপনার অবস্থান অন্যদিকে সরকারী ও রাজনৈতিক দপ্তর থাকায় জেলা ও উপজেলার মানুষদের আনাগোনায় ব্যস্ততম নগরী হিসেবে রয়েছে এর গুরুত্ব। আবার হাট বাজার , কল কারখানার সমানতালে অবস্থান থাকায় জনসমাগম নিত্য হয় এখানে।
গত ২ মাসে বাজারের সুগন্দা বেকারীর সামনে থেকে বাজার করতে আসা যুবকদের ৪টি মোটরসাইকেল চুরির ঘটনা ঘটে। এদের মাঝে গত ২৭ ফেব্রুয়ারী মধূখালী এলাকার মিছির আলীর ছেলে আলভী ও একই গ্রামের শুক্কুর আলী ছেলে দিপুর ২টি মোটরসাইকেল একই দিনে নিয়ে যায় চোরের দল। বাজারের সিসি ক্যামেরা সচল না থাকায় সনাক্ত করা যায়নি চোরদের।
গত ৪ মার্চ বুধবার মধ্যরাতে উপজেলার বানিয়াদি বলাইনগর এলাকার বাসিন্দা নুরমোহাম্মদের ছেলে ইতালি প্রবাসী হাবিব মিয়ার বাড়িতে মধ্যরাতে ডাকাতদল হানা দেয়। এ সময় হাবিব মিয়ার ঘরে প্রবেশ করে বাড়ির লোকজনকে অস্ত্রের মুখে জিন্মি করে ৬ ভড়ি স্বর্ণ ও সাড়ে আট লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে।
মুড়াপাড়ায় ওয়াটা ক্যামিক্যালে কাজ করেন নারী শ্রমিক পিয়ারা। প্রতিদিন মঙ্গলখালীর রাস্তায় হেটে হেটে কর্মস্থলে যান। ফিরেন রাত ৯টার দিকে। মাসিক বেতন পাবার পর মাঝে মাঝে বাড়ি ফেরার সময় ছিনতাইকারীদের খপ্পরে পড়েন। এভাবে ৩ বার টাকা খুইয়েছেন। তবে অন্ধকার থাকায় কাউকে চিহ্নিত করতে পারেন নি। কোথাও অভিযোগও করেননি তিনি। তিনি বলেন ,মুড়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এ সড়কে ২টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছিলো। এসব ৬ মাসের মধ্যেই কে বা কারা চুরি করে নিয়ে যায়।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, মুড়াপাড়া ইউনিয়নের সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, সহিতুন্নেছা বালিকা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় এবং উপজেলা প্রশাসনের কাছাকাছি মোট ৩টি ক্যামেরা সচল রয়েছে। বাকি বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা ১৭টি সিসি ক্যামেরার ৫টির অস্তিত্বই নেই। মঙ্গলখালী এলাকার ক্যানেলপাড়ে খুঁটিসহ চুরি করে নিয়ে গেছে অপরাধী চক্র।
এসব বিষয়ে মুড়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব গোলবক্স ভুঁইয়া বলেন, ৪ বছর পূর্বে ইউনিয়ন পরিষদের অর্থায়নে ২লাখের অধিক টাকা ব্যায়ে ২০টি গুরুত্বপূর্ন পয়েন্টে ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছিলো। এসব ক্যামেরা দেখভাল করার লোক না থাকায় রাতের বেলায় চোরের দল কিছু চুরি করে নিয়েছে। কিছু বজ্রপাতে নষ্ট হয়েছে। কিছু যান্ত্রিক ত্রুটি হয়ে বিকল হয়ে আছে। ফলে সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় পরবর্তি বছর এ খাতে আর বরাদ্দ দেয়া হয়নি।
মুড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা নুর আলম জানান, মুড়াপাড়া ইউনিয়ন এলাকায় বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকের যাতায়াত হয়। এখানে অপরাধী চক্র সক্রিয় থাকে। এসব বিবেচনায় ইউনিয়ন পরিষদের অর্থায়নে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। কিন্তু চোরের দল ওই সিসি ক্যামেরার ল্যাম্পসহ চৃুরি করে নিয়ে যায়। কারা নিয়ে যায় তাও বলতে পারে না পুলিশ।
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসনের প্রায় সব দাপ্তরিক কার্যালয় এখানে থাকলেও সিসি ক্যামেরার জন্য কোন প্রকার বরাদ্দ দেননি তারা। তাদের কার্যালয়ের অভ্যন্তরে সিসিটিভি স্থাপন হলেও আশপাশের সাধারনের চলাচল রাস্তায় নেই সিসিটিভি। ফলে ছিনতাইকারীরা নির্ভিগ্নে অপরাধ করলেও ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে তারা।
ইছাখালী এলাকার বাসিন্দা জিন্নাহ মিয়া বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরা বাড়ালে এসব অপরাধীদের সহজে ধরা যেতো কিন্তু কোন ক্যামেরাই সচল নয়। এসব অপরাধী চক্র ইচ্ছে করেই সব নষ্ট করে দিয়েছে।
এসব বিষয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ নুসরাত জাহান বলেন, বর্তমানে অপরাধ ও অপরাধী সনাক্তে সিসিটিভি ফুটেজ কার্যকরভাবে সুফল পাচ্ছে।এ খাতে বরাদ্দ দেয়ার ব্যবস্থা করবো। ৩ লাখ টাকা বরাদ্দের নিয়ম রয়েছে। এ সময় তিনি আরো বলেন, সিসিটিভি বা ল্যাম্পপোস্ট বাড়িয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্থাপনের পর স্থানীয় জনসাধারনেরও তা দেখভাল করা দরকার। ব্যক্তি উদ্যোগেও ক্যামেরা বাড়ানো প্রয়োজন।


