Logo
Logo
×

নগরের বাইরে

রূপগঞ্জে অস্ত্রের ঝনঝনানি, পুলিশের তৎপরতা কম  

Icon

যুগের চিন্তা অনলাইন

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২১, ০৭:৫৩ পিএম

রূপগঞ্জে অস্ত্রের ঝনঝনানি, পুলিশের তৎপরতা কম  
Swapno

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে জমি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, আবাসনের দৌরাত্ম্যে লালিত দখলবাজদের এমনকি তুচ্ছ ঘটনার বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে দিনদুপুরে দেখা যায় দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়া। এ মহড়ায় তরুণ থেকে শুরু করে বয়স্করাও প্রতিপক্ষের বাড়ি ঘরে হামলা করে ভাংচুর, লুটপাট চালায়। শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক ছত্রছাঁয়ায় কতিপয় নেতা কর্মী এবং চিহ্নিত সন্ত্রাসীমহলও প্রকাশ্যে এমন অস্ত্রের মহড়া চালায়।

এতে দিন দিন কমে যাচ্ছে জনগণের নিরাপত্তা। এসব বিষয়ে রূপগঞ্জ থানা ও আদালতে মামলা হলে অভিযোগ কিংবা এজাহার দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্রের কথা উল্লেখ থাকে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে ওইসব অস্ত্র উদ্ধারে থানা পুলিশের তৎপরতা কম থাকায় জনমনে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
 
সূত্র জানায়, পূর্ব শত্রæতার জেরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের দাউদপুর ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগ সভাপতি আব্দুস সোবহানকে কুপিয়ে জখম করে তার প্রতিপক্ষরা। ১৭ এপ্রিল শনিবার দিবাগত রাতে উপজেলার বেলদী এলাকায় ওই ঘটনায় থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। ওই অভিযোগে লেখা হয়, দেশীয় অস্ত্রসহ প্রতিপক্ষের ৭/৮জন লোক রাম দা, চাইনিজ কুড়াল নিয়ে হামলা চালায়। বাড়ি ঘর লুট করে। এ বিষয়ে মামলা রুজু করা হয়। কিন্তু কোন অস্ত্র উদ্ধার করা হয়নি।
 
১৯ এপ্রিল ভুলতা ইউনিয়নের মাঝিপাড়া গ্রামে আমপাড়াকে কেন্দ্র করে দুই পরিবারের বিরোধের জেরে দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন করে একে অপরের বাড়ি ঘরে হামলা ভাংচুর চালায়। গ্রামবাসির বরাত ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, নারী পুরুষ প্রায় সবার হাতে বড় রাম দা, ছুড়ি, বল্লম। এর সবগুলো অস্ত্রই আইনত অবৈধ।
 
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)‘র অধীনে নির্মানাধীন পরিকল্পিত পূর্বাচল নতুন শহর ঘিরে বিগত দুই যুগ ধরে আশপাশের ইউনিয়নের বিভিন্ন মৌজায় গড়ে ওঠছে আবাসন কোম্পানী। তারা স্থানীয়দের জমি দখলে স্থানীয় সন্ত্রাসী ও প্রভাবশালীদের ব্যবহার করেছেন। আর তাদের ক্ষমতার জানান দিতে জমি মালিকদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করলেই দল বেধে হামলা করে বাড়ি ঘর ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। এ সময় প্রকাশ্যে ওই সন্ত্রাসী বাহীনি দেশীয় অস্ত্র এমনকি আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করে থাকে। শুধু তাই নয়, ঠুসঠাস ককটেল ফাটিয়ে, পিস্তলের রাউন্ড রাউন্ড গুলি ছুড়ে স্থানীয়দের আতঙ্কে রাখে।
 
অস্ত্রগুলো কোথায় রাখা হয় এ বিষয়ে থানা পুলিশের কতিপয় লোকজন জানলেও রহস্যজনকভাবে অভিযান পরিচালনা করে না। এমনকি ওইসব অস্ত্র প্রদর্শণকারী প্রভাবশালীদের কার্যালয়ে রূপগঞ্জ থানার এসআইদের মধ্য থেকে কতিপয় সদস্যরা নিয়মিত আসা যাওয়া করলেও অস্ত্র  উদ্ধারের ঘটনা জানে না এলাকাবাসি।
 
একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, প্রভাব টিকিয়ে রাখতে উঠতি বয়সী তরুণদের হাতে দেয়া হচ্ছে ভয়ঙ্কর সব অস্ত্র। এসব অস্ত্র ব্যবহারে তরুণরাই আগ্রহী বেশি। এমন এক ঘটনায় উপজেলার দাউদপুরের খৈসাইর এলাকায় একটি গার্মেন্টস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাকারী স্থানীয় স্কুল পড়ুয়া তরুণরা আগ্রহবশত দেশীয় অস্ত্র হাতে ফেসবুকে পোস্ট করে। এ নিয়ে এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করে। এ বিষয়টি রূপগঞ্জ থানার অধীনে থাকা ভোলাবো তদন্ত কেন্দ্রের এসআই সানোয়ারসহ অন্যান্য পুলিশকে জানালেও কোন সুরাহা পায়নি এলাকাবাসি। অধরাই থেকে যায় ওই তরুণ ও তাদের দেখানো অস্ত্রগুলো।
 
বলাইখার বাসিন্দা কবি ও সাংবাদিক আলম হোসেন বলেন, সারা বছর ধরেই রূপগঞ্জে অস্থিরতা বিরাজ করে। চুরি, ডাকাতি, খুন-খারাবি আর অস্ত্রের ঝনঝনানির ঘটনা শুনে থাকি। হামলা সংঘর্ষের ঘটনাই বেশি। এতে হতাহতও বেশি। যদিও এজাহারে দেশীয় অস্ত্রের কথা উল্লেখ থাকে, কিন্তু ওই অস্ত্র উদ্ধার করতে বা জব্দ করতে দেখা যায় না। ফলে অস্ত্রগুলো ওই সন্ত্রাসীদের কব্জায়ই থাকে। যা জননিরাপত্তায় চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
 
এ বিষয়ে রূপগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) এইচএম জসিম উদ্দিন বলেন, অভিযোগ ও এজাহারে অনেকেই লিখে অস্ত্র নিয়ে হামলা করে।  ঘটনা তদন্তের পর দেখা যায় ঘরে থাকা ব্যবহৃত দা বটি, লাঠিসোটাই ব্যবহার হয়েছে। তবে বহু ঘটনায়ই বেআইনি অস্ত্রের ব্যবহার হয়। ওইসব অস্ত্র উদ্ধারের জন্য পুলিশ অভিযুক্তের বাড়ি ঘর তল্লাশি করে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে জড়িতদের আইনের আঁওতায় আনা হবে।

এরআগে ২০১৭ সালে রূপগঞ্জ থেকে অস্ত্রের বিশাল মজুত উদ্ধার করে পুলিশ। ২ জুন রূপগঞ্জের পূর্বাচল উপশহর থেকে মজুত করা বিপুল পরিমান আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের তালিকায় ছিল আইএসের ব্যবহৃত ৬২ টি চাইনিজ এসএমজি, ৪২ টি হ্যান্ড গ্রেনেড, ২ টি রকেট লাঞ্চার, ৪৯ টি রকেট লাঞ্চারের প্রজেক্ট, ৬০ টি ম্যাগাজিন, ৫ টি পিস্তল ও ২ টি নন ট্র্যাকার ওয়াকিটকিসহ বিপুল পরিমান গুলি। ১০ জুন নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার অস্ত্র উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। এ ঘটনার প্রায় দেড় মাস পর ২৪ জুলাই পূর্বাচল উপশহরের ৫ নং সেক্টর থেকে আরো ৬ টি এসএমজি উদ্ধার করে রূপগঞ্জ থানা পুলিশ। এরপর এ অঞ্চলে আর অভিযান পরিচালনা করতে দেখা যায়নি।
 
স¤প্রতি কাঞ্চন পৌর আওয়ামী লীগের বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের লোকজন প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে হামলা করার ঘটনা সিসি টিভি ক্যামেরায় ধরা পরে। ওই বিরোধ এখনো নিষ্পত্তি না হওয়ায় কাঞ্চন পৌরসভার সাধারণ লোকজন চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। এ বিষয়ে কাঞ্চন পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম রফিক বলেন, ক্ষমতার দাপট দেখাতে সন্ত্রাসী বাহীনি দিন দুপুরে দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্রসহ হামলা করেছে আমার পৌর কার্যালয়েও। এসব সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়লেও যারা অস্ত্র প্রদর্শন করেছে তা দেখানো অস্ত্রগুলো উদ্ধার করেনি পুলিশ। এতে সাধারণ জনগণ চরম আতঙ্কে রয়েছে।
 
সূত্র জানায়, রাজনৈতিক বিরোধের জেরে উপজেলার ভুলতা গাউছিয়া মার্কেট এলাকায় সবচেয়ে বেশি অস্ত্র নিয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। এখানে পরিবহণ ও ফুটপাত চাঁদাবাজরা তাদের দৌরাত্ম্য রক্ষায় ব্যবহার করে দেশীয় অস্ত্র। সামান্য কথা কাটাকাটি হলেও অস্ত্র নিয়ে হামলা করে তারা। এদের মাঝে চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজও আছে। তাদের অস্ত্রগুলো অধরা থাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। একইভাবে রূপসী, তারাবো, কাঞ্চন. গোলাকান্দাইলে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করে ফাঁকা গুলি করা হয়েছে। সম্প্রতি মুড়াপাড়ায় ছাত্রলীগের লোকজন ছাত্রদলের উপর হামলা করার সময় রূপগঞ্জ প্রেসক্লাবে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করে জনমনে চরম আতঙ্ক তৈরী করে।
 
বিভিন্ন সূত্রে আরো জানা যায়, রূপগঞ্জে সরকারদলীয়, মেয়র, চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ নামে বেনামে বিভিন্ন পরিচয়ে প্রায় ৩ ডজন গ্রæপের অর্ধসহ¯্রাধিক সন্ত্রাসী ব্যবহার করছে আগ্নেয়াস্ত্র। শত শত বৈধ অস্ত্রের মাঝে অবৈধ অস্ত্রের কোন খোঁজ নেই পুলিশের। আবার মিল-কারখানায় চাঁদাবাজি করতে যাওয়া, বাড়ি দখল, ছিঁচকে সন্ত্রাসীদের আগ্নেয়াস্ত্র থেকেও গুলিবর্ষণের খবর পাওয়া যায় প্রায়ই।
 
উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডটি চনপাড়া বস্তিতে রাজধানীর শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আত্মগোপনের নিরাপদ আশ্রয় বলে জানা যায়। ফলে বহিরাগত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের আনাগোনা বেড়ে গেছে সেখানে। বেড়ে গেছে অস্ত্রের ঝনঝনানি।
 
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (এসএসপি ‘গ সার্কেল’) আবির হোসেন বলেন,  এ সার্কেলে আমি নতুন যোগ দিয়েছি। ফলে এখনো সব তথ্য জানা নেই। তবে এজাহারে উল্লেখিত অস্ত্রগুলো উদ্ধারের চেষ্টায় পুলিশ তৎপর আছে। সন্ত্রাসীদের লুকিয়ে রাখা অস্ত্র সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাবে অনেক সময় জব্দ করা যায় না। অস্ত্র উদ্ধারে আরো তৎপর হয়ে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে বলে তিনি জানান।
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন