ফতুল্লার পঞ্চবটি এলাকায় যমুনা ও মেঘনা তেলের ডিপোর অবস্থান। যুগ যুগ ধরে জ্বালানি তেলের এই ডিপুতে সক্রিয় অবস্থানে আছে তেল চোরাদের সিন্ডিকেট। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের একটি প্রভাবশালী পরিবারের প্রয়াত এক সাংসদ পুত্র এই সেক্টর নিয়ন্ত্রণ করছে বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, বর্তমানে তার সিন্ডিকেটে থেকে দেশের এই জ্বালানী সম্পদ বীরদর্পে লোপাট করে বেড়াচ্ছে ফতুল্লার পাভেল ওরফে মির্জা পাভেল, তার ভাই মেজর বাবু, ইকবাল, আফসু, আবু সালাম, রনি ভান্ডারী, জামাই ইব্রাহিম, রাসেল, রানা, মাসুদ, সুমন সালাউদ্দিনসহ আরো অনেকে।
নাকের ডগায় থেকে জ্বালানী তেলের মহোৎসব চললেও অইেশ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে নিরব ভূমিকায় দেকা যায়। এদিকে, সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল এলাকায় অবস্থিত মেঘনা ওয়েল ডিপোতে র্যাব-১১’র সদস্যরা অভিযান চালিয়ে তেল চোর চক্রের একাধিক সদস্যকে গ্রেফতার করলেও র্যাবের অভিযান দেখা যাচ্ছে না ফতুল্লার যমুনা ও মেঘনা ডিপোতে।
এই বিষয়ে গতকাল র্যাব-১১’র অধিনায়ক ল্যাফটেনেন্ট কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলমের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। তাই তার পক্ষ থেকে কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
তবে, নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) জাহিদ পারভেজ চৌধুরী দৈনিক যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নলেজে আছে। সপ্তাহ খানেক আগে সেখানে অভিযান চালিয়ে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার কাছ থেকে ওই তেল চোর সিন্ডিকেটের অন্যান্য সদস্যদের নাম পরিচয় পাওয়া গেছে। তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে আমরা অভিযান চালাবো। তেল চুরি রোধে আমাদের অভিযান চলমান আছে।’
অন্যদিকে, ফতুল্লা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রকিবুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি ফতুল্লা থানায় নতুন এসেছি। এই বিষয়টি আমার জানা ছিলো না। এখন যেহেতু জানতে পারলাম, সেহেতু খোঁজ খবর নিয়ে ব্যবস্থা নেব। অভিযোগ যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে আমি এই টুকু বলতে পারি যে, এখানে তেল চোরদের কোন সিন্ডিকেট থাকতে দেবো না ইনশাআল্লাহ। তবে, নদী পথে যদি তেল চুরি হয়ে থাকে, তাহলে এটি কেরানীগঞ্জ থানা এলাকার অধিনে পরে, সেক্ষেত্রে এই বিষয়টি তাদের দেখার কথা।’
তবে, কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, ডিপোর তেল বুড়িগঙ্গা নদীপথে জাহাজযোগে আনা হয়। আর জ্বালানি তেল পরিবহনের এই প্রথম ধাপ থেকেই শুরু হয় তেল চুরি। আবার ডিপো দুটি থেকে তেল দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহের পথে পথে নানা প্রক্রিয়ায় লোপাট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার জ্বালানী তেল।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ফতুল্লায় জ্বালানি তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তেল চুরির ঘটনা বর্তমানে ওপেন সিক্রেট। বছরের পর বছর চোরাই তেলের এই রমরমা ব্যবসা চালাচ্ছে একটি শক্তিশালী চক্র। এই চক্রের মূল হোতাদের মধ্যে রয়েছে পাভেল ওরফে মির্জা পাভেল। এছাড়া রয়েছে চিহ্নিত তেল চোরা ইকবাল, আবু সালাম, রনি ভান্ডারী, জামাই ইব্রাহিম, রাসেল, সালাউদ্দিনসহ আরো অনেকে। ডিপোর তেল চুরির মধ্যদিয়ে এদের প্রত্যেকে হয়ে উঠেছে অঢেল সম্পদের মালিক। তেল চুরির অপরাধে এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা। মাঝে দু’একবার গ্রেফতার হলেও জামিনে বেড়িয়ে আবারও একই কায়দায় চলতে থাকে তেল চুরি। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় ওই চক্রটি চোরাই তেলের এ ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে।
অভিযোগ রয়েছে, জ্বালানি তেল সরবরাহের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিমাণে কম দেয়ার অভিযোগও রয়েছে। ডিপো থেকে তেল নিয়ে ফিলিং স্টেশনে যাওয়ার পথেও তেল লোপাটের ঘটনা ঘটছে। নদীপথে পরিবহনকালে জাহাজের গোপন খুপরি থেকেও তেল চুরির ঘটনা ঘটে।
বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানায়, নদীপথে বা পরবর্তীতে সরবরাহের সময় ডিএন সড়কের পাশে অবস্থিত বন বিভাগের পার্শ্ববর্তী মাঠে নিয়ে জ্বালানি তেল রিফান করার করা হয়। একাজে মাঠ পর্যায়ের একটি চক্র জড়িত। তাদের অনেকেই ডিপোর কর্মচারী পদে আছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
এদিকে, ফতুল্লার যমুনা ও মেঘনা ডিপোর চোরাই তেল সেক্টরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একাধিকবার তেল চোরা সিন্ডিকেটগুলোর মধ্যে ব্যপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পান থেকে চুন খশলেই শুরু হয় অবৈধ অস্ত্রের মহড়া। এতে আতঙ্কেও মধ্যে দিনাতিপাত করছে স্থানীয় বাসীন্দারা।
জানা গেছে, সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইলের তেলের ডিপোতেও একাধিক তেল চোর সিন্ডিকেট সক্রিয়। র্যাব-১১ ও গোয়েন্দা পুলিশ সেখানে একাধিকবার অভিযান চালালেও তেল চোরাদের নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। জামিনে বেড়িয়ে প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে আবারও শুরু হয় তেল চুরির মহোৎসব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর কিছু অসাধু ব্যক্তিরা এসকল সিন্ডিকেট থেকে মাসোহারা নিয়ে থাকেন বলেও জনশ্রুতি রয়েছে।


