Logo
Logo
×

নগরের বাইরে

আজাদ ডাইংয়ে শ্রমিক নিহত, লাশগুমের গুঞ্জন

Icon

যুগের চিন্তা অনলাইন

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২১, ০৮:৩৪ পিএম

আজাদ ডাইংয়ে শ্রমিক নিহত, লাশগুমের গুঞ্জন
Swapno


# বিস্ফোরিত বয়লার সংলগ্ন দেয়ালের পাশে বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে ছিল শ্রমিক শরীফ


# কেমিক্যালযুক্ত বিষাক্ত পানি চালান করে আজাদ ডাইং
 

প্রতিদিনের মত গত মঙ্গলবার ফতুল্লা বাজার এলাকায় অবস্থিত আজাদ ডাইংয়ে কাজ করছিলেন শ্রমিক শরীফ হোসেন। ঘড়ির কাটায় রাত যখন ৯টা ছুই ছুই, তখনই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয় ডাইংয়ের বয়লার। এতে ক্ষত বিক্ষত হয় শ্রমিক শরীফ হোসেন।


 
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির শ্রমিকরা জানান, ডাইং কর্তৃপক্ষ শরীফকে তাৎক্ষনিক হাসপাতালে না নিয়ে উল্টো ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করেছেন। তাই শেষ সময়ে চিকিৎসা না পাওয়া শ্রমিক শরীফ ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। এমনকি ঘটনা আড়াল করতে লাশগুমের চেষ্টা চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠে ডাইং কর্তৃপক্ষের উপর। জানা গেছে, ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা আসেন। একপর্যায়ে ঘটনাস্থলে ফতুল্লা মডেল থানার পুলিশ এসে দুই দফা তল্লাশি করার পর বিস্ফোরিত বয়লার সংলগ্ন দেয়ালের পাশে বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখতে পায় শ্রমিক শরীফের মরদেহ।


 
ঘটনাস্থলে যাওয়া ফতুল্লা মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) হুমায়ুন-২ দৈনিক যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘ঘটনাস্থলে ফতুল্লা মডেল থানার একাধিক টিম এসেছিলো। কিন্তু বিস্ফোরণের পর ভেতরে বিদ্যুৎ না থাকায় লাশ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে রাত ১০টার পর আমি লাশ কাটা ডোমকে নিয়ে পূনরায় তল্লাশি চালাই। পরে দেখা যায়, বিস্ফোরিত বয়লার সংলগ্ন দেয়ালের পাশে বিধ্বস্ত অবস্থায় পরে আছে শ্রমিক শরীফের ক্ষত বিক্ষত মরদেহ। পরে আমরা লাশ উদ্ধার করি। ময়না তদন্ত হয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘লাশ গুমের কোন বিষয় আমরা দেখিনি। মূলত বিস্ফোরণের পর বিদ্যুৎ না থাকায় লাশটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।’  


 
তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর নিহত শ্রমিকের ছেলে এবং মেয়ের জামাই সহ অন্যান্য আত্মীয় স্বজন এসেছেন। আমরা তাদের মামলা করার জন্য সহায়তা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা কেউই মামলা করতে আগ্রহী না। তারা যদি মামলা করতে না চায়, তাহলেতো আমাদের কিছু করার নেই। শেষ পর্যন্ত একটি অপমৃত্যু মামলা নেয়া হয়েছে। থানা থেকে তারা লাশ বুঝে নিয়েছে। তারা মালিক পক্ষের সাথে মিমাংসা করতে আগ্রহী। এখন কিভাবে বা কোন শর্তে মিমাংসা করেছে, তা আমাদের জানা নেই।’  


 
ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুজ্জামান দৈনিক যুগের চিন্তাকে বলেন, নিহতের স্বজনদের পক্ষ থেকে থানায় কোন অভিযোগ দেয়া হয়নি। আমরা একটি অপমৃত্যু মামলা নিয়েছি। তারা লাশ বুঝে নিয়েছে। আর আপোষ মিমাংসা হয়েছে কিনা, সেটা আমাদের জানা নেই। এই বিষয়গুলো নিহতের স্বজন ও ডাইং কারখানা কর্তৃপক্ষ বলতে পারবেন। এমনটা হতেও পারে যে, যেহেতু একজন শ্রমিক মারা গেছেন, সেহেতু কারখানার মালিক পক্ষ তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সহায়তা করতে পারেন।


 
জানা গেছে, কারখানাটির ভবন মালিক মো. আজাদ। ইতিপূর্বে তিনি ওই কারখানা নিজে পরিচালনা করলেও পরবর্তীতে ডাইং সেকশনটি তিনি ভাড়া দিয়েছেন। বর্তমানে এসটি ডাইং নামে তা পরিচালনা করছেন বুলবুল আহমেদ লিটু, জাহাঙ্গীর মাস্টার ও মো. লিটন দেওয়ান নামে তিন ব্যক্তি। ভাড়া নেওয়া ওই তিনজনই নিহত শ্রমিকের পরিবারকে আর্থিকভাবে ক্ষতিপূরণ দিয়ে মিমাংসা করেছেন। এই বিষয়ে কারখানার মালিক আজাদ এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে আমি ডাইং ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে তা ভাড়া দিয়েছি। বুলবুল আহমেদ লিটু, জাহাঙ্গীর মাস্টার ও মো. লিটন দেওয়ান নামে তিন জন ভাড়া নিয়ে তারা ব্যবসা পরিচালনা করছেন। ওই ব্যবসার সাথে আমার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। আমি ঘটনার রাতে খবর পেয়েছি। অতঃপর জানতে পারলাম যে, নিহত শ্রমিকের পরিবারের কেউ মামলা করবে না। তাই বর্তমানে যারা প্রতিষ্ঠান ভাড়া নিয়ে চালাচ্ছেন, তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন।’ তবে, ডাইংটির বর্তমান ভাড়াটিয়া বুলবুল আহমেদ লিটু, জাহাঙ্গীর মাস্টার ও মো. লিটন দেওয়ানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, আজাদ ডাইং ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। বিশেষ করে, প্রতিষ্ঠানটিতে ইটিপি ব্যবহার ছাড়া ডায়িং পরিচালনা করায় এর দূষিত কালো পানিতে চরম দূর্ভোগে পড়েছেন লালপুরবাসী। গত বছর তৎকালিন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাহিদা বারিক অভিযান চালিয়ে আজাদ ডাইংয়ে এক লাখ টাকা জরিমানা করেন। এরপরও ইটিপি ব্যবহার ছাড়াই ডাইংয়ের পানি পরিশোধন না করে ফেলা হচ্ছে ড্রেনে। তাই বর্তমানেও লালপুরে জলাবদ্ধতার পানির সাথে আজাদ ডাইংয়ের কেমিক্যালযুক্ত বিষাক্ত পানি মিলেমিশে একাকার বলে অভিযোগ করছেন এলাকাবাসী। লালপুর পৌষার পুকুরপাড় এলাকার বাসিন্দারা ওই দূষিত পানি মাড়িয়ে চলাচল করায় নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। তবে, প্রতিষ্ঠানটির ভবন মালিক মো. আজাদ বিষয়টি মানতে নারাজ। তার দাবি, ‘তাদের ইটিপি প্ল্যান্ট সচল আছে এবং তাদের পানি লালপুরের দিকে নির্গত হয় না। তারা ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে বুড়িগঙ্গা নদীতে পানি ফেলেন।’

 

এদিকে, লালপুর পৌষার পুকুরপাড় এলাকার বাসিন্দা মো. হোসেন জানান, ‘ডাইংয়ের পানি ড্রেনের মাধ্যমে লালপুরে ফালানো হচ্ছে। তারা সারাদিনের পানি রিজার্ভ হাউজে জমিয়ে রেখে পরিশোধন ছাড়াই ভোরের দিকে ড্রেনে ছেড়ে দিচ্ছে এবং তা ড্রেনের মাধ্যমে লালপুরের জলাবদ্ধতার সাথে মিশে যাচ্ছে। এই দূষিত পানিতে চলাচল করতে গিয়ে লালপুরের বহুমানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

 


এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন দৈনিক যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘ইটিপি প্ল্যান্ট থাকা সত্তে¡ও যদি তা ব্যবহার না করা হয়, তাহলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। জরিমানা বা প্রতিষ্ঠান সিলগালা করে দেয়ার মতও বিধান রয়েছে। খোঁজ খবর নিয়ে ব্যবস্থা নেব।’  
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন