দেশব্যাপী কঠোর লক ডাউনের কারনে আসছে ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ঈদ পূর্ব মুহুর্তে তেমন কোন ব্যস্ততা নেই বল্লেই চলে স্থানীয় কামার শিল্পীদের মাঝে। তাছাড়া তথ্য প্রযুক্তির এসময়ে বিদেশ থেকে আমদানীকৃত আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের ফলে কৃষি কাজে ব্যবহৃত দেশীয় তৈরি সব পুরাতন উপকরন আর তেমন ব্যবহৃত হচ্ছেনা।
বর্তমানে প্রযুক্তি নির্ভর কৃষিতে লোহায় তৈরি পুরাতন সব উপকরন বিভিন্ন যন্ত্রাশেংর গ্রহন যোগ্যতা এখন আর নেই বললেই চলে। কৃষি উপকরন সহ বিভিন্ন যন্ত্রাশং তৈরিতে জড়িত কামার শিল্পীদের প্রায় সারা বছর মন্দাভাব নিয়ে সংসারের গ্লানি টানতে হয়। তার পরেও প্রতি বছর কোরবানী ঈদ পূর্ব সময় দেড়মাস মহা ব্যস্ত সময় পার করেন কামার শিল্পীরা। কিন্তু এবছর দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। ঈদ পূর্ব সময়ে কাজের চাপ না বাড়ায় হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন কামার শিল্পে জড়িত কামার পরিবারগুলো।
বিগত বছর গুলোতে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে মহাব্যস্ত সময় কাটাতেন কামার শিল্পীরা। দম ফেলবারও যেন ফুরসুরত ছিলনা তাদের। কোরবানীতে পশু জবাই করার জন্য লোহার তৈরি দা, বটি, চাকু, ছুরা, কুড়াল, চাপাতিসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি প্রস্তুত করতে দিনরাত টুং টাং শব্দে মুখরিত ছিল সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন হাট-বাজার। এবছর সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার মোগরাপাড়া চৌরাস্তা, কাইকারটেক, কাঁচপুর, মেঘনাঘাট, মঙ্গলেরগাঁও, বারদী ও আন্দবাজারসহ উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে স্থানীয় পেশাদারি কামার শিল্পীদের মাঝে নেই কোন কর্মব্যস্ততা। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার অল্প পরিসরে দা, বটি, চাকু, ছুরা, কুড়াল, চাপাতিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরি করছেন কামার শিল্পীরা। একটা সময় ছিল কামার শিল্পীদের লোহার তৈরি এসব ব্যবহার্য জিনিস স্থানীয় চাহিদা মিটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্নস্থান থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ীরা অগ্রিম অর্ডার দিয়ে কিনে নিয়ে যেত।
কামাররা স্থানীয় বাজার থেকে পুরাতন লোহা কিনে সেগুলো আগুনে পুড়িয়ে দা, বটি, চাকু, ছুরা, কুড়াল, চাপাতিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করতেন। বর্তমান আধুনিক যন্ত্রাংশের প্রভাবে কামার শিল্পের বছরজুড়ে দুর্দিন চললেও পবিত্র ঈদুল আযাহার সময় তাদের কর্মব্যস্ততা অনেকটা বেড়ে যেত। পাশিপাশি সারা বছরের মন্দা কাটিয়ে ঈদ পূর্ব সময়ে অনেক আয় রোজগার হত। সেই আয় রোজগার দিয়ে সারা বছর কামার শিল্পীদের সংসার চলত। স্থানীয় কামার শিল্পী বাসুদেব কর্মকার জানান, এক সময় কামারদের যথেষ্ট চাহিদা ও কদর ছিল, বর্তমানে তা আর নেই। মেশিনের সাহায্যে বর্তমানে আধুনিক যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে। যার ফলে আমাদের তৈরি যন্ত্রপাতির প্রতি মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে, হয়তো বা একসময় এই পেশা আর থাকবেনা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
তবে কোরবানির ঈদের সময় আমরা একটু আশাবাদী হই। কিন্তু এবছর করোনা মহামারী ও লক ডাউনের কারনে কাজের তেমন চাপ নেই। আয় রোজগারের কোন উপায় দেখছিনা। সারা বছরই সংসার অভাবে চলে। কি করে যে সংসার চলবে তা ভেবে হতাশায় দিন কাটাচ্ছি। বাসুদেব কামার আরো বলেন, বংশ পরমপরায় বাপ, দাদার কালের এই পেশার সঙ্গে জড়িত আছি প্রায় ৪৮ বছর ধরে। আমার লেখাপড়া জানা ছিলনা, সেই জন্য অন্য কোন কাজে যেতে পারিনাই।
তবে আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই কাজ করে আসছে, তাই বংশ পরমপরায় আমাকেও বাধ্য হয়েই এই কাজ করতে হচ্ছে। সারাবছর তেমন কোন কাজ না থাকলেও কোরবানির সময় আমাদের কাজের চাহিদা অনেক গুন বেড়ে যেত। কিন্তু এবছর করোনার কারনে কাজের কোন অর্ডার নেই। বোসুদেব কর্মকারের স্ত্রী সবিতা রানী বলেন, কবিতা, সর্মীলা, উর্মীলা তিন মেয়েসহ আমাদের পাঁচ সদস্যের সংসার। সারা বছর তেমন কোন কাজ থাকেনা বলে অভাবেই চলে, কিন্তু কোরবানী ঈদের আগে কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায়। আমার স্বামী একা মানুষ, সংসারে ছেলে না থাকায় অভাবের সংসারে স্বামীর সঙ্গে আমাকেও কাজ করতে হয়।
এব্যাপারে লোহায় তৈরি বিভিন্ন যন্ত্রাংশ বিক্রেতা কামার শিল্পীরা বলেন, এই পেশায় আমরা যারা আছি তারা খুবই অবহেলিত। বর্তমান বাজার মূল্যের যে উর্ধগতি সব জিনিসের দাম বেশি হওয়াতে সে অনুযায়ী আমরা আমাদের কাজের ন্যায্য মূল্য পাইনা। এই পেশায় থেকে সংসার চালাতে খুবই কষ্ট হয়। কামার শিল্পীরা মনে করেন সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ও কোন আর্থিক সহযোগিতা না পেলে হয়তো এ শিল্প অচিরেই একদিন হারিয়ে যাবে।


