Logo
Logo
×

নগরের বাইরে

প্রসঙ্গ : বন্দর সাধারণ পাঠাগার

Icon

করীম রেজা

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২১, ১০:২৫ পিএম

প্রসঙ্গ : বন্দর সাধারণ পাঠাগার
Swapno

সংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান বন্দর সাধারণ পাঠাগার। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইতিহাস তৈরি করেছে। বিবিসি, ভোআ  প্রভৃতি সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম ছিল সাধারণ পাঠাগার, বন্দর। অনেক চড়াই-উৎরাই পার হয়ে টিকে আছে, সীমিত কার্যক্রম নিয়ে হলেও। পত্রিকায় ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কমবেশি অতীত কার্যক্রম ও নামজাদা কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ যারা সাধারণ পাঠাগারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন, তাদের নাতিদীর্ঘ বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে।

 

সম্প্রতি নাসিকের উন্নয়ন কর্মসূচিতে ভবনটি ৭ তলা করার ব্যবস্থা হয়েছে। পাঠাগারের নিজস্ব সম্পত্তি হতে জমির অংশবিশেষ এর আগে নাসিককে  দেয়া হয়েছে, তাতে বহুতল মাতৃসদন ভবন শোভা পাচ্ছে। এ পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। গোল বেঁধেছে এককভাবে নাসিক তথা স্থানীয় কাউন্সিলরের দ্বারা নির্মিতব্য ভবনের নতুন নাম “কাউন্সিলর ভবন” সম্বলিত ব্যানার দিয়ে সাধারণ পাঠাগার নাম মুছে ফেলার আয়োজনে। বন্দর, শাহী মসজিদ বাড়ি ঠিকানায় অত্র প্রতিষ্ঠান সরকারি দপ্তরে “ জনকল্যাণ সমিতি ও সাধারণ পাঠাগার ” নামে  রেজিষ্ট্রি করা আছে। কিন্ত সর্বত্র পরিচিত সাধারণ পাঠাগার হিসেবেই।

 

যতদূর জানা যায়, সরকারি সুবিধাপ্রাপ্তি সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যে এবং  রেজিষ্ট্রি করার অন্যতম শর্ত নামের সঙ্গে  ‘ জনকল্যাণ ’ শব্দ অবশ্য থাকতে হবে, বিধায় এই রকম নাম।  প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী সাইনবোর্ডেও দেখা যায় সাধারণ পাঠাগার শব্দবন্ধ অন্যান্য শব্দের তুলনায় অনেক বড় হরফে লেখা। কল্যাণের উদ্দেশ্যে হলেও এই জনকল্যাণই পাঠাগারের জন্য অকল্যাণের কারণ হয়েছে। পাঠাগার কার্যক্রম মূলভবন থেকে স্থানান্তরিত হয়েছে। সেখানে চালু হয়েছে বহুমুত্র সমিতি।

 

ভবন সামনের খোলা জায়গা এবং বাগান অংশ সংকুচিত হয়েছে। নতুন ৭ তলা ভবন নির্মানের সংবাদ বড় সম্ভাবনা ও আশাবাদের সৃষ্টি করেছে। হতাশা তৈরি হয়েছে, পাঠাগার কেন্দ্রিক অনাকাংক্ষিত রাজনীতির পায়তারায়। একজন স্থানীয় কাউন্সিলরের অফিসের জন্য একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের নাম নিশানা মুছে ফেলার প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন কোনও শুভ উদ্যোগের ইঙ্গিত নয়। তাছাড়া একটি পাঠাগার চত্বরে রাজনৈতিক দপ্তর স্থাপন করে সংস্কৃতির মঙ্গল কতখানি হবে তা ভাবতে হবে।

 


নারায়ণগঞ্জ শহরে আলী আহমদ চুনকা পাঠাগার ছিল অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী। সংস্কৃতি চর্চা, প্রসারের কেন্দ্র। অসংখ্য পাঠকের প্রধান আকর্ষণ। বর্তমানে সুদৃশ্য ভবনের আড়ালে তার অধিকাংশই অন্তর্হিত। পাঠাগার আরও অধিক উচ্চতায় গিয়ে সাধারণ পাঠকের ধরাছোঁয়ার বাইরে। একটি আধুনিক হলরুমের আসন ব্যবস্থা অপরিকল্পিত, ব্যবহার অযোগ্য। এইসব তিক্ত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে সাধারণ পাঠাগার নতুন ভবন নির্মাণ নিয়ে সংস্কৃতিজন তথা জনমনে নানাবিধ প্রশ্ন জেগেছে।  

 

পাঠাগারের নতুন ভবন নির্মাণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিচের বিষয়গুলো বিবেচনাযোগ্য: ১. কোনওভাবেই ভবনের নাম পরিবর্তন করা সমীচিন নয়। ঐতিহ্য ও স্থানীয় মানুষের আকাঙ্খার প্রতি সম্মান দেখিয়ে বরং সাধারণ পাঠাগার ভবন নামকরণ প্রস্তাব করা যায়। ২. ভবনের জমি যদি পাঠাগারের নিজস্ব হয়, নাসিক অনুদান বা উন্নয়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিতেই পারে। পাঠাগার কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব বাকি সব বাস্তবায়ন করা। কিন্তু যদি দুই পক্ষের ভিন্ন কোনও চুক্তি হয়ে থাকে তাহলে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা দরকার। কেননা পাঠাগার পরিচালনা পর্ষদ কোনও স্থায়ী প্রতিষ্ঠান নয়, নির্র্দিষ্ট সময়ান্তরে পরিবর্তনযোগ্য। তাই পাঠাগার ব্যবহারকারী সদস্য এবং জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাঞ্ছনীয় ।

 

৩. ভবন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব শুধু পাঠাগার কমিটি  এককভাবে বা নাসিকের সঙ্গে যৌথভাবে করতে পারে। স্থানীয় কাউন্সিলরের একাধিপত্যে স্বেচ্ছাচারিতা অসম্ভব নয়। শুরুতেই কিছু অসহিষ্ণুতা পীড়াদায়ক। ৪.  ভবনের নীচ তলা( গ্রাউন্ড ফ্লোর)  অবশ্যই বাগান ও পার্কিংয়ের জন্য উন্মুক্ত রাখা দরকার। ব্যস্ত সড়কের পাশে যানবাহন চলাচলে যাতে বিঘœ না ঘটে। পাঠাগারের আয়ের উদ্দেশ্যে দুই কোনায় হয়ত বা দুটো দোকান ঘর বরাদ্দ দেয়া যেতে পারে। ৫.  ২৭/৭/২১ তারিখের দৈনিক যুগের চিন্তায় প্রকাশিত খবরে জানা যায় যে, বর্তমান নাসিক কউন্সিলর ৩ তলায় পাঠাগার করে দিবেন বলে জানিয়েছেন। কাউন্সিলরের পাঠাগার করে দেবার বিষয়টি অতি আত্মবিশ্বাস না অন্য কিছু, পরিস্কার নয়। তবে তা মূল পরিকল্পনায় তা থাকা উচিত।

 


৬.  ভবন ব্যবহারের জন্য দুটো  আলাদা সিঁড়ির নকশা থাকা দরকার । পাঠাগারের জন্য একটি আলাদা সিঁড়ি। নীচের দিকের দুটো  ফ্লোর অর্থাৎ ২ ও ৩ তলা পাঠাগারের জন্য নির্দিষ্ট করলে পাঠকের চলাচল নির্বিঘ্নে হবে। অন্যদিকে আরেকটি সিঁড়ি ভবনের বাকি অংশ ব্যবহারের জন্য। যেখানে কাউন্সিলরের অফিস ও অন্যান্য কাজের দপ্তর থাকবে। কাউন্সিলর অফিস হলে সেখানে দিনরাত ব্যাপক জনসমাগম হবে। পাঠাগার, ডায়াবেটিক চিকিৎসার কাজ এবং পার্শ্ববর্তী হাসপাতালের কাজে যাতে ব্যঘাত না হয়, তেমনভাবে পরিকল্পনা করা উচিত। ৭.  পত্রিকার খবরে আরও জানা গেল যে, কাউন্সিলরের লোকজন প্রভাব খাটিয়ে পাঠাগারকে কেরাম খেলা, টিভি ইত্যাদি দিয়ে নিছক বিনোদনের জায়গায় রূপান্তর করেছেন, যা অত্যন্ত আপত্তিকর। অনতিবিলম্বে তা বন্ধ হওয়া উচিত।

 

৮.  কাউন্সিলর যখন নিজের ইচ্ছেয় প্রতিষ্ঠানের কমিটি(পত্রিকা দ্রষ্টব্য) তৈরি করেন তা অবশ্যই অগ্রহণযোগ্য, একটি নিবন্ধনকৃত প্রতিষ্ঠানে কাউন্সিলরের যথেচ্ছাচার মেনে নেয়া সুস্থ পরিবেশের নিশ্চয়তা দেয় না। ৯.  পত্রিকার খবর থেকে আরও জানা যায় যে, পাঠাগারের  দেয়া জমিতে নির্মিত মাতৃসদন ভবনে ডায়াবেটিক সমিতির জন্য জায়গা দেয়ার কথা থাকলেও, নাসিক তা দেয়নি। যদি তাই হয় তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক।  নাসিক কোনও বেনিয়া সংগঠন নয়, জনগণের সেবা ও কল্যাণ ব্যবস্থা ও তা নিশ্চিত করাই নাসিকের কাজ। তা করছেও। সামান্য কিছু ঘটনা ব্যাপক শুভকাজের ফলাফল অর্থহীন করে দিতে পারে। এবারও যাতে পাঠাগার ভবন নির্মাণের পর মাতৃসদনের মত ঘটনা না ঘটে তার জন্য সব কিছুই বোধ করি নাসিক ও পাঠাগার কমিটির মধ্যে লিখিত হলে ভাল হবে।  সব ভাল তার, শেষ ভাল যার, মাননীয় মেয়র বরাবর আরজি পেশ করা হয়েছে, তিনি অবশ্যই সদ্বিবেচনা দ্বারা পরিচালিত হবেন, এমন সুনাম তাঁর রয়েছে।

করীম রেজা, সাবেক অধ্যক্ষ, কবি, কলাম লেখক।

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন