সংস্কৃতি চর্চার ধারা অতিমারীর আগেই প্রায় স্তিমিত। কোভিড ১৯ আরেক ঘা দিয়ে স্থবির কওে দিয়েছে। আলোচনায় এসছে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান বন্দর সাধারণ পাঠাগার। ঐতিহ্যবাহী, ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়ে টিকে আছে, সীমিত কার্যক্রম নিয়ে হলেও। নবগঠিত কমিটি দায়িত্ব নিয়ে প্রথমেই নিয়োগপ্রাপ্ত লাইব্রেরিয়ানকে কোনও কারণ ছাড়াই বরখাস্ত করে। পাঠাগার অভ্যন্তরে ক্যারাম বোর্ড ও টিভি বসিয়ে বিনোদন কেন্দ্র চালু করে।সম্প্রতি নাসিক ভবনটি ৭ তলা করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাঠাগারের নিজস্ব সম্পত্তি হতে জমির অংশবিশেষ এর আগে নাসিককে দেয়া হয়েছে, বহুতল মাতৃসদন ভবন নির্মাণের জন্য।
এখন জানা গেল পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবর থেকে যে, এককভাবে নাসিক তথা স্থানীয় কাউন্সিলর নির্মিতব্য ভবনের নাম “কাউন্সিলর ভবন” সম্বলিত ব্যানার টানিয়েছে। বন্দর, শাহী মসজিদ বাড়ি ঠিকানায় অত্র প্রতিষ্ঠান সরকারি দপ্তরে “ জনকল্যাণ সমিতি ও সাধারণ পাঠাগার ” নামে রেজিস্ট্রি করা আছে। কিন্ত সর্বত্র পরিচিত সাধারণ পাঠাগার হিসেবেই। যতদূর জানা যায়, সরকারি সুবিধা প্রাপ্তি সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যে ‘ জনকল্যাণ ’ শব্দ যুক্ত করে নিবন্ধন করা হয়। এই জনকল্যাণই এখন পাঠাগারের অকল্যাণের কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
পূর্বেও কমিটি পাঠাগার কার্যক্রম মূল ভবন থেকে সরিয়ে নিয়ে সেখানে বহুমুত্র সমিতি কার্যক্রম চালু করেছে। ভবন সামনের খোলা জায়গা এবং বাগান নিশ্চিহ্ন হয়েছে। ৭ তলা ভবন নির্মাণের সংবাদ বড়ই আনন্দেও বটে। কিন্তু পাঠাগার কেন্দ্রিক এক ধরণের রাজনীতি হতাশা তৈরি করেছে । একজন স্থানীয় কাউন্সিলরের অফিসের জন্য একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের নাম নিশানা মুছে ফেলার আয়োজন অশুভ উদ্যোগের ইঙ্গিত। তাছাড়া একটি পাঠাগার চত্বরে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক দপ্তর স্থাপন করে সংস্কৃতির চর্চার প্রসার ঘটানোর ধারণা সাংঘর্ষিক। বন্দর সাধারণ পাঠাগারের খুব কাছেই সোনকান্দা পৌর মার্কেটের ৪ তলায় একটি পাঠাগার আছে। যোগোযোগ মাধ্যমে সাইফুল ইসলাম আক্ষেপ করে লিখেছেন, “সিটি কর্পোরেশনের হস্তক্ষেপে/তত্ত্বাবধানে আমাদের সোনাকান্দা সাধারণ পাঠাগার পরে সোনাকান্দা পৌর পাঠাগারটি এখন সিটি কর্পোরেশন মার্কেটের চার তলায় অবস্থিত। আমাদের অত্র এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে ১০ জনেও বিষয়টি জানে কিনা সন্দেহ।”
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ শহরে ঐতিহাসিক আলী আহমদ চুনকা পাঠাগার সংস্কৃতি চর্চা, প্রসারের কেন্দ্র স্থল ছিল। অসংখ্য পাঠকের প্রধান নির্ভরতার স্থানও। বর্তমানে সুদৃশ্য ভবনের আড়ালে তার কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না। পাঠাগার আরও অধিক উচ্চতায় গিয়ে সাধারণ পাঠকের ধরাছোঁয়ার বাইরে। সেখানে একটি অত্যাধুনিক হলরুমের আসন ব্যবস্থা অপরিকল্পিত, ব্যবহার অনুপযোগী। এইসব তিক্ত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে সাধারণ পাঠাগার নতুন ভবন নির্মাণ আশার চেয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ায়। পাঠাগারের নতুন ভবন নির্মাণে নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়েছে কিনা জানা যায় না। কারণ সংশ্লিষ্ট কারো কারো কাছেই কোনও নকশা বা কাগজপত্র নাই। সবকিছুই এককভাবে স্থানীয় কাউন্সিলরের অধিকারে। ঐতিহ্য ও স্থানীয় মানুষের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সাধারণ পাঠাগার ভবনের নাম পরিবর্তন করা অনুচিত। তাছাড়া ভবনের জমি যদি পাঠাগারের নিজস্ব হয়, নাসিকের বরাদ্দকৃত অনুদানে পাঠাগার কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা।
পাশাপাশি দুই পক্ষের সমঝোতা চুক্তি জনগণ তথা সাধারণ সদস্যদের জানানো দরকার। কেননা পাঠাগার পরিচালনা পর্ষদ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচিত হয় মাত্র। তাই পাঠাগার ব্যবহারকারী সদস্য এবং জনগনের মতামতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাঞ্ছনীয় । ভবন নির্মাণ এবং পরবর্তীকালে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে একটি যৌথ কমিটি গঠন করা যায়। কেবল স্থানীয় কাউন্সিলরের হাতে একক কর্তৃত্ব দেয়া ঠিক হবে না। নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরুর প্রাক্কালেই তার স্বেচ্ছাচারিতা স্থানীয় জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ভবনের নীচ তলা( গ্রাউন্ড ফ্লোর) অবশ্যই বাগান ও পার্কিংয়ের জন্য উন্মুক্ত রাখা দরকার।
২৭/৭/২১ তারিখের দৈনিক যুগের চিন্তায় প্রকাশিত খবরে জানা যায় যে, বর্তমান নাসিক কউন্সিলর ৩ তলায় পাঠাগার করে দিবেন বলে জানিয়েছেন। কোন ক্ষমতাবলে তিনি এমন উক্তি করেন, যা তার নিজ এখতিয়ারের বাইরে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন। যদি এখানে কাউন্সিলর ভবন করতেই হয়, তবে ভবন ব্যবহারের জন্য দরকার দুটো আলাদা সিঁড়ি । একটি পাঠাগারের অন্য সিঁড়ি ভবনের বাকি অংশ ব্যবহারের জন্য। মনে রাখা যেতে পারে যে কাউন্সিলর অফিস স্থাপন হলে সেখানে দিনরাত ব্যাপক জনসমাগম হবে।
ফলে পাঠাগার, ডায়াবেটিক চিকিৎসা কার্যক্রম এবং পার্শ্ববর্তী মাতৃসদন কেন্দ্রের কাজে বিশেষ ব্যাঘাতের সমূহ সম্ভাবনা। পরিকল্পনায় এইসব অতি সংবেদনশীল বিষয়সমূহ জনস্বার্থের খাতিরে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে সমাধান করা উচিত। পাঠাগার ভবনে কেরম খেলা, টিভি ইত্যাদি বন্ধ করে অনতিবিলম্বে পাঠাগার কার্যক্রম চালু করা উচিত। পত্রিকার খবর থেকে আরও জানা যায় যে, পাঠাগার প্রদত্ত জমিতে প্রতিষ্ঠিত মাতৃসদন ভবনে ডায়াবেটিক সমিতির স্থান দেয়ার কথা থাকলেও, নাসিক নাকি তা দেয়নি। বহুমুত্র সমিতি স্থানান্তরিত হলে পাঠাগার তার আগের অবয়ব বা জৌলুস কিছু হলেও পুনরুদ্ধার করতে পারত, তা না হওয়া অতীব লজ্জা ও দুঃখের বটে। নাসিক কোনও ব্যবসায়ী নয়, জনসেবাদায়ক প্রতিষ্ঠান। নাসিক জনসুবিধায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে তা করছেও।
সাধারণ পাঠাগার কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে মেয়র বরাবরে দরখাস্ত করা হয়েছে। নিশ্চয় তিনি সব কিছু বিস্তারিত জেনে সঠিক সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ দেবেন। নাসিকের কাউন্সিলর বা কর্মকর্তা সকলের সব রকম কাজের দায় শেষপর্যন্ত মেয়রের নামের উপরেই বর্তায়। আশা করা যায় মেয়র বরাবরের মতই তার সুবিবেচনার দ্বারা উদ্ভূত সমস্যার কার্যকর গ্রহনযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করতে সমর্থ হবেন। জনগণের সমর্থন তাঁর রয়েছে। করীম রেজা, সাবেক অধ্যক্ষ, কবি,কলাম লেখক।


