বন্দরের টিকা দান কর্মসূচীতে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২১, ০৯:২২ পিএম
বন্দরে ব্যাপক হট্টগোল, হৈচৈ ও অসন্তুষ্টির মধ্য দিয়ে শেষ হলো নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) এর তিনদিনের গণটিকা প্রদানের তৃতীয় ও শেষ দিনের কর্মসূচী। মূলত টিকা প্রদানের সংখ্যার তুলনায় কয়েকগুণ বেশী লোকজনের উপস্থিতি, আজকে টিকা দিতে না পারলে পরে আবার দেয়া যাবে কিনা এ নিয়ে সন্দেহ এবং সবায়ই আগে প্রবেশ করে টিকা দিতে চাওয়ার চেষ্টার কারণে এই হ-য-ব-র-ল অবস্থার তৈরী হয়।
সোমবার (৯ আগস্ট) নাসিকের তিনদিনের কর্মসূচীর শেষ দিনে বন্দরের বিভিন্ন টিকা কেন্দ্রে ঘুরে এমন চিত্র লক্ষ্য করা যায়। এসময় কেন্দ্রগুলোতে একদিকে যেমন নিরাপত্তা কর্মী ও চিকিৎসা সেবা প্রদান কর্মীদের নাকানি চুবানি খেতে হয়, অপরদিকে টিকা গ্রহণ করতে না পেরে ফেরৎ যাওয়া লোকজনের ভোগান্তিত, অসন্তুষ্টি ও ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। কিছু কিছু কেন্দ্রে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের হস্তক্ষেপও করতে হয়।
সব শ্রেণি পেশার মানুষকে টিকার আওতায় আনতে সরকার কর্তৃক গণটিকা প্রদান কর্মসূচীর আয়োজন করা হয়। ৭ আগস্ট থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে নাসিকের প্রতিটি ওয়ার্ডের একটি কেন্দ্রে একটানা তিনদিনের গণটিকা প্রদান করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। প্রতিদিন একটি কেন্দ্রে ৬ শত জনের মধ্যে এই টিকা প্রদান করার লক্ষ্যে উদ্যোগ নেয়া হয়। সেই কর্মসূচীর শেষ দিন সোমবার (৯ আগস্ট) টিকা কেন্দ্রেগুলোতে সকাল থেকেই হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হতে থাকে। আর এতে করে বিপাকে পড়তে হয় টিকা কেন্দ্রের আয়োজকসহ স্বাস্থ্যকর্মী, নিরপত্তাকর্মীগণ, কাউন্সিলরসহ স্বেচ্ছাসেবক কর্মীদের। এ সময় জনগণের ধাক্কাধাক্কিতে কাউন্সিলরের কর্মীসহ বেশ কয়েকজন নিরপত্তা কর্মী ও আহত হন।
দুপুর সাড়ে এগারটার দিকে নাসিক ২৫ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের কার্যালয়ের সামনে অবস্থিত নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের টিকা প্রদান কর্মসূচীতে দেখা যায় লোকজনের উপচে পড়া ভিড়। সেখানে মানুষের মধ্যে নেই কোন স্বাস্থ্যবিধি, নেই ন্যূনতম সামাজিক দুরত্ব। ভবনের ভিতরে শত শত মানুষ অপেক্ষা করছে টিকা গ্রহণ করার জন্য। গেট বন্ধ করে ভিতর থেকে তালা ঝুলানো হয়েছে। বাহিরেও শতশত লোক অপেক্ষা করছে ভিতরে প্রবেশ করার জন্য।
অনেকে গেট খুলে না দেয়ার কারণে হৈচৈ করে ক্ষিস্তি ঝাড়ছে। সেখানে মানুষের এমন উপস্থিতিতে কাউন্সিলরের পক্ষে থাকা ভলান্টিয়ার বাহিনী, আনসার বাহিনী, স্বেচ্ছসেবক লীগের পক্ষ হতে আসা স্বেচ্ছাসেবকসহ উপস্থিত আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ বাহিনীকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হিমসিম খেতে হচ্ছে। এখানে যারা টিকা গ্রহণ করছেন তারাও বিশৃঙ্খলার কারণে বাহিরে বের হতে পারছিলেন না। কোন কারণে গেট খুললেই ভিতরে এত লোকজন থাকার পরও বাহির থেকে বলপূর্বক ধাক্কা দিয়ে গেটের ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করছে।
এ সময় নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়োজিত থাকা অনেকেই হাত পায়ে আঘাত পান। সেখানে নিরপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা জানান, একসাথে এত লোক আসলে আমরা সামাল দিব কি করে। এ সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সংবাদকর্মীরাও প্রায় আধা ঘন্টা ভিতরে আটকে থাকার পর বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ (ওসি) দ্বীপক চন্দ্র সাহাকে ফোন করলে তিনি বিষয়টি দেখেতেছেন বলে জানান। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই এখানে থাকা পুলিশ বাহিনীর সাথে আরো অতিরিক্ত পুলিশ যোগ হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। তারপরই ওসি দ্বীপক চন্দ্র সাহাসহ পুলিশের কর্মকর্তাবৃন্দ কেন্দ্রটি পরিদর্শন করেন।
এ বিষয় নাসিক ২৫ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এনায়েত হোসেনের সাথে কথা বললে তিনি জানান, তিনি সকাল থেকেই এখানে উপস্থিত থেকে তার নিজস্ব লোকজনসহ নিরাপত্তা কর্মীদের নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তবে সকাল থেকেই কেন্দ্রে টিকা নিতে আসা প্রচুর লোকজনের উপস্থিতির কারণে একটু হট্টগোল হচ্ছে। তিনি জানান, লোকজনের উপস্থিতির তুলনায় টিকার পরিমান অনেক কম। একটি কেন্দ্রে থেকে একদিনে ৬ শত জনকে ভ্যাকসিন প্রদান করার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু লোকজনের উপস্থিতি ছিল তার চেয়ে অনেক বেশী। তাই একদিনে সকলকে টিকা প্রদান করা সম্ভব নয় এই বিষয়টি তাদের বুঝাতে খুব বেগ পেতে হচ্ছে। তবে মানুষের মনে যে ভ্যাকসিন গ্রহণ করার জন্য যে আগ্রহ তৈরী হয়েছে তা প্রধানমন্ত্রীর টিকা প্রদানের এই উদ্যোগের ফসল উল্লেখ করে তিনি তাকে যুগোপোযোগী পদক্ষেপ বলে মনে করেন। অন্যদিকে ভ্যাকসিন নিতে আসা মানুষের মাঝে স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার প্রবণতাতে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
বন্দরে নাসিকের অন্যান্য কেন্দ্রে ঘুরে প্রায় একই চিত্র লক্ষ্য করা যায়। কেন্দ্রগুলোতে উপস্থিত হয়ে টিকা দিতে না পারায় অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অনেকেই আবার পরে টিকা দেয়া যাবে কি না এই নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ একটি ওয়ার্ডে মাত্র একটি কেন্দ্র থাকায় এত মানুষের জমায়েত হওয়ায় তাদের মধ্যে কোন নিয়ম কানুন মেনে চলা সম্ভব হচ্ছে না। টিকার সংখ্যা নিয়েও অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নাসিক ২১ নং ওয়ার্ডের আব্দুস সাত্তার জানান, তিনি সকাল সাড়ে ১০টার সময় এখানে এসেছেন। এসে তিনি প্রচুর মানুষের উপস্থিতি দেখতে পান। প্রায় দুই ঘন্টা থাকার পর এখন এই দুপুরের সময় বলছে তারা নাকি আজকে টিকা পাবে না। তাই তিনি ক্ষোভ ঝেরে বলেন, মাইক দিয়ে ঘোষণা দেয়া হয়েছে যারা টিকা নিতে চায় তারা যেন টিকা কেন্দ্রে আসে। দুপুর তিনটা পর্যন্ত টিকা দেয়া হবে। আমি সকালে এসেও টিকা দিতে পারলাম না।
এ বিষয়ে নাসিক ২১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. হান্নান সরকার জানান, একটি ওয়ার্ডে টিকা প্রদানের জন্য কেন্দ্র করা হয়েছে মাত্র একটি। সেখানে একদিনে মাত্র ৬শত লোককে টিকা প্রদান করা যাবে। এখানে ৬০০টিকার বিপরীতে কয়েক হাজার লোক টিকা নেওয়ার জন্য কেন্দ্রে ভিড় করতে শুরু করেছে। কিন্তু আমাদের পক্ষে তো আর উপস্থিত সবাইকে টিকা প্রদান করা সম্ভব নয়। তাই তাদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক। তাছাড়া অনেকের মধ্যেই ভয় ছিল, আজ টিকা শেষ হয়ে গেলে পরে আর টিকা নিতে পারবে কি না? তবে আমরা জনগণকে বুঝিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছি।
এ বিষয়ে বন্দরের নাসিক ২৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর সামসুজ্জোহা জানান, আমাদের যে পরিমান টিকা প্রদানের কথা লোকজনের উপস্থিতি তার চেয়ে অনেক বেশী থাকায় টিকা প্রদান কর্মসূচীতে কিছুটা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে। তবে আমরা জনগণকে বুঝিয়ে তা সমাধান করার চেষ্টা করেছি। মানুষের মনে একটি আশঙ্কা কাজ করছে যে, আজকে টিকা শেষ হলে পরে তারা টিকা গ্রহণ করতে পারবে কিনা তাই টিকা দিতে না পেরে অনেকের মধ্যেই অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেডিকেল অফিসার ডা. শেখ মোস্তফা আলী জানান, সরকার থেকে আমাদের সিটি কর্পোরেশনের ২৭ টি ওয়ার্ডের জন্য মোট ৪৮ হাজার ৬ শত টিকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এতে করে প্রতি ওয়ার্ডের জন্য মোট টিকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৮ শত। যা আমরা তিন দিনে প্রতি ওয়ার্ডে দৈনিক ৬ শত টি টিকা প্রদান করি। কেন্দ্র বাড়ালেও ওয়ার্ড ভিত্তিক দৈনিক টিকা ৬ শত হিসেবে ১৮ শত ই প্রদান করা হতো। কিন্তু প্রতি ওয়ার্ডের জনসংখ্যা হিসেবে এর চাহিদা আরো কয়েকগুণ বেশী। সে তুলনায় এই টিকার এই সংখ্যা খুবই নগণ্য। তাই কেন্দ্রগুলোতে জনগণের আধিক্যের কারণে কিছুটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে।


