সোনারগাঁয়ে তিন প্রতিষ্ঠান গিলে খাচ্ছে মেঘনার শাখা নদী
যুগের চিন্তা অনলাইন
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২১, ০৯:১৬ পিএম
সোনারগাঁ উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের আষাঢ়িয়ারচর, নয়াগাঁও, দুধঘাটা ও কোরবানপুর এলাকায় দেদারছে চলছে মেঘনার শাখা নদী দখল ও ভরাটের মহাউৎসব। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কঠোর নজরদারী না থাকায় একের পর এক নদী দখল ভরাটের উৎসবে মেতে উঠেছে ফ্রেশ, ইউনিক ও আনলীমা গ্রুপসহ তিনটি প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে গড়ে উঠা কয়েকটি প্রভাবশালী দালালচক্র, ভূমিদস্যু ও সোনারগাঁয়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিল্পকারখানার মালিক কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে দেদারছে দখল ও ভরাট হচ্ছে মেঘনার শাখা নদী। এ যেন দিন দুপরে রীতিমত নদী ডাকাতি। সরেজমিন, মেঘনার শাখা নদী তীরবর্তী আষাঢ়িয়ারচর, দুধঘাটা ও কোরবানপুর মৌজায় ঘুরে দেখা যায়, মেঘনা গ্রুপ, ইউনিক ও আনলীমা গ্রুপের দখল ভরাটের কবলে পড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের আষাঢ়িয়ারচর সেতু এলাকা থেকে শুরু করে কোরবানপুর এলাকা পর্যন্ত মেঘনার শাখা নদীটি তার আসল গতিপথ হারিয়ে একবারেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের আষাঢ়িয়ারচর, নয়াগাঁও, দুধঘাটা ও কোরবানপুর এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, সোনারগাঁ উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে গড়ে উঠা প্রভাবশালী দালাল চক্রের যোগসাজেসে প্রকাশে দিবালোকে চোখের সামনেই দখল ভরাট হচ্ছে মেঘনার শাখা নদী। শিল্পউন্নয়ণ, কলকারখানা নির্মাণ ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের নামে মেঘনার শাখা নদী, খাল-বিল, সরকারী খাস সম্পত্তি, ফসলি জমি, জলাশয় ভরাট করে অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে উঠছে একের পর এক নতুন নতুন স্থাপনা। বিগত কয়েক বছরে উপজেলা সদরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত মেঘনার কয়েকটি প্রাচীন শাখা নদী ও অসংখ্য খাল-বিল, ভরাট করে ফেলেছে স্থানীয় ভূমিদস্যু ও শিল্পকারখানা মালিকরা। উচ্চ আদালতের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, নদীতীরবর্তী ৫০ মিটার ভূমিতে বালু ও মাটি ভরাটসহ যে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা স¤পূর্ণ অবৈধ।
নদীতীরবর্তী এলাকায় কাজ বন্ধে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কিছু স্বার্থেন্নেষী মহলের সহযোগিতায় নদী দখল ও ভরাট করে বড় বড় স্থাপনা নির্মাণ করে চলেছেন বিভিন্ন শিল্পকারখানার মালিক কর্তৃপক্ষ। এছাড়া ভরাটের কবলে পড়ে প্রতিদিন উপজেলার আশপাশে অবরুদ্ধ হচ্ছে শাখানদী গুলোর গতিপথ ও পানির উৎসমুখ। পাশাপাশি সড়ক ও জনপথের ব্রিজ ও কালভার্টের মুখ মাটি ফেলে পানি প্রবাহের পথ বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। এর ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে শিল্প ও পর্যটন নগরী সোনারগাঁ। প্রশাসনিক কোন বাধা না থাকায় নির্বিঘেœ পরিবেশ বিধবংসী কার্যক্রম চলছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজের লোকজন জানান, মানুষের মাঝে সচেতনতার অভাব এবং প্রশাসনিক নজরদারি না থাকার কারনেই জলাধার গুলো দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নদী-নালা, খাল-বিল, খাস জমি দখল ও ভরাট বিষয়ে বিভিন্ন সময় স্থানীয় প্রশাসন ও ভূমি কার্যালয়ে অভিযোগ করলেও কোন কাজে আসছেনা। প্রকৃত পক্ষে পরিবেশ গত উন্নয়নে উপজেলা পর্যায়ে কারো কোন দায় দায়িত্ব নেই বললেই চলে। সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশ অধিদপ্তর নদীতে দূষিত বর্জ্য ফেলার দায়ে কয়েকটি শিল্পকারখানার মালিককে জরিমানা করলেও দখল ও ভরাট বিষয়ে তাদের কোন নজরদারি নেই বললেই চলে। পরিবেশবিদদের মতে, মেঘনা নদীবেষ্টিত সোনারগাঁয়ের চারপাশে অসংখ্য খাল-বিল, নদীনালা, ফসলি জমি, মাছ আর জীববৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ ছিল পুরো এলাকা। কিন্তু শিল্পউন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সংশ্লিষ্টদের দূর্ণীতি মানসিকতা, ভূমিদস্যুদের দৌরাতেœ্য সে সব আজ হুমকির সম্মুখীন।
উপজেলা সদরের পিরোজপুর ইউনিয়ণের দুধঘাটা, পিরোজপুর, মঙ্গলেরগাঁও, গুদারাঘাট ও ইটাখোলা মৌজায় ছিল বিস্তীর্ণ বিল। যেখানে সারাবছরই নিচু জমি ও ডোবায় পানি জমে থাকত। সেগুলো দখল ভরাট করে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, বাড়িঘর, দোকানপাটসহ নতুন নতুন স্থাপনা। এভাবে নদী-নালা ও জলাধার ভরাট হওয়ার কারনে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে ও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে মিঠা পানির দেশীয় প্রজাতির সব মাছ। বাংলাদেশ পরিবেশ আইন অনুযায়ী, যেকোনো আবাসন বা বড় উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) করে এর অনুমোদন নিতে হয়। প্রয়োজন হয় অবস্থানগত ছাড়পত্রের। এসবের পর পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করতে হয়। এসব ছাড়পত্র পেলে তবেই মাটি ভরাটসহ অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ করতে হয়। কিন্তু মেঘনা নদী খেকো শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রক্রিয়া অবলম্বন না করে, পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই বালু ভরাট করে নদী ও কৃষকদের জমি জোরপূর্বক দখল করেছে। অব্যাহত দখল, ভরাট ও দূষণের কবলে পড়ে মেঘনা ও কয়েকটি শাখা নদীসহ সোনারগাঁয়ের বিরাট একটি অংশ অস্তিত্ত্ব সঙ্কটে পড়েছে।
এছাড়া মেঘনার দিকে তাকালে চোখে পড়ে নদী তীরবর্তী বিশাল এলাকাজুড়ে শুধু দখলদারি, ভরাট, সিমানা প্রাচীর, নির্মিত ও নির্মাণাধীন ছোট-বড় স্থাপনা। উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের মেঘনার শাখা নদী তীরবর্তী আষাঢ়িয়ারচর, নয়াগাঁও, দুধঘাটা ও কোরবানপুর এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, উপজেলা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে মেঘনা নদী, মেঘনার শাখানদী, সরকারি খাস স¤পত্তি, সরকারি খাল এবং কৃষকের ফসলি জমি জোরপূর্বক দখল করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নামে শিল্প মালিকরা অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে তুলেছে বড় বড় স্থাপনা। যার ফলে দখল ভরাটের কবলে পড়ে ভূক্তভোগী কোন ব্যক্তি উপজেলা প্রশাসনের দ্বারস্থ্য হলেও কোন রকম প্রতিকার পায় না।
পাশাপাশি দখল ভরাটের কবলে বর্ষা মৌসুমে জলাধারে পানি জমতে না পারায় ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। শুস্ক মৌসুমে খরার প্রভাবে ফসলি জমি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্য পূর্ণ সোনারগাঁ এলাকা স্থায়ীভাবে মরুকরনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এব্যাপারে স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন, নাগরিক কমিটি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিগত সময়ে পরিবেশ রক্ষায় কয়েকদফা বিক্ষোভ মিছিল ও মানব বন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও কর্তৃপক্ষ তৎপর হয়নি। এই ধারা আর কিছুদিন অব্যাহত থাকলে শুস্ক মৌসুমে এলাকাবাসী সুপেয় পানির সংকটে পড়বে। একই সঙ্গে কৃষি ও জীববৈচিত্র্যে বিরূপ প্রভাব এবং বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার স্থায়ীরূপ নিবে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।
সম্প্রতিককালে সোনারগাঁয়ের কাঁচপুরে শীতলক্ষা ও মেঘনার শাখা নদী উদ্ধারে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। উদ্ধার অভিযানে নদীতীরবর্তী এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে উঠা বিভিন্ন স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হলেও আবার কোথাও কোথাও দখলকারীদের বিরুদ্ধে নিজেদের স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন (বিআইডব্লিউটিএ) কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কোন অজ্ঞাত রহস্যজনক কারণে দখল হওয়া মেঘনার শাখা নদী উদ্ধারে ও উদ্ধারকৃত জমি রক্ষায় কোন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি সরকারি এ সংস্থাটি।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, নদীখেকোদের সঙ্গে পরিবেশ অধিদফতরের নারায়ণগঞ্জ জেলা, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কার্যালয় এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সখ্যতা রয়েছে বিধায় তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে নদী দখল ও ভরাট চলছে প্রকাশ্যেই। প্রতিনিয়ত নদীতে পাইলিং, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ ও বালু ফেলে নদীগর্ভে প্রবেশ করছে বিভিন্ন শিল্পমালিকরা। নদী দখল ভরাটের বিষয়ে জানতে চাইলে, উপজেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা একে অন্যের ওপর দায় চাপাতে ব্যস্ত রয়েছেন। নদী দখল, সরকারি খাল, সরকারী খাস সম্পত্তি ও ফসলি জমি রক্ষার প্রতিবাদে স্থানীয় এলাকাবাসী ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর আন্দোলন-সংগ্রাম, বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি প্রদানের পরও কোনো সুফল পায়নি।
বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি কবি জামান ভূঁইয়া বলেন, দখল ভরাটের কবলে পড়ে মেঘনা নদী যেন বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা না হয়। দখল ভরাটের কবল থেকে মেঘনার শাখা নদী উদ্ধারে (বিআইডব্লিউটিএ) এর ভূমিকা রহস্যজনক। পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ ও স্থানীয় প্রশাসনকে নদী রক্ষায় এখনই কার্যকরি পদক্ষেপ নিতে হবে। সবাইকে বুঝতে হবে, নদী বাঁচলে, তবেই বাঁচবে দেশ। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে দখল ভরাটের কবল থেকে নদী উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
নদী দখল ভরাটের বিষয়ে জানতে চাইলে, সোনারগাঁ সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোস্তফা মুন্না জানান, উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের যে সব স্থানে মেঘনার শাখা নদী দখল ভরাটের চেষ্টা চলছে, সরেজমিন নদী দখল ভরাটের স্পট গুলো পরিদর্শন করে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।


