সোনারগাঁয়ে রেলওয়ের সম্পত্তি শিল্পমালিক ও প্রভাবশালীদের কব্জায়
যুগের চিন্তা অনলাইন
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২১, ১১:২৬ পিএম
দীর্ঘদিন ধরে রক্ষাণাবেক্ষণ ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের নজরদারীর অভাবে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে রেলওয়ের প্রায় ২শ কোটি টাকার সরকারী সম্পত্তি বেদখল হয়ে যাচ্ছে। উপজেলার মদনপুর এলাকা থেকে শুরু হয়ে প্রভাকরদী পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে রেলওয়ের সম্পত্তি এখন বিভিন্ন শিল্পমালিক ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কব্জায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জমিগুলো দখল মুক্ত করার জন্য কোন রকম উদ্যোগ না নেয়ায় সম্পত্তিগুলো বেহাত হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া রেলওয়ের সরকারী সম্পত্তি দখল করে, দোকানপাট, বিপনী বিতান, হাটবাজার ও শিল্পকারখানা নির্মাণ করে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যক্তিরা রাতারাতি ধনী বনে যাচ্ছেন। রেলওয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগ সাজসে রেলওয়ের সম্পত্তি দখলে জড়িত রয়েছেন শিল্প মালিক, সরকারদলীয় নেতাকর্মী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। এতে করে স্থানীয় বাসিন্দা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে।
রেলওয়ের সম্পত্তি দখলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রেলওয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগ সাজসে কোন রকম লিজ ছাড়াই বিভিন্ন শিল্প মালিক ও সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা দলের প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সরকারী এ সম্পত্তি দখল করে রেখেছেন। সরকার কর্তৃক কাগজে কলমে কোন প্রকার লিজ দেয়া না হলেও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কতিপয় ব্যক্তির সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের কারনে বেহাত সরকারী এ সম্পত্তি উদ্ধারে কোন তৎপরতা নেই বললেই চলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের। বাংলাদেশ রেলওয়ের জমি রেল লাইন থেকে দুপাশে ১২০ ফিট চওড়া। কোথাও কোথাও আবার ৪০০ ফিটও রয়েছে। এছাড়া রেল স্টেশন এলাকায় ২ হাজার ফিট এলাকা জুড়ে জমি রয়েছে। রেলওয়ে শুধুমাত্র কৃষি ভিত্তিক জমি লিজ দেয়া হয়। বানিজ্যিক লিজ অনেক আগেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে কৃষি লিজও বন্ধ রয়েছে। কৃষি লিজ নিয়ে শুধুমাত্র কৃষি আবাদ করতে পারবেন।
শ্রেণী পরিবর্তন করে কেউ রাস্তা, বিপনী বিতান, পাকা কোন স্থাপনা, মার্কেট নির্মাণ বা দেয়াল দিয়ে দখলে নেওয়ার কোন সুযোগ নেই। এগুলো করে থাকলে সবই অবৈধ দখলদার হিসেবে গন্য হবেন। বর্তমানে মদনগঞ্জ থেকে নরসিংদী সড়কে সকল দখলদারই অবৈধ হিসেবে দখলে আছে। তবে কোন শিল্প মালিক জমির শ্রেণী পরিবর্তন করতে হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হবে। এ সড়কে কোন শিল্প মালিক শ্রেণী পরিবর্তনের কোন প্রকার অনুমতি নেয়নি। ফলে সকল শিল্প মালিক অবৈধ দখলদার হয়ে রাস্তা নির্মাণ করেছেন। তাদের বিষয়ে শীঘ্রই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার সাদিপুর ইউনিয়নের নয়াপুর এলাকায় অবৈধ দলখদার ইউপি সদস্য বাচ্চু মিয়া ও আবু সিদ্দিক মিয়া রেলওয়ের সম্পতি বিক্রি করে দেওয়ার পর একটি সিন্ডিকেট আওয়ামীলীগের কথিত নেতা মনির হোসেন, নয়াপুর বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান, সাদিপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন, শামীম, বিএনপি নেতা তাওলাদ মুন্সি, আমিনুল হক, যুবলীগ নেতা জসিমসহ আসাদুর রহমান আসাদ, সালাউদ্দিন মাসুম ও শামীম মিয়া চারদিকে টিনের বেড়া দিয়ে আড়াঁল করে ঘর নির্মাণ করেছেন।
এছাড়াও কনফিডেন্স লিমিটেড নামের একটি কোম্পানি জমি দখল করে রেখেছেন। তালতলা এলাকায় জামপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সামসুল আলম, প্রভাবশালী তুহিনুর রহমান, আওয়ামীলীগ নেতা ফিরোজ মিয়া, জব্বার আলী, আমিন মিয়া, হালিম মিয়া, আব্দুর রহিম, বিএনপি নেতা সোনা মিয়া সুনু, জামপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কামরুল হাসান লিটন, আলী আকবর, আব্দুল কাদির ও বৈরাবরটেক এলাকায় পিপিএল কোম্পানি লিমিটেড, বস্তল এলাকায় এ্যাম্পায়ার স্টীল মিলস, তালতলা সুপার মার্কেট, মহিউদ্দিন পেপার মিলস লিমিটেড, সৃজন আবাসন প্রকল্প, রক্সি পেইন্ট, গ্যাস্টন ব্যাটারী ফ্যাক্টুরি, কাঠারাবো এলাকায় দেশপ্যাক কোম্পানি লিমিটেড রেলওয়ের জমি দখলে নিয়েছেন। বস্তল এলাকায় শাহজাহান ফার্নিচার, শেজাদ পারভেজ স্পিনিং মিলস, রহমান স্পিনি মিলসং, মরিচটেক এলাকায় বিআর স্পিনিং মিলস লিমিটেড, মিরেরটেক বাজারে হাবিবুর রহমান সরকার সুপার মার্কেট, হাতুরাপাড়া এলাকায় চাঁন সূর্য্য ফিলিং স্টেশন, গ্রাম বাংলা টিউব ফ্যাক্টুরি, ললাটি এলাকায় অলিম্পিক বিস্কুট, মুনতাহা স্টিল লিমিটেড, সুরুজ মিয়া স্পিনিং মিলস লিমিটেড রেলওয়ের জমি দখল করে রাস্তা নির্মাণ করেছেন।
জামপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সামসুল আলম জানান, রেলওয়ের জমি লিজ নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছি। লিজ পেলেই বৈধ ইজারাদার হবো। তবে লিজ পাওয়ার আগে মার্কেট নির্মাণ করার বিষয়ে জানতে চাইলে কোন মন্তব্য করেননি।
রেলওয়ের ঢাকা বিভাগের ষ্টেট অফিসার নজরুল ইসলাম জানান, মদনগঞ্জ-নরসিংদী সড়কটি রেলওয়ের পরিত্যাক্ত থাকায় দখলদাররা দখল করেছে। তবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কোন ব্যক্তি আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত থাকলে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রেলওয়ের জমি রক্ষায় অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ দখলদারের শিঘ্রই উচ্ছেদ করা হবে।
সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আতিকুল ইসলাম জানান, রেলওয়ের সম্পত্তি দখল বিষয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা চাইলে দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


