Logo
Logo
×

নগরের বাইরে

অবহেলাকারীদের বিচার চায় নিহতদের পরিবার

Icon

যুগের চিন্তা অনলাইন

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৮:৪৮ পিএম

অবহেলাকারীদের বিচার চায় নিহতদের পরিবার
Swapno

# তল্লা মসজিদে বিস্ফোরণের এক বছর



ফতুল্লার তল্লায় বাইতুস সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনার এক বছর অতিবাহিত হলেও নিহতদের পরিবারগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। প্রিয় মানুষটি হারানোর বেদনায় এখানো কাদেঁন তারা। নানা সংকট আর প্রতিকুলতার মধ্যেও বিচারের দাবি নিয়ে অপেক্ষায় আছেন ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো।


 
মামলার তদন্তকারী সংস্থা বলছে, অবহেলায় মৃত্যুর অভিযোগের মামলায় আদালতে ২৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হলেও তিতাস গ্যাসের আট কর্মকর্তা কর্মচারীর বিরুদ্ধে তিন দফা আবেদন করেও কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি পায়নি সিআইডি। এ কারণে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করতে না পারায় তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করা যাচ্ছে না। নাগরিক নেতারা বলছেন, বিস্ফোরণে এতোগুলো মানুষ মারা গেলে যাদের অবহেলার কারণে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা যাচ্ছে এ ধরণের সংস্কৃতি মানা যায়না। ২০২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাতে এশা'র নামাজ চলাকালে সদর উপজেলার ফতুল্লার তল্লা এলাকায় বাইতুস সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে এশার নামাজ পড়তে যাওয়া ৩৭ জন মুসল্লি ও এক জন পথচারী দগ্ধ হন। তাদের মধ্যে ৩৪ জন ঢাকার শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে মারা গেছেন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন আহত চার জন।


 
ঘটনার দুইদিন পর ফতুল্লা থানার উপপরির্দশক হুমায়ন কবির বাদী হয়ে ‘অবহেলায় মৃত্যুর অভিযোগ’ এনে মামলা করেন। ১০ সেপেম্বর মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি।এ সংস্থা তিতাসের আট কর্মকর্তা-কর্মচারি, মসজিদ কমিটির সভাপতি, ডিপিডিসির মিটার রিডার ও স্থানীয় এক বিদ্যুৎ মিস্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। মামলাটি সাড়ে তিন মাসেরও বেশি সময় তদন্তের পর গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর ২৯ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন সিআইডি। তাদের প্রতিবেদনে বিস্ফোরণের জন্য গ্যাস বিতরণ সংস্থা তিতাস, বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ডিপিডিসির স্থানীয় ১০ জন কর্মীর পাশপাশি দায়ী করা হয়েছে মসজিদ কমিটির অবহেলাকেও। তবে মামলাটিতে তিতাসকে দায়ী করা হলেও তাদের কাউকে চার্জশীট ভুক্ত করা হয়নি। ওই সময় সিআইডির কর্মকর্তারা জানান, আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। বর্তমানে মামলাটি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। মামলার আসামিরা সবাই জামিনে আছেন।


 
বিস্ফোরণে নিহত রঙ মিস্ত্রি হুমায়ন কবিরের স্ত্রী মমতাজ বেগম বলেন, যারে দিয়া সংসার চলতো সেই তো নাই। বর্তমানে অনেক কষ্ট কইরা সংসার চলাইতে হয়। কারণ আমার এক ছেলে প্রতিবন্ধি, আরেক ছেলে বেকার। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে অনেক টানাটানি কইরা সংসার চলে। তিনি বলেন, বিচার তো চাই। বিচারের অপেক্ষাই তো আছি। কই গ্যাস কোম্পানির কোন লোকের বিচার হইলো না। যাগো স্বজন মরছে আমরা সবাই বিচার পথ চাইয়া আছি। নিহত জুবায়ের ও সাব্বিরের বাবা নুর উদ্দিন বলেন, দুই সন্তান মারা যাওয়ার পর থেকে ওর মা প্রায় স্মৃতিহারা। এখন বেশরিভাগ সময় ছোট ছেলে ইয়াসিনকে নিয়ে বসে থাকে। আমি একটা ছোট চাকুরি করি আরও ওদের মামা অন্যের বাড়িতে গিয়ে শিশুদের আরবী পড়ায় এভাবেই সংসার চলছে।
তিনি বলেন, আমরা অপেক্ষায় আছি কবে বিচারের  হইবো। যাদের অবহেলার কারণে, যাদের জন্য আমার সন্তান হারিয়েছি তাদের বিচার চাই।  

 

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাবুল আক্তার জানান, বিস্ফোরণের ঘটনায় ‘অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে’ মামলাটি করা হয়। মামলার তদন্তে গ্যাস বিতরণ সংস্থা তিতাস, বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ডিপিডিসি, মসজিদ কমিটির অবহেলা ও স্থানীয় ১০ জন কর্মীর জড়িত থাকার সত্যতা পাওয়া যায়। এদের মধ্যে তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের ছাড়া অন্য ২৯ জনকে আসামী করে আদালতে অভিযোগ পত্র দেয়া হয়েছে। তবে তিনবার আবেদন করেও তিতাস কতৃপক্ষের অনাপত্তি না পাওয়া তাদের লোকজনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র  দাখিল করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পুরো বিষয়টি আদালতের ওপর নির্ভর করছে।
 


এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিষ্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিমিটেড নারায়ণগঞ্জের উপ-মহাব্যবস্থাপক গোলাম ফারুক জানান, আট কর্মকর্তার কর্মচারীর বিষয়ে সিআইডির দেয়া আবেদনের বিষয়ে ঢাকায় তিতাসের লিগ্যাল এইড অফিসের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানেন। আঞ্চলিক অফিস থেকে এ বিষয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়।


 
নারায়ণগঞ্জের নাগরিক নেতারা বলছেন, মসজিদের বিস্ফোরণে এতোগুলো মানুষ মারা গেলে যাদের অবহেলার কারনে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা যাচ্ছে এ ধরনের সংস্কৃতি মানা যায়না। আমরা দাবি করছি, এ বিষয়ে দ্রুত সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। এদিকে মসজিদ কমিটির কয়েক দফা আবেদনের প্রক্ষিতে প্রায় ১ বছরের মাথায় গত ২৯ আগস্ট মসজিদটি খুলে দেওয়া সিদান্ত জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। ছয়টি শর্তে মসজিদটি খুলে দেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। মসজিদের বিদ্যুৎসংক্রান্ত সব কার্যক্রমের সঠিকতা নিশ্চিত করা, মসজিদের পাশে গ্যাসলাইন নেই অথবা গ্যাস লাইন সঠিক আছে এই মর্মে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ থেকে প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ, প্রতিটি তলায় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামাদি রাখা, মসজিদে একাধিক দরজা রাখার ব্যবস্থা করা, ৩ মাস পর পর অনুমোদিত প্রকৌশলী ও এবিসি লাইসেন্সপ্রাপ্ত টেকনিশিয়ান দ্বারা পরীক্ষা করানো সহ আপাতত মসজিদটিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) যন্ত্রের ব্যবহার না করা নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ।

 

তিনি জানান, ফায়ার সার্ভিস, ডিপিডিসি, তিতাস, ও পুলিশ মসজিদ খোলার বিষয়ে ইতিবাচক প্রতিবেদন দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট এ সরকারি দপ্তরগুলোর কাছ থেকে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছিল। তাদের প্রতিবেদনের পর সরকারী নিয়ম অনুযায়ী ছয়টি শর্ত দিয়ে মসজিদটি খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত মসজিদ কমিটিকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদেরকে বলা হয়েছে এই মসজিদের নামাজ পড়ানো হলেও কিনবা নতুন করে নির্মাণ করা হলেও তিন পর জেলা প্রশাসন তা মনিটরিং করবে। ডিসি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো যদি কোন আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করেন তাহলে তাদের আর্থিক সহায়তা প্রদানে ব্যবস্থা করা হবে।
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন