মাসোহারা দিয়ে মহাসড়কে চলছে অবৈধ যানবাহন, বাড়ছে দুর্ঘটনা
যুগের চিন্তা অনলাইন
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৭:৪৯ পিএম
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর সেতু থেকে মেঘনা সেতু পর্যন্ত অটোরিকশা ও যান্ত্রিক যানবাহন চালকদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধের পরও নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবাধে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে অটোরিকশা দিয়ে। মহাসড়কের পাশেই গড়ে উঠেছে অবৈধ স্ট্যান্ডও। সিএনজিচালিত অটোরিকশা মহাসড়কে চলাচল করায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা।
অটোরিকশার যাত্রী জাবের আহমদ বলেন, প্রায়ই অটোরিকশায় যাতায়াত করেন তিনি। বাসের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। এ জন্য সিএনজি চালিত অটোরিকশাতে যাতায়াত করেন। এতে কিছুটা হলেও সময় বাঁচে। তবে মহাসড়ক দিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাতায়াতে দুর্ঘটনার শঙ্কা তো রয়েছেই।
জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১ আগস্ট থেকে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় দেশের ২২ মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, অটো টেম্পো, নছিমন-করিমনসহ সব ধরনের অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করে। তিন চাকার এসব যানবাহনকে মহাসড়কে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করে উচ্চ আদালতও এসব যানবাহন চলাচল বন্ধ করার জন্য দেশের বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি) ও হাইওয়ে পুলিশকে নির্দেশ দেন। উচ্চ আদালত ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর কিছুদিন হাইওয়ে পুলিশ ও থানা-পুলিশ এসব যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নেয়। কিন্তু মহাসড়ক ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর সেতু থেকে মেঘনা সেতু পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এসব যানবাহন আবার চলাচল করছে। এর কারণে দ্রুতগতির যানবাহনকে ধীরগতিতে চলাচল করতে হচ্ছে। কাঁচপুর সেতু থেকে মেঘনা সেতু পর্যন্ত দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। কয়েক দিন পরপরই ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা।
সরোজমিনে দেখা যায়, কাঁচপুর থেকে মেঘনাঘাট পর্যন্ত কয়েকটি স্থানে মহাসড়কের ওপর অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে অটোরিকশা, অটো টেম্পো ও ট্রাক-পিকআপ স্ট্যান্ড। গতকাল রোববার ঘুরে দেখা যায়, মহাসড়কে এই ১৪ কিলোমিটারে অসংখ্য পায়েচালিত ও ব্যাটারিচালিত রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, নছিমন-করিমন-ভটভটিসহ অসংখ্য অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করছে। এর যাত্রী হিসেবে রয়েছেন নারী-পুরুষ। মহাসড়কে হাইওয়ে ও থানা-পুলিশের একাধিক গাড়ি চলাচল করতে দেখা যায়। তবে কেউ এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
কাঁচপুর এলাকার লেগুনা চালক উজ্জল মিয়া বলেন, সোনারগাঁয়ের কাঁচপুর থেকে মেঘনাঘাট পর্যন্ত ২ শতাধিক লেগুনা, সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করে। আর এসব নিয়ন্ত্রণ করেন কাঁচপুর সেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক বাবুল হোসেন। তিনি এসব অবৈধ যানবাহন থেকে প্রতিমাসে প্রত্যেকটি লেগুনা থেকে ৩ হাজার করে মাসোহারা নেন। প্রতিটি যানবাহন অটো রিক্সা থেকে দৈনিক ২০০ টাকার করে টাকা নিয়ে সড়কে চলাচল করতে দেন।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়মিত মাসোহার দিয়ে থাকেন এই সেচ্ছাসেবক লীগ নেতা। যে কারণে সড়কে চলাচল করতে অবৈধ যানবাহনকে বেগ পেতে হয় না।
এ ব্যাপারে ঢাকা থেকে কুমিল্লাগামী পরিবহনের চালক মজনু মিয়া বলেন, সরকার ও উচ্চ আদালত মহাসড়কে এসব যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করলেও এই এলাকায় কোনো প্রশাসন আছে বলে মনে হয় না। এসব যানবাহনের কারণে আমাদের ধীরগতিতে চলতে হয়। প্রতিদিন যানজটে বসে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
সোনারগাঁ থানা-পুলিশ ও কাঁচপুর হাইওয়ে থানা সূত্রে জানা যায়, কাঁচপুর সেতু থেকে মেঘনা সেতু পর্যন্ত গত ছয় মাসে দুই ডজনেরও বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছে ২০ জন।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের এক চালক বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়েক যান চলাচল নিষিদ্ধ হলেও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় ও পুলিশকে ম্যানেজ করে তা চলছে। জেলা ট্রাফিক পুলিশ ও স্থানীয় থানা পুলিশের সঙ্গে সখ্যতা তৈরী করলেই অনুমতি মিলছে। এর ফলে এগুলোর চলাচল দিন দিন বাড়ছে। সেলিম হোসেন নামের এক অটোরিকশাচালক বলেন, মাঝেমধ্যে পুলিশ আমাদের বাধা দেয়। পরে সমিতির নেতারা পুলিশকে ম্যানেজ করেন।
এই বিষয়ে কাঁচপুর ইউনিয়নের স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাধারণ সম্পাদক বাবুল হোসেনের সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। নারায়ণগঞ্জ জেলার শ্রমিকলীগের সভাপতি কাজিম উদ্দিন বলেন, শ্রমিকলীগের পদধারী কোন ব্যক্তি টাকা উত্তোলন করে না, তবে দলীয় নাম ভাঙ্গিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছেন। আমরা নিজেরাও এই বিষয়ে পুলিশকে জানিয়েছি।
কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান বলেন, প্রতি মাসেই আমরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সিএনজি অটো রিক্সা চালকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করছি। এই মাসে ৮ শত ১৬টি মামলা দায়ের করা হয়। সিএনজি ও অটোরিক্সা মাঝেমধ্যে গোপনে মহাসড়ক দিয়ে চলাচল করে। প্রতিদিনই এসব অযান্ত্রিক যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। কোনো অনিয়মের সঙ্গে হাইওয়ে পুলিশ জড়িত নেই।
হাইওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অমিত্র সূত্রধর বলেন, আমরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিষিদ্ধ যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রতিনিয়ত অবৈধ যানবাহন আটক করছি। সড়কে যেন আর এই অবৈধ যানবাহন চলাচল করতে না পারে তার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রতি মাসের এদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হচ্ছে। হাইওয়ের কোন পুলিশ মসোহারা নিয়ে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


