ফতুল্লায় ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণ মা হারিয়ে আলো নিভলো পূর্ণিমার !
তুষার আহমেদ
প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২১, ০৩:০২ এএম
৩৫ বছর বয়সি মঙ্গলী রানী বিশ্বাস। স্বামী হারা এই বিধবা তার এক মাত্র শিশু কন্যা পূর্ণিমাকে নিয়ে লড়ছিলেন জীবন যুদ্ধে। দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের সন্ধানে মাত্র দু’মাস আগেই গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জ ছেড়ে পাড়ি জমিয়ে ছিলেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার লালখা এলাকায়। কাজ নিয়েছিলেন জালকুড়ির একটি ঝুটের গোডাউনে। যৎ সামান্য পারিশ্রমিকে সংসার চালানো দ্বায়; তাই বিদ্যালয় ছেড়ে ১০ বছরের অপরিপক্ক পূর্ণিমাও মায়ের সাথে হাল ধরে ছিলেন সংসারের, নিয়েছিলেন হোসিয়ারীর চাকুরী। বাবা না থাকায় কেবল মা-ই ছিলো পূর্ণিমার একমাত্র আশ্রয়স্থল। তবে, আকস্মিক এক দূর্ঘটনা কেড়ে নিলো পূর্ণিমার মা মঙ্গলীকেও। তাই জীবন যুদ্ধের এই অনিশ্চয়তার মঞ্চে পূর্ণিমা আজ কেবলই একা। চোখের সামনে মাকে হারানোর মর্মান্তিক দৃশ্য ও ভয়াবহতায় পূর্ণিমা বাকরুদ্ধ। পূর্নিমা কাঁদছেন অঝোরে, সেই কান্নার সাধ্য নেই তার হৃদয়ের ক্ষত মুছে দেয়ার।
গতকাল সকালে ফতুল্লার লালখা এলাকায় পাঁচ তলা বিশিষ্ট ভবনের নিচতলায় জমে থাকা গ্যাস বিস্ফোরণে নিহতদের মধ্যে একজন পূর্ণিমার মা মঙ্গলী রানী। মঙ্গলী রানী ওই ভবনের বাসিন্দা না হলেও মৃত্যুদূত তাকে টেনে এনেছিলো দূর্ঘটনা কবলিত ওই ভবনটির কাছেই। এদিকে, পূর্ণিমাও গুরুতর আহতদের মধ্যে অন্যতম একজন। চোখের সামনে মায়ের মর্মান্তিক মৃত্যু হলেও অল্পের জন্য বেঁচে ফিরেছেন পূর্ণিমা। তার বাবা পরোলোক গমন করেছেন আরো কয়েক বছর আগেই। তাই মাকে হারিয়ে যেন জীবনের আলো নিভলো শিশু পূর্ণিমার।
সরেজমিনে জানা গেছে, জানা গেছে, মেয়ে পূর্ণিমার জন্ডিস রোগের চিকিৎসার জন্য কবিরাজের বাড়িতে যাওয়ার পথে আকষ্মিক ওই দূর্ঘটনার কবলে পরে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় মা মঙ্গলীর।
অন্যদিকে, গুরুতর আহত হয়ে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে ফেরা শিশু পূর্ণিমা মাথায় রক্তাক্ত জখম ও পায়ের হাড় ভেঙ্গে নিজেও কাতরাচ্ছেন বিছানায়। ভীত চোখ দুটো হয়তো এদিক-সেদিক খুঁজে বেড়াচ্ছিল শেষ আশ্রয়স্থল মমতাময়ী মাকে। তবে, মা যে পূর্ণিমাকে রেখেই পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে!
শিশু পূর্ণিমার খালা দৈনিক যুগের চিন্তাকে জানিয়েছেন, দূর্ঘটনা কবলিত লালখার প্রয়াত মোক্তার মেম্বারের বাড়ির থেকে প্রায় ৫০ গজ পূর্বে অবস্থিত মাঝারুলদের বাড়ির একটি জরাজীর্ণ কক্ষে মেয়ে পূর্নিমাকে নিয়ে মাসে আড়াই হাজার টাকায় ভাড়া থাকতেন মঙ্গলী রানি বিশ্বাস। হোসিয়ারীতে কাজ করা শিশু পূর্নিমার শরীরে ধরা পড়েছে জন্ডিস রোগ। তা সারাতে স্মরনাপন্ন হয়েছিলেন পাশের এলাকার এক কবিরাজের কাছে। প্রতিদিন বাড়ির অন্যান্য মানুষ পূর্ণিমাকে ওই কবিরাজের কাছে নিয়ে গেলেও গতকাল শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় পূর্ণিমাকে নিজেই সাথে করে কবিরাজের বাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলেন মঙ্গলী রানী বিশ্বাস। পথিমধ্যে লালখার মোক্তার মেম্বারের বাড়ির সামনে আসা মাত্রই নিচতলা থেকে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়।
ভবনের দেয়ালের অংশ বিশেষ প্রচন্ড বেগে আঘাত করে পথচারী মঙ্গলীর শরীরে। আঘাত হানে পূর্ণিমার শরীরেও। তবে, পার্শ্ববর্তী গ্যাস রাইজারে মুহুর্তের মধ্যে আগুন লেগে সেই আগুনও ছিটকে আসে মঙ্গলীর উপর।
একপর্যায়ে ঘটনাস্থলেই মুমুর্ষ অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন মঙ্গলী। এসময় নিজের মাথায় ও পায়ে গুরুতর আঘাত পেয়ে রক্তাক্ত শরীর নিয়েও মাকে বাঁচাতে প্রাণপন চেষ্টা করেছিলেন পূর্ণিমা। চেষ্টা করেছিলেন মাকে টেনে তোলার। এক পর্যায়ে পূর্ণিমা নিজেই লুটিয়ে পড়েন মাটিতে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা মঙ্গলী ও পূর্ণিমাকে উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে মঙ্গলীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। তবে, ঢাকা মেডিকেলের কর্তব্যরত চিকিৎসক মঙ্গলীকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে, ঘটনার বিষয়ে পূর্ণিমার কাছে জানতে চাইলে শিশুটি দৈনিক যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘আমি মায়ের সাথে জন্ডিস ঝাড়াতে যাচ্ছিলাম। এরপরে কি ঘটেছে, তা আমার মনে পড়ছে না। এখন সুনেছি আমার মা নেই, মারা গেছে। বাবাও মারা গেছে কয়েক বছর আগে। আমার আর কোন ভাই-বোন নেই।’ চোখে মুখে ভয় ও চাপা শোকের মিশ্রণে কান্নারত অবস্থায় কেবল এটুকুই বলতে পেরেছিলেন শিশু পূর্ণিমা।’


