Logo
Logo
×

নগরের বাইরে

রূপগঞ্জ হানাদার মুক্ত আজ

Icon

রুপগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর ২০২১, ০২:৩৩ পিএম

রূপগঞ্জ হানাদার মুক্ত আজ
Swapno

১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর রূপগঞ্জ হানাদার মুক্ত দিবস। ওইদিনে রাজধানী ঢাকার কোলঘেঁষা এ উপজেলা রূপগঞ্জ হানাদার মুক্ত হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকাবাসীর তুমুল প্রতিরোধের মুখে পাকহানাদার বাহিনী এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর রূপগঞ্জ  ছেড়ে পার্শ্ববর্তী কুমিল্লা জেলার অভিমুখে পালিয়ে যায়। হানাদারমুক্ত হয় রূপগঞ্জ। মহান মুক্তিযুদ্ধে রূপগঞ্জের অবদান অবিস্মরণীয়।


মুক্তিযুদ্ধের ৩ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ (বীর-উত্তম) তার ‘এস’ ফোর্স ও মিত্রবাহিনী, তৎকালীন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল জাব্বার খানের পিনু গ্রুপ ও গোলাম দস্তগীর গাজী (বীরপ্রতীক) ওরফে গফুর কমান্ডার গ্রুপসহ প্রায় দুই হাজার মুক্তিযোদ্ধা বিশাল বাহিনী সে দিন বিজয় পতাকা উত্তোলন করে রূপগঞ্জকে শত্রুমুক্ত ঘোষণা করে। মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জনের তিন দিন আগে ১৩ ডিসেম্বর হানাদার পাকবাহিনীকে চার দিক থেকে ঘিরে ফেলে মুক্তিবাহিনীর সহযোগিতায় মিত্রবাহিনী। আগের দিন রাতে কুমিল্লার দিক থেকে আসা পাকসেনাবাহিনীর সঙ্গে পরদিন দুপুর পর্যন্ত সমুখযুদ্ধে হানাদার বাহিনী  কোণঠাসা হওয়ার পর আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়।


১৯৭১ সালের এদিনে রূপগঞ্জকে আনুষ্ঠানিকভাবে হানাদার মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করা হয়। ১৩ ডিসেম্বর ৩নং সেক্টর কমান্ডার রূপগঞ্জের কিংবদন্তি মেজর শফিউল্লাহ তার ‘এস’ ফোর্স ও মিত্রবাহিনী নিয়ে রূপগঞ্জের মাটিতে পা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার আব্দুল জাব্বার খান পিনু তার বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে শফিউল্লাহর সঙ্গে উপজেলার বর্তমান মুড়াপাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ছাদে বিজয়ের পতাকা তুলে রূপগঞ্জকে শত্রুমুক্ত ঘোষণা করেন। তারপর ডেমরায় পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পের সদস্যরা সফিউল্লার কাছে অস্ত্র সমর্পণের পর ১৬ ডিসেম্বর শফিউল্লাহ ঢাকায় আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ৯ মাসের এ যুদ্ধে রূপগঞ্জে ১১ বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। যাদের নামের তালিকাসহ রূপগঞ্জ উপজেলা চত্বরের একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।


স্বাধীনতা উত্তরকালে রূপগঞ্জ থানার ব্যাপ্তি ছিল উত্তরে গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ ও দক্ষিণে কাঁচপুর পর্যন্ত। প্রকৃতির অনাবিল উদার  সৌহার্দ্যে লালিত এ বিশাল এলাকার জনগোষ্ঠী সর্বদাই ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষনে প্রতিবাদী ও সংগ্রামমূখর। ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে রূপগঞ্জবাসীর ছিল স্বতস্ফূর্ত বিপ্লবী ভূমিকা। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে রূপগঞ্জবাসীর অবিস্মরণীয় অবদান বাঙালি জাতির স্বাধীনতার ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বেতার মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণায় উজ্জীবিত কতিপয় তরুণ প্রথমেই হানা দেয় রূপগঞ্জ থানায়।  কেড়ে নেয় থানার অস্ত্র ও গোলাবারুদ।


থানার কতিপয় পুলিশ ও প্রশিক্ষিত আনসার এ তরুণদের সঙ্গে দলভুক্ত হয়। রূপগঞ্জের কৃতী সন্তান ও তৎকালীন সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান তার বাহিনীসহ ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে এসে এ তরুণ যুবক ও আনসারদের নিয়ে তৈরি করেন প্রতিরোধ বাহিনী। কয়েক দিন রূপগঞ্জে অবস্থান করে তরুণদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে তিনি তার বাহিনীসহ রূপগঞ্জের উত্তর-পূর্ব সীমানা থেকে কিছুদূরে নরসিংদী-ঢাকা সড়কের পাঁচদোনায় নরসিংদীগামী পাকবাহিনীর সেনা কনভয়ে প্রথম সফল আক্রমণ রচনা করেন। সেই হানাদার কনভয়কে সম্পূণরূপে পরাস্ত করে তাদের প্রচুর অস্ত্র ও রসদ হস্তগত করে তিনি তার বাহিনী নিয়ে ভৈরব দিয়ে ভারতের দিকে অগ্রসর হন।


রূপগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা এখানেই। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে দলে দলে তরুণ যুবকরা মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য ছুটে যায় ভারতের দিকে ’৭১-এর মে মাস থেকে রূপগঞ্জ হয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের অভয়ারণ্য। ঢাকা সিটির কয়েকটি গ্রুপসহ প্রায় ৫০টি গ্রুপের সহস্রাধিক মুক্তিযোদ্ধা রূপগঞ্জে অবস্থান নেয়। ঢাকার খসরু গ্রুপ, মায়া গ্রুপ, জিন্নাহ গ্রুপ, আউয়াল গ্রুপ, রূপগঞ্জের বর্তমান এমপি গোলাম দস্তগীর গাজী ওরফে গফুর কমান্ডার গ্রুপ, নরসিংদীর মামা সিরাজ গ্রুপসহ স্থানীয় তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায় ৫০টি  গ্রুপ রূপগঞ্জে অবস্থান নেয়। শুরু হয় রূপগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ক্যাম্প করে অবস্থানকারী পাকহানাদার বাহিনীর ওপর অতর্কিত আক্রমণ ও যোগাযোগের পথে প্রতিরোধ ব্যবস্থা। রূপগঞ্জের ভোলাব, ধামচির শালবন, ইউসুফগঞ্জ, কামশাইর, পিরুলিয়া, মাঝিনা, জাঙ্গীর, রূপগঞ্জ, পিতলগঞ্জ, মধূখালী, শিমুলিয়া, গোলকান্দাইল, হোড়গাও হয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের অভয়ারণ্য।


 বৈদ্যুতিক লাইন ও ট্রান্সফরমারগুলো বিস্ফোরক ও মাইনের মাধ্যমে উড়িয়ে দিয়ে সেনা ক্যাম্পগুলোর বৈদ্যুতিক সুবিধা নিশ্চিহ্ন করে  দেওয়া হয়। তারপর শুরু হয় পরিকল্পিত আক্রমণ। ঢাকা-নরসিংদী সড়কের আউখাব এলাকায় কাতরার পুলে আক্রমণ, মুড়াপাড়ার গাউছিয়া জুটমিলের সেনা ক্যাম্পে মর্টার হামলা, জাঙ্গীরের চরে বাঙ্কারে এম্বুস করে হানাদার বাহিনীর রসদ বাহী লঞ্চ ও গান বোটে আক্রমণ, পূবাইল স্টেশনের পাশে রেললাইন উপড়ে ফেলাসহ ইউসুফগঞ্জে হানাদার বাহিনীর অতর্কিত দ্বিমুখী আক্রমণকে প্রতিহত করে পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে তাদের পশ্চাগমনে বাধ্য করাসহ রূপসীতে নদীর ধারে ও বরালুর চরে বাঙ্কার করে নৌপথে যাতায়াতকারী হানাদার বাহিনীর নৌযানে আক্রমণগুলো ছিল রূপগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখযোগ্য ঘটনা।


রূপগঞ্জের উত্তর সীমানায় (বর্তমানে কালিগঞ্জ) মসলিন কটন মিলের সেনা ক্যাম্পে হামলা করে তাদের সম্পূর্ণরূপে পর্যদুস্ত করে  সেখানে অবস্থানকারী শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার ওপর বিমান ও স্থলপথে পাক হানাদারদের সাঁড়াশি আক্রমণকে প্রতিহত করে তাদের ঢাকার দিকে ফেরত যেতে বাধ্য করে রূপগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধারা। অবশ্য এ যুদ্ধে পার্শ্ববর্তী থানার কয়েকজনসহ রূপগঞ্জ থানার ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাতবরণ করেন। ২৭ নভেম্বর রাতে ভোলাব গ্রামে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল প্রায় পঞ্চাশজন মুক্তিযোদ্ধা। সেন্ট্রি ডিউটিতে ছিলেন বকুলসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। অবশেষে ১৩ই ডিসেম্বর রূপগঞ্জ হানাদার মুক্ত হয়।


এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী (বীরপ্রতীক) বলেন, ১৩ ডিসেম্ব আমরা বিজয়ের পতাকা নিয়ে রূপগঞ্জে বিভিন্ন এলাকায় উল্লাস করে হেঁটে বেরিয়েছি।


রূপগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ নুসরাত জাহান বলেন, ১৩ ডিসেম্বর রূপগঞ্জ হানাদারমুক্ত দিবসটি উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র‌্যালী ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
রূপগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার মো: আমানউল্লাহ মিয়া বলেন, ১২ ডিসেম্বর রাত পর্যন্ত পাকবাহিনী নদী পথে রূপগঞ্জ ছেড়ে পালিয়ে যায়। ১৩ ডিসেম্বর রূপগঞ্জের তৎকালীন ১২টি ইউনিয়নের জনগন ও মুক্তিযোদ্ধারা মিলে মুড়াপাড়া ও উপজেলা সদরে বিজয়ের উল্লাস করেছি।

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন