ফতুল্লা নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের ভাবনা
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০৫:২৪ পিএম
# ফতুল্লার মানুষ সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে চায়
# প্রার্থীদের দাবী ইভিএমএ কোন কারচুপি যেন না হয়
# ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবে : এসপি
# সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে : আফরোজা
সব কিছু ঠিক থাকলে দীর্ঘ ৩০ বছর পর ফতুল্লা ইউনিয়নের ভোটররা আগামী ২৬ ডিসেম্বর ভোট প্রয়োগ করবে। অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালি মহলের ইশারায় এখানকার নির্বাচন এতনোদিন আটকে ছিল। গত ১০ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন ফতুল্লা ইউনিয়নের নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করেন। সেই ঘোষনা অনুযায়ী আগামী ২৬ ডিসেম্বর ফতুল্লার ভোট গ্রহন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে এই ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে ৪ জন প্রার্থী সহ নারী এবং পুরুস সদস্য পদে ১২৭ জন প্রার্থী লড়াইয়ে নেমেছে। এর মাঝে ভোটারদের ভোটের মাধ্যমে চেয়ারম্যান পদে ১ জন এবং সংরক্ষিত সদস্য ও সাধারণ সদস্য পদে ১২ জন ব্যক্তি নির্বাচিত হবে। এই ১৩ পদে নির্বাচিত হওয়ার জন্য ১৩১ জন ব্যক্তি মরণ পন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এর মাঝে সবচেয়ে বড় লড়াই হবে চেয়ারম্যান পদে। ৭ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দ হওয়ার পর ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে নিয়ে উৎসব মুখর পরিবেশে গনসংযোগ ও উঠান বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছে প্রার্থীগণ।
খোজ নিয়ে জানাযায়, নির্বাচন অফিসের তথ্যঅনুযায়ী ফতুল্লা ইউপি চেয়ারম্যান পদে চেয়ার দখলের জন্য ৪ জন ব্যক্তি প্রতীক নিয়ে মাঠে আছে। এর মাঝে স্বতন্ত্র প্রার্থী আলী আজম নামের এক ব্যক্তি ঘোড়া প্রতীক পেলেও তাকে এখনো কেউ দেখে নাই। ইসলামী আন্দোলনের হাত পাখার প্রার্থী শাহ জাহান আলী পোষ্টার ও ব্যানার ফেস্টুনে সিমাবদ্ধ। তাকেও কোন ভোটাররা দেখেন নাই। আওয়ামীলীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থী লুৎফর রহমান স্বপন বিভিন্ন এলাকায় উঠান বৈঠক করে প্রচারনা চালাচ্ছেন। সেই সাথে তাদের গুরুর দরবারে যোগাযোগ রাখতে কোন ভূল করেন নাই। তার বিপক্ষে শক্তিশালি প্রার্থী স্বপনের ভাতিজা কাজী দেলোয়ার হোসেন আনারস মার্কা নিয়ে ভোটারদের ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাচ্ছেন। পাশাপাশি ফতুল্লার সমস্যা নিরসনে অঙ্গীকর করে যাচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের মতে চেয়ারম্যান পদে মূল লড়াই হবে চাচা ভাতিজার মাঝে। অন্য প্রার্থীদের ডেমকেয়ার হিসেবে উল্লেখ্য করেন স্থানীয়রা।
এদিকে দীর্ঘদিন পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় উৎসবের আমেজে মেতেছে ফতুল্লাবাসী। বাড়ি-ঘর থেকে শুরু করে চায়ের দোকান পর্যন্ত চলছে নির্বাচনি আলোচনা। কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়ে ফতুল্লার উন্নয়ন অব্যহত রাখবে সেই আলোচনাই সর্বত্র। তবে সবার কথা একটাই ‘সুষ্ঠ নির্বাচন হোক এবং সুন্দর ভাবে যাতে ভোট দিতে পারি’। এর আগে ফতুল্লা ইউনিয়নের সর্বশেষ নির্বাচন হয় ১৯৯২ সনে। তখন নুর হোসেন নামের এক ব্যক্তি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তিতে কয়েক বছর পরে তিনি মারা যান। পরে ১৯৯৬ সালে ফতুল্লা ইউনিয়নের নির্বাচন ঠেকাতে সীমানা সংক্রান্ত জটিলতা দেখিয়ে একটি মামলা করা হয়। মামলার বাদী ছিলেন ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের কুতুবআইল এলাকার বাসিন্দা কদর আলী। এর মাঝে ১০ বছর যাবৎ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন লুৎফর রহমান স্বপন। ১৯৯২ নির্বাচনের পরে এবার প্রায় ৩০ বছর পর নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
ফতুল্লার একাধিক ভোটাররা জানান, ‘এখানে তারা দীর্ঘ ৩০ বছর পর ভোট প্রয়োগ করতে যাচ্ছে। তাদের দাবী এই নির্বাচনে যেন কোন ধরে পেশি শক্তি প্রয়োগ করতে না পারে। সেই সাথে তারা সুষ্ঠ নিরপেক্ষ ভাবে যেন নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে ভোট দিতে পারে প্রশাসনের কাছে এমন দাবী তুলেন। জেলা নির্বাচন অফিসার যেন এখানে সুষ্ঠ ভোটের পরিবেশ তৈরী করেন দেন। এই ইউপিতে প্রার্থীরা জলাবদ্বতার কারণে এখনো ভালো ভাবে প্রচার প্রচারনা মিছিল মিটিং করতে পারে না বলে তারা জানান। কেননা এই এলাকায় চতুর্থ দিকে জলাবদ্বার বিরাট সমস্যা। দীর্ঘ দিন এই সমস্যা সমাধান না হওয়ায় ফতুল্লার মানুষের মাঝে ক্ষোভ আছে। যা কেউ মিটাতে পারে নাই। তবে এবার তারা এর সমাধান চান।’
ফতুল্লা ইউনিয়নের মোট ভোটার সংখ্যা ৫১ হাজার ৫৯ জন। তার মাঝে পুরুষ ২৭ হাজার ১১৫ এবং নারী ২৩ হাজার ৯৪৪ জন। এখানে ২ টি সাব রেজিষ্টার অফিস, ১ টি থানা, ১ টি উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স, জেলা কারাগার, জেলা জজ আদালত, জেলা প্রশাসক এর কার্যালয়, জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়, সিভিল র্সাজন কার্যালয়, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, জেলা পরিষদ কার্যালয়, গণর্পূত অফিস, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, ১ টি রেল ষ্টেশন ও জেলা পশু সম্পদ অফিস রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে জেলার গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয় গুলো অবস্থিত।
ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের ৩ ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. শরীফ বলেন, ‘প্রায় দীর্ঘ ৩০ বছর পর ভোট দিতে যাচ্ছি। তাই আমাদের দাবী এখানে যেন কোন পেশি শক্তি প্রয়োগ করা না হয়। সেই সাথে আমরা যেন সুষ্ঠ ভাবে ভোট দিতে পারি প্রশাসন যেন সেই পরিবেশ সৃষ্টি করে। ১৯৯২ সনে যখন ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হয়েছে তখন আমি ভোটার ছিলাম না। এখন আমি বিবাহিত আমার সহধর্মীনি এবং আমার ছেলে দুজনই ভোটার। আমার পরিবারের ৪জন এবার ভোট দিবো।’
ফতুল্লার লালপুর এলাকারবাসিন্দা বাপ্পি জানান, ‘আমাদের এলাকায় দীর্ঘ দিন নির্বাচন না হওয়ায় অবহেলিত ছিলাম। এখানকার প্রধান সমস্যা জলাবদ্বতা। ভোট দিতে না পারায় নতুন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারি নাই। আর এজন্য আমাদের এই সমস্যার সমাধান হয় নাই। তাই এবারের নির্বাচনে যেন সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারি। এখানে যেন কোন দাঙ্গা হাঙ্গামা না হয়। সে দিকে যেন প্রশাসন লক্ষ্য রাখে। এমন মানুষ আমাদের দরকার যে সত্যিই ফতুল্লার উন্নয়নের জন্য কাজ করবে। আমরাও ভোটের মাধ্যমে এমন ব্যক্তিকে বেছে নিবো।’
ফতুল্লা ইউপি নির্বাচনের বিষয়ে সদর উপজেলার নির্বাচনী কর্মকর্তা আফরোজা খাতুন বলেন, ‘ফতুল্লা ইউপি নির্বাচনের সকল প্রস্ততি আমরা নিয়ে রেখেছি। এখানে ইভিএম এর মাধ্যমে ভোটগ্রহন করা হবে। এখানে সুষ্ঠ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যেহেতু এ ইউপিতে প্রার্থী অনেক বেশি তাই নিরাপত্তার বিষয়টাও কঠোর করা হয়েছে।’
এবিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম বলেন, ‘ফতুল্লায় সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেয়ার জন্য পুলিশ প্রশাসন কাজ করছে। ইতিমধ্যে আমাদের পক্ষ হতে ওই এলাকায় নিরাপত্তা মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসলে তা আরো বাড়ানো হবে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখানে আমরা কোন ধরনের আশংকা করছি না। ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন শতভাগ সুষ্ঠ এবং সুন্দর ভাবে অনুষ্ঠিত হবে। কোন রকমের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে আমরা দিবো না। কেউ যদি বিশৃঙ্খলা সৃষ্ঠি করতে চায় তাকে কঠোরন হস্তে দশন করা হবে। ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবে। সেই অনুযায়ী সকল প্রস্ততিও আমরা নিয়ে রেখেছি।’
ফতুল্লা ইউনিয়নের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী কাজী দেলোয়ার হোসেন, আমরা ৩০ বছর ভোট দিতে পারি নাই। তাই এবার ফতুল্লার মানুষ ভোট প্রয়োগ করতে চাই। আমি বিশ্বাস করি এই এলাকার মানুষ যদি ভোট দিতে পারে তাহলে আমি জয়ী হবো। কারন এবার মানুষ পরিবর্তন চায়। সেই সাথে এখানে পরিবর্তনে বাতাস বইছে। আমি শুনেছি এখানে ইভিএম ভোট গ্রহণ হবে। এই ইভিএমে যেস কোন ধরনের কারচুপি না হয় আমি সেই দাবাী জানাই। আমি মানুষের সেবক হয়ে ফতুল্লার উন্নয়ন করতে চাই। আশা করি মানুষ আমাকে সেই সুযোগ দিবে। অন্যদিকে আওয়ামীলীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থী লুৎফর রহমান স্বপনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তার নাম্বার ব্যস্ত পাওয়া যায়।


