# শামীম ওসমানের ঘাঁটি এখন আইভীর ঘাঁটিতে পরিণত
# কাউন্সিলররা তো বটেই, আইভীর সাথে আপামর জনতার ঢল
# একটি মহল এই প্রকল্পকে ঘিরেও নানা প্রপাগান্ডা ছড়ানোর চেষ্টা করছে
মাত্র তিনবছর আগেও যখন ডিএনডি প্রজেক্ট অনুমোদন পায় সিদ্ধিরগঞ্জবাসী তখনও ভাবতে পারেনি তাদের জন্য কী সুখবর অপেক্ষা করছে। ডিএনডি প্রজেক্টের কারণে যেমনি সিদ্ধিরগঞ্জের বিশাল এলাকার মানুষ জলাবদ্ধতার সমস্যা থেকে মুক্তি পেয়েছে, তেমনি সিদ্ধিরগঞ্জবাসীর নাগরিক সুবিধাও বেড়েছে কয়েকগুন। সিদ্ধিরগঞ্জের ৯টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলররাই তার নিজ নিজ ওয়ার্ডগুলোতে শত শত কোটি টাকার উন্নয়ন করেছেন। এমপি শামীম ওসমানের নির্বাচনী এলাকা হলেও তার অনুসারী অনেক প্রায় সব কাউন্সিলরাই উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় আইভীর পথ অনুসরণ করেছে। প্রায় সকল ওয়ার্ডেই যাতায়াতের আমূল পরিবর্তন হয়েছে। কিছু ওয়ার্ডে খেলার মাঠ, পুকুর সংস্কারের কারণে গোটা ওয়ার্ডের চিত্রই বদলে গেছে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে বর্তমানে চলমান হাতিরঝিলের আদলের সিদ্ধিরগঞ্জের লেক ৩নং ওয়ার্ড থেকে শুরু করে ৮নং ওয়ার্ড পর্যন্ত গোটা সিদ্ধিরগঞ্জের চিত্রই বদলে দিয়েছে।
এবারও নাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। গত দুই নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হলেও সিদ্ধিরগঞ্জে তুলনামূলক শহর ও বন্দরে তুলনায় ভোট কম ছিল। বিশাল কর্মযজ্ঞ আর উন্নয়নের কারণে এবার সিদ্ধিরগঞ্জে আইভীর ভোট দ্বিগুন হয়ে যাবে বলে আশাবাদ করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। গত কয়েকদিন আইভীর নির্বাচনী প্রচারণায় মানুষ যে ধরণের সাড়া দিচ্ছে তাতে তেমন আভাসই মিলেছে। আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক পাওয়ার পরও এখন পর্যন্ত আইভীকে নিয়ে কোন টু শব্দটি করেননি এমপি শামীম ওসমান। তবে তার অনুসারী কাউন্সিলরা নৌকার প্রার্থী আইভীকে নিয়ে গোটা এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। উন্নয়নের যে রথযাত্রায় আইভীর সারথী হয়ে কাউন্সিলরাও তাদের ইমেজ বৃদ্ধি করেছেন তা অব্যাহত রাখতেই কাউন্সিলর ও এলাকাবাসী এমন উদ্যোগ নিচ্ছে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ফতুল্লাবাসী যখন শুষ্ক মৌসুমেও জলাবদ্ধতার সাথে প্রতিনিয়ত লড়ছে অন্যদিকে সিদ্ধিরগঞ্জবাসী পেতে যাচ্ছে হাতিরঝিলের ছোঁয়া। সিদ্ধিরগঞ্জ ভাঙ্গারপুল হতে শিমরাইল গলাকাটা ব্রীজ পর্যন্ত এই প্রজেক্ট নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র থাকাকালীন ডা.সেলিনা হায়াৎ আইভীর হাত ধরে পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে চলতি বছরেই। ইতিমধ্যে হাতিরঝিলের আদলে সিদ্ধিরগঞ্জের লেকের দৃশ্যমান অবস্থা তাই প্রকাশ করছে।
তথানুযায়ী, প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যায়ে সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে ২টি প্যাকেজে সিটি গভারন্যান্স প্রজেক্ট (সিজিপি) এই কাজের বাস্তবায়ন করছে। সর্বমোট ৪৫০ দিনের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। স্টারলাইট সার্ভিসেস লিমিটেড এবং মেসার্স উদয়ন বিল্ডার্স (জেভি) এই প্রকল্পের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। ইতিমধ্যে গত জুলাইতেই ৫০ ভাগ কাজ শেষ হয়ে গেছে। প্রজেক্টের ভাষায় কাজের বিবরণীতে রয়েছে প্রধান খাল পুনঃখনন ও খালের পশ্চিম পাড়ে রাস্তা, ড্রেন, ব্রীজ, ওয়াকওয়ে, ল্যান্ডস্কেপিংসহ সৌন্দর্য্যবর্ধন কাজ। কিন্তু কাজের বিস্তৃতি কত বিশাল যে কেউ না দেখলে হয়তো বিশ্বাস হতে চাইবেনা। স্থানীয়রা ধারণা করেন, এবছর এই প্রজেক্টের কাজটি বাস্তবায়ন হয়ে গেলে সিদ্ধিরগঞ্জে এই প্রজেক্ট এলাকায় হাজারো দর্শনার্থীর আনাগোনা হবে প্রতিদিন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্যমতে, সিদ্ধিরগঞ্জে সিটি করপোরেশনে মাধ্যমে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের আওতায় উপাশেং খাল খনন সাড়ে ৫ কিলোমিটার, আরসিসি ড্রেন তৈরি হচ্ছে ৪ কিলোমিটার., আরসিসি রাস্তা থাকছে সাড়ে ৫ কিলোমিটার, সিসি ব্লক দ্বারা খালের পাড় বাঁধাই, ডিভাইডার ওয়াল সাড়ে ৫ কিলোমিটার, থাকছে এম্ফিথিয়েটার, নৌকা চালানোর ঘাট ৯টি। এখানেই শেষ নয়, আরো থাকছে ভাসমান মঞ্চ ৩টি, ওয়াটার গার্ডেন ৩টি, ঝুলন্ত বাগান ৩টি, পাবলিক টয়লেট, ফোয়ারা থাকছে ২টি, ওয়েটিং সেড ২টি, প্লান্টার বক্স ১৫টি, ডাস্টবিন ২৮টি, স্ট্রীট লাইট সিঙ্গেল ২৮টি এবং ডাবল স্ট্রীট লাইন থাকবে ১৮২টি। এছাড়া এই প্রকল্পে দোলনা থাকবে ৬টি, সুইং স্নাইট ২টি, ঢেকিকল ৭টি, ব্রীজের মই থাকবে ৩টি, সিটিং বেঞ্চ থাকছে ১৩২টি, আরসিসি ব্রীজ থাকছে ৩টি, ফুট ওভারব্রীজ থাকছে ৩টি।
এদিকে এই প্রকল্পটিকে ঘিরে স্বপ্ন দেখছে সিদ্ধিরগঞ্জবাসী। বিশেষ করে সিদ্ধিরগঞ্জের ১ নং ওয়ার্ড থেকে ৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দারা এর সুফল পাবে সবচাইতে বেশি। একসমময় সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলটি একসময় আদমজী পাটকলের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। পাটকলের নিরাপ্ততার স্বার্থে আদমজী পাটকলের সড়কের পাশে একটি কৃত্রিম জলাধার তৈরি করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল সংরক্ষণ রেখে স্থানীয় জনগণ এর পানি ব্যবহার করত পারে এবং অগ্নি নির্বাপনে এ জলাধারের পানি ব্যবহার করা যায়। পরবর্তী কালে এই এলাকয় জনবসতি বৃদ্ধি পাওয়ায় অবৈধ দখল, দূষণ ও প্রতিনিয়ত মানুষের বর্জ্য ফেলার কারণে খালটি ডাম্পিং গ্রাউন্ডে পরিণত হয় এবং খালের অস্তিত্ব বিলীন হতে থাকে। বিলুপ্ত জলাধারটি উদ্ধার ও নির্মল পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রয়াসে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী সিটি গভার্নেন্স প্রকল্পের আওতায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সিদ্ধিরগঞ্জ লেক (শিমরাইল হতে ভাঙ্গারপুল পর্যন্ত) পুনঃখননসহ খালের পশ্চিম পাড়ে রাস্তা, ড্রেন, ওয়াকওয়ে, ল্যান্ডস্কেপিংসহ সৌন্দর্য্যবধন শীর্ষক প্রকল্পটি গ্রহণ করেন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলের পরিবেশ উন্নয়নসহ এলাকাবাসীর দীর্ঘদেনের গণপরিসরের চাহিদা পূরণ হবে। এছাড়া খালটি অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণের সংরক্ষিত জলাধার (রিটেনশন পুকুর) হিসেবে কাজ করবে। অপরদিকে অগ্নিকাণ্ড নির্বাপনের জন্য পানি সরবরাহের একমাত্র প্রধান উৎস হিসেবে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। সিদ্ধিরগঞ্জ লেকটি সংরক্ষণ ও সংস্কারের মাধ্যমে নগরবাসীর একঘেয়েমি জীবন-যাপন পরিবর্তন ও প্রাণোজ্জল করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সিদ্ধিরগঞ্জের সাথে ফতুল্লা এলাকার উন্নয়নের পার্থক্য মোটা দাগে নজরে আসবে। সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার রাস্তা-ঘাট থেকে শুরু করে অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকান্ড যতখানি পরিলক্ষিত হয় সে তুলনায় ফতুল্লা নেহাৎ পেছনে। বিশেষ করে একসময়ের সিদ্ধিরগঞ্জের দশটি ওয়ার্ড তুলনামূলকভাবে সিটি করপোরেশনের অন্যান্য এলাকার তুলনায় পিছিয়ে ছিল। কিন্তু গত ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর মেয়র আইভী দ্বিতীয় মেয়াদে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর গোটা এলাকার চিত্রই বদলে গেছে। এতে জীবনমান যেমন উন্নত হয়েছে, তেমনি আগের যে কোন সময়ের তুলনায় মেয়র আইভীর গ্রহণযোগ্যতা এই এলাকায় জ্যামিতিকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সিদ্ধিরগঞ্জবাসীকে উন্নয়নের সুফল পাইয়ে দেয়ায় আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও মেয়র আইভীর উপর আস্থা রাখতে চাইছেন এলাকাবাসী। সিদ্ধিরগঞ্জের উন্নয়নের চিত্র দেখে ফতুল্লাবাসীও চাইছে সিটি করপোরেশনের সাথে সংযুক্ত হতে। সিদ্ধিরগঞ্জে আইভীর এই কর্মযজ্ঞের কারণে এবার তার ভোট কয়েকগুন বেড়ে যাবে বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
তবে রাজনীতিতে সবকিছুই রাজনৈতিক মোড়ক দেয়ার চেষ্টা করা হয়।তাই সিদ্ধিরগঞ্জে এই বড় প্রকল্পটিকেও নানা মোড়কে মুড়ে দিতে চাচ্ছে একটি মহল। তবে সিদ্ধিরগঞ্জবাসী হাতিরঝিলের আদলে এই লেক পেয়ে তাদের জীবনমান যে বেড়ে গেছে এটি বুঝতে পেরে গেছে। কেননা, অনেক পিছিয়ে পড়া এলাকার জায়গার দামও বৃদ্ধি পেয়েছে, তাছাড়া সেখানকার মানুষের বিনোদনকেন্দ্রের যেই অভাব ছিল, সেটির একটি বড় অংশ পূরণ করতে যাচ্ছে এই লেক। আর তাই তো অবশেষে শামীম ওসমান নিশ্চুপ থাকার পরও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগ আইভীকে জেতাতে গতকাল মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছেন।


