Logo
Logo
×

নগরের বাইরে

এক সামেদ আলীতেই সর্বনাশ

Icon

ফরিদ আহম্মেদ বাধন

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৮:১৫ এএম

এক সামেদ আলীতেই সর্বনাশ
Swapno

একসময় পেটের দায়ে ফতুল্লার ধর্মগঞ্জ মাওলা বাজারে এলাকার বিভিন্ন খাল বিল থেকে মাছ ধরে জীবীকা নির্বাহ করতেন তিনি। মাছ বিক্রি করতে ভোর বেলা আকবরনগর থেকে ধর্মগঞ্জ মাওলা বাজারে ছুটে আসতেন। এখন তিনি দূর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। এলাকায় চাঁদাবাজী,অন্যের জমি থেকে মাটি কাটা থেকে শুরু করে এমন কোনো অন্যায় কাজ নেই যা সামেদ আলীর দ্বারা সংঘঠিত হয়নি। সামেদ আলীর সন্তানগুলোও বাবার মতোই এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েমে গঠন করেছে একাধিক টেঁটা বাহিনী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা টেঁটা-বল্লম উদ্ধারসহ সামেদ আলীর ছেলেদের গ্রেফতার করেও দমাতে পারেনি আকবর নগরে সন্ত্রাস।

 

ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ম্যানেজ করে বক্তাবলী ১ নং ওয়ার্ডের সভাপতির পদও বগল দাবা করেছেন সামেদ। আকবরনগরে রক্তের হলি খেলে এবং সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করে ফতুল্লার রামারবাগে এসে আত্মগোপনে থাকেন সামেদ ও তার বাহিনীর সদস্য। গত কয়েকদিন যাবৎ মুন্সিগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার বালুর চর গ্রামে প্রভাব বিস্তার করতে গিয়েছিলো সামেদ আলী বাহিনী। এতে বাধ সেধে ছিলেন বালুরচর ইউনিয়নের আরেকজন টেঁটা বাহিনীর প্রধান হাসান আলী।  মূলত ইটভাটা বালু মহাল ও বাল্কহেড  থেকে চাঁদা আদায় ও প্রভাব বিস্তার নিয়েই দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্ধ। তবে এরই মধ্যে দুই গ্রামের মধ্যে টেঁটা যুদ্ধের যে সাজ সাজ রব উঠেছিলো গতকাল তেমন দেখা যায়নি। তবে যেকোন সময় বড় ধরনের সংঘর্ষের আশংকা করছে এলাকাবাসী।


বুড়িগঙ্গার একটি শাখা নদী বেষ্টিত আকবরনগর গ্রাম। এই গ্রামে কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান না থাকলেও রয়েছে বেশ কয়েকটি ইটভাটা। অপরদিকে ইটভাটার মাটি ও ট্রলার ব্যবসাকে কেন্দ্র করেই আকবরনগরে থেমে থেমে শুরু হয় সংঘর্ষ। আকবরনগর,বালুর চর ও আনন্দ বাজারে যারা টেঁটা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে তাদেরকে বলা ‘দল’। একেকজন একেকটি দলে বিভক্ত হয়। টেঁটাযুদ্ধে যে দল পরাজিত হয় সে দলের বাড়ি ঘর ভাংচূড়সহ গবাদি পশু  মহা আনন্দে লুটপাট করে বিজয়ী দল। আর গবাদি পশু জবাই করে আদিম নৃত্য করে আনন্দ প্রকাশ করে তারা। টেঁটাতে কাউকে বধ করে হত্যা করতে পারলেও চলে  হৈ হুল্লোড়। শুধু তাই নয়,পরাজিত দলের আত্মীয় স্বজনদেরও এলাকা ছাড়া হতে হয়।

 

এমন চিত্রই বক্তাবলীর আকবরনগর,সিরাজদীখানের বালুর চর ও আনন্দ বাজার এলাকায়। সামান্য কথা কাটাকাটির জেরে এলাকার বিভিন্ন বাড়ি থেকে মুহুর্তেই কয়েক শত টেঁটা বের হয়। এই চরাঞ্চলে টেঁটাই হলো একেকটি দলের মূল শক্তি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন সময় টেঁটা উদ্ধার করলেও যেখানে কয়েক হাজার টেঁটা জমা রাখা হয়,সে জায়গার সন্ধান প্রশাসনের লোকজনও জানে না। যে কারনে আকবরনগর,বালুর চর এলাকা টেঁটা মুক্ত করা যাচ্ছে না কোনভাবেই।


আকবর নগরে হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম হয়েছিলো সামেদ আলী খাঁ ওরফে সামেদ হাজীর। তার বাবার নাম সোবহান খাঁ। অনেক দৈন্য দশায় জীবন কাটাতে হয়েছে সামেদের। তবে ২০/২৫ বছর আগে বক্তাবলীর প্রতাপ নগরে আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে মোতালেব খা নিজে খইল্ল্যাকে প্রতাপ নগরে আনছার আলীর ইটভাটায় জীবন্ত পুড়িয়ে মারে। ঐ মার্ডার করার পর মোতালেব এলাকা ছাড়া হয়ে যায়। মোতালেব ও সামেদ আলী একই বংশের লোক। তবে মোতালেব গা ঢাকা দিলেও সেই সময় সামেদ আলী কৌশলে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয়। তৎকালীন সময়ে কেরানীগঞ্জের কাশেম নেতার  শেল্টারে সামেদ আলী নদীতে শুরু করে ডাকাতি, মাটির ট্রলার থেকে চাঁদা আদায়সহ নানা অপকর্ম।

 

এ কারনে সামেদের টাকা হতে বেশি সময় লাগেনি। বেশ কয়েক বছর আগে মোতালেব তার গ্রামের বাড়িতে ফিরতে গেলে সেখানে বাধ সাধেন সামেদ। তবে মোতালেবের পক্ষে ছিলেন রহিম হাজী ও কাশেম নেতা। এ নিয়ে রহিম ও সামেদের মধ্যে শুরু হয় দ্বন্ধ। এরই মধ্যে জয়নাল হত্যাকান্ডের পুরো দায়ভার সামেদ আলী ও তার বাহিনীর উপর পড়ে। এ ঘটনায় জয়নালের  পরিবার সামেদকে প্রধান আসামী করে তার ৫ ছেলের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করে। সামেদ হয় এলাকা ছাড়া। এই সুযোগে রহিম হাজী ও তার লোকজন সামেদ আলীর ইটভাটার ইট লুটপাটসহ বেশ কয়েকটি মাটির বোটও ছিনতাই করে কেরানীগঞ্জে কাশেম নেতার বাড়ির কাছে খালে নিয়ে আটকে রাখে। যখন সামেদ আলী এলাকায় ফিরতে পারছিলো না, তখনই তিনি বক্তাবলী ইউপির চেয়ারম্যান শওকত আলীর সরনাপন্ন হন।

 

তিনি সামেদ আলী যাতে গ্রামে ফিরতে পারেন সে ব্যাপারে চেষ্টা করেন।  এক বৈঠকে সামেদ আলী ও রহিমের মধ্যে আপোষ মিমাংসা করতে ভুমিকা পালন করেন তিনি। কিছুদিন ফিরে এসেছিলো শান্তি। তবে জয়নাল হত্যা মামলার বিষয়টি সুরাহা না হওয়ায় এলাকায় কিছুদিন পর পরই নিহত জয়নালের আত্মীয় স্বজনদের বাড়িঘরে হামলা চালায় সামেদ বাহিনী। এখনো আকবর নগরের ইটভাটাগুলো থেকে চাঁদা আদায় থেকে শুরু করে মাটির বোট থেকেও চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে সামেদ ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে।


এবার সামেদ আলী আকবর নগরের গন্ডি পেড়িয়ে বালুচরের একটি এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে তৎপর হয়ে উঠে। এতে মুল নেতৃত্ব দেয় সামেদের ছেলে দূর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ওসমান গনি। বালুর চরে আধিপত্য বিস্তার ঠেকাতে সক্রিয় হয়ে উঠে ঐ এলাকায় সন্ত্রাসী হাসান আলী। মূলত আধিপত্য বিস্তার নিয়েই এবারের সংঘাতের শুরু। তবে এবার কেউ হত্যাকান্ডের শিকার হয়নি। পুলিশের জোর তৎপরতায় দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়নি। যে  কোন সময় দুই পক্ষের মধ্যে অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটতে পারে বলেও মনে করছে দুই এলাকার মানুষ।


এব্যাপারে আকবরনগর এলাকার বেশ কয়েকজন জানান, সামেদ আলীর মতো লোক যদি আওয়ামীলীগের নেতা হয়, তাহলে  কিভাবে এলাকা শান্তি হবে। হাজার মানুষ নয়, এক সামেদ আলীতেই পুরো এলাকায় সর্বনাশ হতে সারে। এব্যাপারে ফতুল্লা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মো.রকিবুজ্জামান বলেন, আকবরনগরে দুই থানা পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে, যাতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনা না ঘটে। এব্যাপারে বক্তাবলী ইউপি চেয়ারম্যান শওকত আলী বলেন, সংঘর্ষ কখনোই সুফল বয়ে আনতে পারেনা। দুউ পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা চলছে। অপরাধী যে-ই হউক  বিশ্বাস করি আইন তাকে ক্ষমা করবে না।  

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন