কাক্সিক্ষত সেতু চাইতে গিয়ে মাথা ফাটল গ্রামবাসীর
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৬:৫৫ পিএম
সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়নকে পূর্ব-পশ্চিমে ভাগ করেছে ধলেশ্বরী নদীর একটি শাখা। যা আলীরটেক ইউনিয়ন থেকে চর আলীরটেক, ছমিরনগর, গঞ্জকুমারী, তেলগিরাসহ কয়েকটি গ্রামকে বিচ্ছিন্ন করেছে। এসব গ্রামের বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের চাহিদা নদীর উপর একটি সেতু। বিভিন্ন সময় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি পেলেও কাঙ্ক্ষিত সেতু আর হয়নি। শেষে সেতু নির্মাণ নিয়ে রক্তাক্ষয়ী কান্ডও ঘটেছে। এক গ্রামের ১২ জনের মাথা ফেটেছে।
পাশাপাশি একাধিক গ্রামের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, যাতায়াতের সুবিধার্থে গ্রামবাসী নদীর উপর একটি সাঁকো নির্মাণ করে। সেই নড়বড়ে সাঁকো দিয়েই যাতায়াত করছিল ওই গ্রামগুলোর বাসিন্দারা। তবে প্রায় সময় সাঁকোটিকে ভাঙ্গা অবস্থান পান গ্রামবাসী। জানা যায়, ধলেম্বরীর শাখা নদী দিয়ে মুন্সিগঞ্জ থেকে রাতের বেলায় বাল্কহেড যাতায়াত করে। বিভিন্ন সময় নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে গেলে বাল্কহেডের ধাক্কায় সাঁকোটি ভেঙ্গে যায়।
রাতের বেলায় ঘটনাগুলো ঘটার কারণে এ বিষয়ে তেমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয় না বলে জানায় স্থানীয়রা। ফলে প্রত্যেকবার গ্রামবাসীকেই উদ্যোগ গ্রহণ করে সাঁকোটি মেরামত বা নির্মাণ করতে হয়। কয়েক মাস পূর্বে চরআলীরটেক গ্রামে সাঁকোর পাশে স্থানীয় প্রকৌশল অধিদপ্তর একটি সাইনবোর্ড সাঁটায়।
তাতে উল্লেখ করা হয়, চরআলীরটেক সড়ককে ছমিরনগর সড়কের সাথে সংযুক্ত করার জন্য প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ৬০ মিটারের সেতু নির্মাণ করা হবে। এ সংবাদে আনন্দিত হয় উভয় গ্রামবাসী। তবে তাদের এই আনন্দ বেশিদিন টেকেনি। কিছুদিন পরই দেখা যায় সেতুটি ধলেশ্বরীর শাখা নদীতে না হয়ে পাশের একটি খালে হচ্ছে। যা আলীরটেক ও মাঝেরচর গ্রামকে সংযুক্ত করে। এতে ক্ষুদ্ধ হয় চরআলীরটেক, ছমিরনগরসহ আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা। এ উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে গত ৫ ফেব্রুয়ারি গ্রামবাসীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেখানে চরআলীরটেক এলাকার ১২ জন গুরুতর আহত হয়েছে।
চরআলীরটেক, ছমিরনগরসহ আশপাশের গ্রামবাসীরা বলেন, সেতুর সংবাদ পেয়ে আমরা অনেক আনন্দিত ছিলাম। কিন্তু সম্প্রতি আমরা দেখতে পাই সেতুটি মাঝেরচর এলাকায় হচ্ছে। কিছুই বুঝতে না পেরে চেয়ারম্যানের কাছে গেলাম। উনিও আমাদের কোনো সমাধান দিলেন না, তবে সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ দেখলাম। পরদিন আবার দেখলাম কাজ চলছে। চেয়ারম্যান বললেন, তোমরা নিজেরা বাধা দাও। শুক্রবার সকালে আমরা বাধা দিতে গেলে মাঝেরচর এলাকার গ্রামবাসী সেতু নির্মাণের রড, বড় ইট ও লাঠিসোটা নিয়ে আমাদের মারধর করে।
এ ঘটনায় আহত নুরুল হক বলেন, ‘আমরা নির্মাণ কাজে বাধা দেয়ার জন্য সাঁকো পেরিয়ে ওই পাড় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা আমাদের মারতে থাকে। আমাদের কারো মাথা ফাঁটিয়ে দেয়, কারো, হাত-পা ভেঙ্গে দেয়। এরপর এ ঘটনায় আমরা যখন মামলা করতে যাই তখন আমাদের চেয়ারম্যান সাহেব আমাদের বাধা দেন। আমরা থানায় গিয়েছিলাম কিন্তু উনি আমাদের মামলা করতে দেননি। বলেছেন তিনি মিমাংসা করবেন।’
আরেকজন ভুক্তভোগী পিয়ার আলী বলেন, ‘সাইনবোর্ড অনুযায়ী ব্রীজ (সেতু) আমাদের এখানে হওয়ার কথা ছিল। সেখানে কেন হচ্ছে আমরা বুঝতে পারছি না। ওইদিন বাধা দিতে গিয়ে আমিসহ নুরুল হক, নূর আলী, সাবেক ফরিদ মেম্বার, রফিকুল, গোলাপ হোসেন, রুবেল, মজিবুর, শাহ আলম, হৃদয়, সজিব আহত হই।’
শাহ আলম বলেন, ‘শেষবার আমাদের সাংসদ সেলিম ওসমান আমাদের এলাকায় যখন এসেছিলেন তখন তিনি আমাদের ওয়াদা দিয়েছিলেন আমাদের এই ব্রিজটা তিনি করে দিবেন। আমাদের শুধু একটাই দাবি, তিনি যেন আমাদের ব্রিজ করে দেন।’ আলীরটেক ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদ্য সাবেক মেম্বার মো. শাহীন বলেন, ‘আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। তবে শুনেছি, সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। অনেকে আহত হয়েছে। তবে প্রকল্প বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’
এ বিষয়ে আলীরটেক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাকির হোসেনের সঙ্গে যোগযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার এলাকায় কোনো সংঘর্ষ হয়নি। দুই এলাকার মানুষের মধ্যে একটা বিতর্ক হয়েছিল। আমি সব মিমাংসা করে দিয়েছি।’ তবে সেতু নির্মাণ প্রকল্প কিংবা কোন স্থানে এটি নির্মাণ করলে অধিক সংখ্যক মানুষ উপকৃত হবে, এসব প্রশ্নের জবাবে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নারায়ণগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী তাজুল ইসলাম তুহিন বলেন, ‘আমাদের ১৫ মিটারের একটি কার্লভার্ট বানানোর প্রকল্প আসে। আমরা যখন সাইট পরিদর্শনে গেলাম দেখা গেল, ওই এলাকায় ব্রিজের প্রয়োজন। ধলেশ্বরীর ওই শাখা নদীতে ১৫ মিটারের কার্লভার্টে হবে না। এছাড়া ওই নদীতে আরেকটি বড় ব্রিজ আছে, কুড়েরপাড় ব্রিজ। সরকারিভাবে একই নদীতে পাশপাশি ব্রিজ করা হয় না।
তাই শাখা নদীর পার্শ্ববর্তী একটি খালে ১৫ মিটারের পরিবর্তে ৬০ মিটারের একটি ব্রিজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা সংঘর্ষের বিষয়ে শুনেছি এবং রবিবার এলাকাটা আবার পরিদর্শন করেছি। এমপি সহোদয়ের সঙ্গেও এ বিষয়ে আমাদের কথা হয়েছে। এখন যে কাজ শুরু হয়েছে সেটা আমরা বন্ধ করতে পারবো না। তবে আমরা গ্রামবাসীদের বলেছি, কুড়েরপাড় ব্রিজ থেকে ওই গ্রাম পর্যন্ত যে রাস্তাটি আছে আমরা তা ঠিক করে দেবো। যাতে মানুষের অসুবিধা না হয়।’ চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সেতু নির্মাণ শেষে রাস্তার কাজ শুরু করা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এলজিইডির এই কর্মকর্তা।


