পুলিশের উপর হামলার মূলহোতা শাহিন অধরা
যুগের চিন্তা অনলাইন
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৫:২৪ পিএম
# গ্রেপ্তার এড়াতে টাকা দিয়ে নানা চেষ্টা
# এলাকায় পুলিশ প্রবেশ করলে সিসি ক্যামেরায় দেখে পালিয়ে যায়
# মাদকব্যবসা করে রাজমিস্ত্রী থেকে কোটিপতি হন শাহিন
প্রশাসনের সকল কর্মকর্তা বিভিন্ন সময়ে তাদের বক্তৃতায় বলে থাকেন যারা মাদককারবারী করে তাদের কোন ছাড় দেয়া হবে না। বিশেষ করে পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা এই বক্তব্য বেশি দিয়ে থাকেন। সেই সাথে জনপ্রতিনিধিরাও বলেন যারা মাদক ব্যবসা করে তারা দেশ ও সমাজের সত্রু। সামাজিক ভাবেও মাদককারবারি, মাদক সেবনকারী এবং এদের যারা শেল্টার দেয় তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়েতোলার আহবান জানান।
পুলিশের কর্মর্কতারা সব সময় বলে থাকেন মাদকের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান সর্বদা জিরো টলারেন্স। তাদের দেয়া সেই বক্তব্য অনুযায়ী পুলিশ প্রশাসনের টিম বিভিন্ন সময় বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালান। তাদের অভিযানে অনেক মাদককারবারী গ্রেপ্তারও হন। অভিযোগ রয়েছে এই মাদকের বিরুদ্ধে সচেতন মহল প্রতিবাদ জানিয়ে তার কোন প্রতিকার করতে পারেন না। কেননা কিছু জায়গায় মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে পুলিশ প্রশাসনের লোকদের সম্পর্ক থাকে।
এদিকে সম্প্রতি রোববার রাতে ফতুল্লা তল্লা রেললাইন এলাকায় রাতে পুলিশের একটি টিম অভিযান চালাতে গেলে এদের পুলিশের সোর্স ভেবে তাদের উপর একদল মাদককারবারি সন্ত্রাসী কায়দায় হামলা চালায়। এই হামলায় পুলিমের কয়েকজন সদস্য গুরুতর ভাবে আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান এই হামলা কারীরা ওই এলাকার মাদক সম্রাট শাহিনের বাহিনী। অনেকে আবার মাদকের ডন হিসেবে জানেন মাদক ব্যবসায়ী শাহিনকে। ফতুল্লা তল্লা এলাকার নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি জানান, এই এলাকায় শাহিনের নেতৃত্বে ৩০০ লোকের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ টি কিশোর গ্যাং বাহিনী রয়েছে।
যাদের ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পর্যন্ত পান না। আর পাবেই বা কিভাবে যারা পুলিশের উপর সন্ত্রাসী কায়দায় হামলা করতে পারে তাদের কাছে সাধারণ মানুষ মামুলি ব্যাপার। তারাতো পাবলিককে কোন কেয়ারই করেন না। তাই সচেতন মহলে মাঝে প্রশ্ন উঠেছে মাদককারবারিরা পুলিশের উপর হামলা করার সাহস পায় কি করে।
খোঁজ নিয়ে জানাযায়, রোববার রাতে পুলিশের একটি টিম তল্লা রেললাইন এলাকায় সিএনজিযোগে অভিযান চালাতে যান। তখন তাদের মাদক ব্যবসায়ী শাহিনের সহযোগী সাইদুল তাদের প্রবেশ করতে বাধা প্রদান করেন। একপর্যায়ের পুলিশ বহনকারী চালককে সোর্স ভেবে তারা তাকে মারধর করেন। সেই সাথে পুলিশের ৩ সদস্যের উপর হামলা করে তাদের রক্তাক্ত করেন। এসময় পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় আহতরা হলেন, পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) রফিকুল ইসলাম তার দুই কনষ্টেবল নিয়ে বাধা দিলে সন্ত্রাসীরা তাদেরও মারধর করে আহত করেন। সেই সাথে চালক জাহিদুলকে মারধর করে আহত করেন তারা।
অন্যদিকে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে জানান, ফতুল্লা তল্লা রেললাইন এলাকায় হাজীগঞ্জ পর্যন্ত শাহিনের নেতৃত্বে দেদারসে মাদক ব্যবসা পরিচালিত হয়। তার এই মাদক ব্যবসা পরিচালনার জন্য কবির হোসেন বাবু সহ ২০ থেকে ৩০ জন ছেলে নিযুক্ত থাকে। সন্ধ্যা হলেই ওই এলাকার ওলিতে-গলিতে তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে মাদক ব্যবসা করে থাকেন। এই মাদক বিক্রেতাদের পরিচালনা করেন মাদকের ডন শাহিন। এছাড়ার ওই এলাকায় যেন কোন ফর্মা প্রবেশ করতে না পারে সুমন এবং তন্ময়ের মাধ্যমে কয়েকজন লোক রাখা হয়েছে।
এর আগে ইয়াবাসহ সুমন পুলিশের কাছে গ্রেপ্তার হন। মাদককারবারি শাহিন তল্লা এলাকায় বিভিন্ন জায়গায় গোপনীয় ভাবে সিসি ক্যামেরা ফিট করে রেখেছে। ওই এলাকায় যখন পুলিশ পেশাক পরে প্রবেশ করে তখন তিনি তা ক্যারার মাধ্যমে মোবাইলে দেখতে পান বলে জানান স্থানীয়রা। এই শাহিনের বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। এমনকি এর আগে তিনি মাদক সহ পুলিশের কাছে একাধিকবার গ্রেপ্তার পর্যন্ত হন। পরে জামিন পেয়ে আবার মাদক সম্রাজ্য গড়ে তোলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তল্লা এলাকার এক ব্যক্তি জানান, শাহিন যখন দেখে পুলিশ তার এলাকায় প্রবেশ করছে তখন তিনি তার আস্তানা থেকে পালিয়ে যান। তাই এবার যখন পুলিশের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে তিনি বুঝতে পেরেছেন তাকেও গ্রেপ্তার করা হতে পারে। কেননা তার বাহিনীই পুলিশের উপর হামলা চালান। এই শাহিন একসময় রাজমিস্ত্রী কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
মাদক ব্যবসার বদৌলতে কয়েক কোটি টাকার মালিক হয়ে যান তিনি। আর এতে রাতারাতি তার জীবন যাত্রার মান বদলে যায়। এক সময়ের রাজমিস্ত্রী এখন ফতুল্লা তল্লা রেললাইন এলাকার মাদকের ডন হিসেবে পরিচিত।এদিকে পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় সোমবার রাতে পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে ২৭ জনের নাম উল্লেখ করে আরও অজ্ঞাত ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এ মামলায় এজাহারনামীয় ১২জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলো-সাকিব, হৃদয় হাসান, সাইদুল ইসলাম ওরফে সাগর ওরফে সাধু, রবিউল, জাহাঙ্গীর, জুয়েল, আতিক হাসান, রাফি, বাবু, মাসুদ রানা, আল আমিন ও কাউসার। কিন্তু মাদককারবারি শাহিনের ১২ জন গ্রেপ্তার হলেও তিনি ধরাছোঁয়ার বাহিরে রয়েছে। তার কিছু হবে না বলে কয়েকজন কথিত সাংবাদিক তাকে আশ্বস্ত করেন। তার পরেও গ্রেপ্তারের ভয়েব আাছে এই শাহিন।
শাহিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তল্লা এলাকার স্থানীয় লোকজন বলেন, দীর্ঘ দিন ধরেই নগরীর খানপুর রেললাইন, তল্লা,সবুজবাগ, হাজ্বীগঞ্জ সহ ওই এলাকার ওলিতে গলিদে মাদক ব্যবসা পরিচালিত হয় শাহিনের নেতৃত্বে। এর আগেও পুলিশের এক এস আইকে মারধর করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। মাদকের ডন হিসেবে পরিচিত শাহিনের বিরুদ্ধে ফতুল্লা মডেল থানায় ৬টি এবং সদর মডেল থানায় ২ টি মাদক মামলা রয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানাযায়, গতবছর ১২ মার্চ ফতুল্লা সবুজবাগ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১ লক্ষ ২৩ হাজার ইয়াবাসহ শাহিন, তার সহযোগী শাহ আলম, আল আমিন, নাছির, আলমগীরকে গ্রেপ্তার করে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে ২০১৫ সনে ২০ এপ্রিল মাদক দ্রব্য গাঁজা, ২০১৭ সনে ৪ অক্টোবর,২০১৮ সালের ২৪ জুন ইয়াবা মামলা রয়েছে শাহিনের বিরুদ্ধে। ২০১৯ সনে আজমেরীবাগ এলাকা থেকে ১৬’শ ইয়াবা পিছসহ গ্রেপ্তার হন তিনি।
এছাড়াও গতবছরের ৫ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম তল্লা এলাকা থেকে ৭শ পিছ ইয়াবা ট্যাবলেট, এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি ৭৫০ পিছ ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন এই মাদক ব্যবসায়ী শাহিন। তাই ফতুল্লা বৃহত্তর এলাকার মানুষ দাবী তোলেন মাদকের ডন শাহিনকে গ্রেপ্তার করে স্থায়ীভাবে এখানে মাদক ব্যবসা বন্ধ করার ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানা। সেই সাথে প্রশ্ন তোলেন মাদকের ডন শাহিন কবে গ্রেপ্তার হবেন। তাকে ক্রস ফায়ার দেয়া উচিৎ বলে মনের করেন স্থানীয়রা। কেননা তার কারণে যুব সমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ‘আমাদের কাছে যে অপরাধী আমরা তাকেই গ্রেপ্তার করবো। এখানে কে শাহিন কে এলাকার ডন তাঁর দিকে তাকাবো না। এই হামলার সাথে যার জড়িত আছে তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’


