ভরাটের কবলে মরুভূমির দিকে ধাবিত হচ্ছে সোনারগাঁয়ের বিস্তীর্ণ এলাকা
আশরাফুল আলম
প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৮:১৮ পিএম
শিল্প বাণিজ্য, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অপরিকল্পিত নগরায়নের নামে অব্যাহত ভরাটের কবলে পড়ে মরু ভূমির দিকে ধাবিত হচ্ছে পর্যটন নগরী সোনাগাঁয়ের বিস্তীর্ণ এলাকা। উপজেলার ১০ টি ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে খাল-বিল, সরকারী খাস সম্পত্তি, ফসলি জমি, পুরনো পুকুর আর জলাশয় ভরাট করে অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে উঠছে একের পর এক শিল্পকারখানা, বাড়িঘর, মার্কেট ও দোকানপাটসহ নতুন নতুন স্থাপনা।
বিগত কয়েক বছরে উপজেলা সদরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কয়েকটি প্রাচীন শাখা নদী ও অসংখ্য খাল-বিল, পুকুর-জলাশয় ভরাট করে ফেলেছে স্থানীয় ভূমিদস্যুরা। সোনারগাঁয়ের নাগরিক সমাজ ও সচেতন মহলের অভিযোগ, উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, দালালচক্র ও ভূমিদস্যুদের সহযোগিতায় দখল ও ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করে চলেছেন ছোট বড় বিভিন্ন শিল্পকারখানার মালিক কর্তৃপক্ষ।
ভরাটের কবলে পড়ে প্রতিদিন উপজেলার আশপাশে অবরুদ্ধ হচ্ছে শাখানদী গুলোর গতিপথ ও পানির উৎসমুখ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, দালালচক্র, ভূমিদস্যু ও সোনারগাঁয়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিল্পকারখানার মালিক কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে দেদারছে দখল ও ভরাট হচ্ছে ফসলি জমি, পুরনো খালবিল, জলাশয় ও পুকুর গুলো। পাশাপাশি সড়ক ও জনপথের ব্রিজ ও কালভার্টের মুখ মাটি ফেলে পানি প্রবাহের পথ বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। এর ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে শিল্প ও পর্যটন নগরী সোনারগাঁ।
প্রশাসনিক কোন বাধা না থাকায় নির্বিঘ্নে পরিবেশ বিধবংসী কার্যক্রম চলছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। সচেতন নাগরিক সমাজের ভাষ্য, মানুষের মাঝে সচেতনতার অভাব এবং প্রশাসনিক নজরদারি না থাকার কারনেই ফসলি জমি, খাল-বিল ও জলাধার গুলো দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, খাস জমি দখল ও ভরাট বিষয়ে বিভিন্ন সময় স্থানীয় প্রশাসন ও ভূমি কার্যালয়ে অভিযোগ করলেও কোন কাজে আসছেনা। প্রকৃত পক্ষে পরিবেশ গত উন্নয়নে উপজেলা পর্যায়ে কারো কোন দায় দায়িত্ব নেই বললেই চলে।
বিগত সময়ে পরিবেশ অধিদপ্তর নদীতে দূষিত বর্জ্য ফেলার দায়ে কয়েকটি শিল্পকারখানার মালিককে জরিমানা করলেও দখল ও ভরাট বিষয়ে তাদের কোন নজরদারি নেই বললেই চলে। পরিবেশবিদদের মতে, তিনটি নদীবেষ্টিত সোনারগাঁয়ের চারপাশে অসংখ্য খাল-বিল, নদীনালা, ফসলি জমি, মাছ আর জীববৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ ছিল পুরো এলাকা। কিন্তু উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতি মানসিকতা, ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ন্যে সে সব আজ হুমকির সম্মুখীন।
উপজেলা সদরের জামপুর, নোয়াগাঁও, কাঁচপুর, মোগরাপাড়া, সাদীপুর, বারদী, সনমান্দি, বৈদ্যেরবাজার, পিরোজপুর ও শম্ভুপুরায় ছিল বিস্তীর্ণ বিল। যেখানে সারাবছরই নিচু জমি ও ডোবায় পানি জমে থাকত। সেগুলো ভরাট করে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, বাড়িঘর, দোকানপাটসহ নতুন নতুন স্থাপনা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইন অনুযায়ী, যেকোনো আবাসন বা বড় উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) করে এর অনুমোদন নিতে হয়। প্রয়োজন হয় অবস্থানগত ছাড়পত্রের। এসবের পর পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করতে হয়। এসব ছাড়পত্র পেলে তবেই মাটি ভরাটসহ অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ করতে হয়।
কিন্তু সোনারগাঁয়ে অবস্থিত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রক্রিয়া অবলম্বন না করে এবং পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই বালু ভরাট করে নদী ও কৃষকদের জমি জোরপূর্বক দখল করেছে। অব্যাহত দখল, ভরাট ও দূষণের কবলে পড়ে সোনারগাঁয়ের বিরাট একটি অংশ অস্তিত্ত্ব সঙ্কটে পড়েছে। পাশাপাশি দখল ভরাটের কবলে বর্ষা মৌসুমে জলাধারে পানি জমতে না পারায় ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে।
শুস্ক মৌসুমে খরার প্রভাবে ফসলি জমি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্য পূর্ণ সোনারগাঁ এলাকা স্থায়ীভাবে মরুকরনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এব্যাপারে স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন, নাগরিক কমিটি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিগত সময়ে পরিবেশ রক্ষায় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও কর্তৃপক্ষ তৎপর হয়নি।
এই ধারা আর কিছুদিন অব্যাহত থাকলে শুস্ক মৌসুমে এলাকাবাসী সুপেয় পানির সংকটে পড়বে। একই সঙ্গে কৃষি ও জীববৈচিত্র্যে বিরূপ প্রভাব এবং বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার স্থায়ীরূপ নিবে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।


