মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চায় পঙ্গু আব্দুল বাতেন
এস এম শাহাদাত
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২২, ০৫:১৬ পিএম
রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ড পেরাব এলাকার পঙ্গু আব্দুল বাতেন মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৮ বছরের এক টকবকে যুবক। মুক্তিযুদ্ধে নাম লেখাতে না পারলে সবসময় পাশে থেকে সহযোগিতা করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের। অস্ত্র লুকিয়ে রাখা, নৌকা দিয়ে খাল বিল পরাপার করা, মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার সরবারাহ করা, পাক বাহিনীর অবস্থান সর্ম্পকে খবরা খবর নিয়ে মুক্তিবাহিনী জানানোর কাজটি কতেন যুবক বাতেন।
এক সময় এসব কাজ করতে গিয়ে পাক বাহিনীর হাতে তিন মুক্তিযোদ্ধাসহ ধরাও পড়ে যান বাতেন । তিন মুক্তিযোদ্ধা ও বাতেনসহ চারজনকে একসারিতে দাড় করিয়ে গুলি করে পাকবাহিনী । পাকবাহিনীর গুলিতে তিনজন মারা গেলেও অদৃশ্য কারনে প্রানের বেচেঁ যান বাতেন। পাকবাহিনীর গুলিতে প্রানে বেচে গেলেও পঙ্গুত্ব থেকে রক্ষা পায়নি বাতেন এমন বিভিষিকাময় ঘটনার বর্ননা দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন বাতেন। পঙ্গু বাতেন গুলিবৃদ্ধ হয়ে পায়ের চিকিৎসার খরচ যোগাতে নিজের ভিটে বাড়ি বিক্রি করে সর্বশান্ত হয়ে গেছেন।
আব্দূল বাতেন তার জীবনে কঠিন মুহুর্তগুলো কথা শেয়ার করেন কালের কন্ঠ রূপগঞ্জ প্রতিনিধি এস এম শাহাদাতের সাথে তিনি বলেন, আমার পঙ্গু জীবনের ইতিহাস তোমরা জেনে কি করবা? এখন তো স্বাধীন দেশের নাগরিক তোমরা। দেশ স্বাধীন হয়েছে। বাংলাদেশ উন্নত হয়েছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হল আমার মত বাতেনের জীবনের কোন পরিবর্তন হল না।
পঙ্গু পা নিয়ে ক্ষোভের শুরে বাতেন বলেন , মাঝে মাঝে নিজেকে স্বান্তনা দেই আমি পঙ্গু হয়েছি আমার ভিটে বাড়ি বিক্রি করেছি তো কি হয়েছে? স্বাধীন দেশের নাগরিক তো হয়েছি। আব্দুল বাতেন আরো জানান, ১৯৭১ সালের জুলাই মাস। তখন তার বয়স ২৮ বছর। কাঞ্চন, ভুলতা ও যাত্রামুড়া এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ডার পিনু খাঁন ও মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ ভূঁইয়ার সঙ্গে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকা দিয়ে বরপা,
কর্নগোফ, পেরাবসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যেতাম। অনেক সময় মুক্তিবাহিনীর অস্ত্র লুকিয়ে রাখতাম যাতে মিলিটারীরা না পায়। মুক্তিবাহিনীর খাবার বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে দিয়ে আসতাম। নৌকার মাঝি সেজে পাক বাহিনীর অবস্থান সর্ম্পকে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর এনে দিতাম। এক সময় এসব কাজ করতে বরপা এলাকার মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ ভূঁইয়ার বাড়িতে আশ্রয় নিলাম আমি।
পাকিস্থানী বাহিনীরা যখন জানতে পারল আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সকল ধরনের সহযোগীতা করে আসছি। তখন ছিল আগষ্ট মাস।হটাৎ একদিন পাকবাহিনী সৈন্যরা রূপগঞ্জের আড়িয়াব এলাকার হানা দেয়। এসময় একই যায়গা থেকে বরপা এলাকার মুক্তিযোদ্ধা দীন মোহাম্মদ, মুক্তিযোদ্ধা মনির, মুক্তিযোদ্ধা আরব আলী ভুইয়া ও আমাকেসহ চার জনকে ধরে নিয়ে বরপা নুরুউদ্দিন হাজীর বাড়িতে এক লাইনে দাড় করিয়ে গুলি করে।
এসময় আমি আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে মাঠিতে লুটিয়ে পড়ি। পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে আমাদের ৪ জনের মধ্যে তিনজন মারা যান। ভাগ্যক্রমে আমার হাটুর উপর অংশ দিয়ে গুলি বের হয়ে আমি বেঁচে যাই। । সেই থেকে পায়ের ক্ষত নিয়ে আজও যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছেন আব্দুল বাতেন। পায়ের চিকিৎসা জন্য নিজের ভিটা বাড়ি বিক্রি শেষ ।
গুলির যন্ত্রণা নিয়ে এখনো কষ্টে বেঁচে আছি আমি। তিনি আরো বলেন, তহন মনে সাহস আছিলো। মরণের ভয় করি নাই। চিন্তা করছি দেশ বাঁচাইবার লাগলো। ভারতের গেরিলা ট্রেনিংও নিবার পারি নাই। পিনু খাঁন আর সিরাজ ভূঁইয়া যা ফরমায়েশ করবার করতো তাই করতাম। কোন সময় হগলতে ঘুমাইতো, আমি রাত জাইগা পাহারা দিতাম।
আবার কোন সময় রাস্তা ক্লিয়ার আছে কিনা হেইডার খবর লইতাম। মাঝে মাঝে খাবার-দাবার আইনা দিতাম। বাপ-মায়ে বকা দিতো। আমি মাইরে কইছিলাম, মা আমি যুদ্ধে যামু। তুমি না কইরো না। বাবা যাইতে দিল না। এ মুক্তিবাহনীর সহযোগিতা করতাম। দেশ স্বাধীন অওয়ার দেড় বছর পরে হালিমা খাতুনরে বিয়া করলাম। বউয়ের বাপে বিয়াও দিবার চায় নাই।
পঙ্গু মাইনষের কাছে কি বিয়া দিবো এমন কথা কইতো। পরে আল্লার ইশারায় বিয়া অয়। অনেক আগেই বাপ মইরা যাইতাম। আমার বিবি হালিমা সবসময় আমারে সাহস দিতো। সরেজমিনে পেরাব এলাকার আব্দুল বাতেনের বাড়ি ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে আব্দুল বাতেনের জীবন চলছে খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। তার ৩ ছেলে ও দুই মেয়ে।
জমিজমা যা ছিলো তা বিক্রি করে নিঃস্ব। জমি বিক্রি করে দুই মেয়েকে বিয়ে দেন। তিন ছেলে যে যার মতো সংসার করছে। কেউ খবর নেয় না। প্রতিদিন বাতেনের ২০০ টাকার ঔষুধ প্রয়োজন। এর উপড় সংসার খরচ। সব কিছু মিলিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছেন আব্দুল বাতেন। আব্দুল বাতেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে কালের কন্ঠেকে বলেন, বাজান হয়তো ট্রেনিং করবার পানি নাই।
সরকারের কাছ থেইক্যা যদি সনদ পাইতাম তাইলে মনডারে সান্তনা দিতাম। কোন ভাতাও পাই না। অহন মা’র কথা মনে অইলে খারাপ লাগে। মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করতে গিয়া যদি পঙ্গু না অইতাম, তাইলেতো অন্য ভালা কামকাজ কইরা খাইবার পারতাম। পঙ্গু অওনে কেই ভালা কাজ দেয় না। বাতেন বলেন, বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধারদের জন্য আনেক কিছু করেছেন।
আমার অনুরোধ আমার মত বাতেনের জন্য কিছু করবেন। মরার আগে য়দি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেতাম। আমার পঙ্গু জীবনে কোন দুঃখ রাখতনা। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার একটাই চাওয়া আমাকে যেন তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেন। একই এলাকার মুক্তিযোদ্ধা জাকির হোসেন বলেন, আমার যুদ্ধ করেছি ঠিক অনেক সুবিধাও পাচ্ছি ।
কিন্তু বাতেনও দেশের বন্য কম করেনি। তারও অবদান ছিল। রূপগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আমানউল্লাহ বলেন, বাতেন ভাই কোন কাগজ করতে পারেনি । তার জন্য কিছু করা দরকার। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহ নুসরাত জাহান বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। খোজখবর নিয়ে জেনে ব্যবস্থা নিব।


