ঐতিহ্যবাহী কাইকারটেক হাটে গলাকাটা হাসিল, ক্রেতার ভোগান্তি
লতিফ রানা
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২২, ০৪:৪৮ পিএম
# ইজারা অনেক বেশি, এবছর লোকসান ছাড়া উপায় নাই : রোমান বাদশা
# ২০ হাজার টাকার ছাগলে ২৫০০ টাকা হাসুলী, ৬০০ টাকা দালালী : ক্রেতা
নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্য সোনারগাঁয়ের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে গড়ে উঠা কাইকারটেক হাট। এই হাটটি প্রায় তিনশত বছরেরও বেশি পুরানো (অনেকের মতে ৪০০ বছরেরও বেশি) বলে জানায় স্থানীয়রা। হাটটি ঘিরে নারায়ণগঞ্জ ও তার আশপাশের জেলার ব্যবসায়ীদের মিলনমেলা তৈরি হচ্ছে বছরের পর বছর। নদী ও সড়কপথের পাশে অবস্থিত এই হাটে ক্রেতাদের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে এলেও গুরুত্ব কমেনি কোনো অংশেই। শতবর্ষী বটবৃক্ষের নিচে অবস্থিত এই হাটটি আজও তার অস্তিত্বের জানান দিয়ে আসছে।
এখানে সপ্তাহে একদিন অর্থাৎ প্রতি রোববার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্রেতারা পণ্য সামগ্রী নিয়ে এখানে চলে আসে। শুধু সোনারগাও বা নারায়ণগঞ্জ নয়, অন্যান্য জেলা থেকেও এখানে ক্রেতা এবং বিক্রেতারাও এখানে তাদের পণ্য কেনাবেঁচার জন্য এখানে চলে আসে। নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কুমিল্লা, নরসিংদীর ব্যবসায়ীরাও ছুটে আসেন এই হাটে।
এই হাটটির উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দিক হলো এই হাটটি বিশাল বড়, তাই এখানে মানুষের নিত্য-প্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যই পাওয়া যায় এবং অন্যান্য হাটের তুলনায় এখানে অনেক কম মূল্যে পণ্য পাওয়া যায়। এখানে হাস-মুরগী ও কবুতরসহ কোন প্রকার উৎসব ব্যতীত-ই গরু ছাগলও কেনাবেঁচা করা হয়। তবে বর্তমানে এখানকার ইজারাদারসহ কিছু অতি উৎসাহীদের অর্থ লালসার কারণে ক্রমেই হাটটি তার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলছে।
অতীতের তুলনায়, এমনকি সাম্প্রতিক সময়ের যেকোন বছরের তুলনায় এখনকার দ্রব্য মূল্য অন্যান্য হাটবাজারের তুলনায় আর কম রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এর মধ্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে তা হলো বকরী, খাসি বা ছাগলের হাসিল। বিভিন্ন অভিযোগের কারণে সেখানে সরেজমিনে গিয়ে বিভিন্ন ক্রেতার সাথে আলাপ করে যে চিত্র ফুটে উঠে তাহলো যদি ছাগলের দাম হয় ১৫ হাজার টাকা,
শতকরা ১২ টাকা হারে এর হাসিল আসে ১৮ শত টাকা। রাউন্ড ফিগারে যা ২ হাজার হয়ে যায়। সব মিলে দাম দিতে হবে ১৭ হাজার টাকা। এখানেই শেষ নয়, আপনি যখন ছাগল কিনতে যাবেন তখন আপনার পেছনে দালাল থাকবে দুই থেকে তিনজন, তাদের হাতে তুলে দিতে হবে কমপক্ষে ৫০০ টাকা। এখানে প্রকৃত বিক্রেতা পেল ১৫ হাজার টাকা অথচ ক্রেতাকে খরচ করতে হলো ১৭ হাজার ৫০০ টাকা।
এখানকার বেশিরভাগ হাসিলেই ক্রয় মূল্য লেখা থাকলেও হাসিল কত টাকা ধার্য্য করা হয়েছে তা উল্লেখ করেন না। অন্যদিকে গরু ক্রেতাদের আছে বিশেষ সুযোগ। ৫০ হাজার টাকার নিচে যেকোন মূল্যে গরু কিনলে হাসিল হবে ১৫ শত টাকা এবং এর ঊর্ধ্বে হলে হাসিল হবে ২ হাজার টাকা। এমন তারতম্যের কারণ এখানে ছাগল বিক্রেতার সংখ্যা বেশি কিন্তু গরু বিক্রেতার সংখ্যা কম। তাই গরু বিক্রির পরিমাণ বাড়ানোর জন্যই এই উদ্যোগ।
রোববার কাইকারটেক হাটের বিভিন্ন বিক্রেতাদের সাথে কথা বললে তারা তাদের নাম পরিচয় প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, আমাদের নাম জানালে পরে আমরা এখানে আর বসতে পারবো না।
আমাদের পেশা হলো সপ্তাহের বিভিন্ন দিন বিভিন্ন হাটে বসে ব্যবসা করা। এর মাধ্যমে আমাদের পরিবার চলে। তাদের সাথে বলে জানা যায়, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার তাদের ভাড়াও বেশি দিতে হয়। যে সব দোকান আগে একদিনের জন্য ২ থেকে ৩ শত টাকা ভাড়া দিতেন তারা এখন ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা হারে ভাড়া দিচ্ছেন।
শহর থেকে আসা এক ক্রেতা জানান, তিনি ২০ হাজার টাকায় দুইটি ছাগল কিনেছেন। এর জন্য হাসিল দিতে হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকা। এসময় তিনজন দালাল তার হয়ে কাজ করেছেন দাবি করে ছয়শত টাকা নিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা এখান থেকে কম দামে ক্রয় করতে পারব ভেবে আসি কিন্তু কমদামে কিনতে পারলেও হাসুলী এবং দালালদের কারণে সে দাম আর কম থাকে না। তিনি আরও জানান এখানে দালাল ছাড়া কোথাও কোন ক্রেতার সাথে কথা বলারও সুযোগ থাকে না।
এই বিষয়ে কথা বললে, ইজারাদার ডা. আব্দুল হামিদ প্রধানের ছেলে রোমান বাদশাহ জানান, গতবছর এই হাট মাত্র ৩৭ লাখ টাকায় ইজারা নিতে পেরেছি। কিন্তু এই একই হাট এই বছর ইজারা নিতে হয়েছে ৯০ লাখ টাকায়। তার সাথে ভ্যাট ট্যাক্সসহ ইজারায় মোট খরচ হয়েছে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। তাই বাধ্য হয়েই আমাদের হাসিলসহ অন্যান্য দোকান ভাড়া বাড়াতে হয়েছে।
এর পরও এবছর তারা কমপক্ষে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা গচ্চা খাবেন বলে জানান তিনি। তবে দালালের বিষয়ে তিনি জানান, দালাল সব হাটেই থাকে। তাই এখানেও আছে। তিনি দাবি করেন, দালাল থাকাতে ক্রেতাদের দামাদামী করা অনেকটা সহজতর হয়েছে।


