বালির তলায় ডুবেছে রূপগঞ্জের রূপ প্রকৃতি
রূপগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ মে ২০২২, ১০:২৮ পিএম
ইতিহাস আর ঐতিহ্যের তীর্থস্থান শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীবেষ্টিত প্রাচ্যের ড্যান্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলা। এক সময়ের নদীর পলি দোআঁশ মাটিতে সোনালী আঁশ পাটের ফলনের কারনে ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠে প্রায় ১৩টির অধিক জুটমিল। এসব জুটমিলের ৮টিই গড়ে ওঠে রূপগঞ্জে। পাশাপাশি নদী পাড়ে আখ চাষে ব্যাপক ফলন হওয়ায় সোমবাজার এলাকায় গড়ে ওঠেছিলো চিনি উৎপাদন কারখানা। শুধু তাই নয়, নদী পারে ইটা তৈরির জন্য ভাটাও গড়ে ওঠে সমানতালে।
এ উপজেলার রূপ সৌন্দর্যে ভাটায় যে কয়টি স্থাপনা দায়ী, তার মাঝে অন্যতম ঢাকা সিলেট মহাসড়ক। যদিও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হওয়াতে ওই সড়কের পাশে গড়ে ওঠে বৃহত্তর শিল্প কারখানা। তবে প্রকৃতি বিলীনে এ সড়কের প্রভাবই বেশি। এছাড়াও বর্তমানে এশিয়ান বাইপাস, ৩শফুট সড়কসহ অসংখ্য উন্নয়ন স্থাপনা বাড়াতে বিলীন হয়েছে প্রকৃতি।
সূত্র জানায়, এ উপজেলাটি এক সময় রাজধানী ঢাকা জেলার অধীনে থাকলেও ১৯৮৬ সালের পর তা নারায়ণগঞ্জ জেলার অধীনে চলে যায়৷ স্বাধীনতা পরবর্তী বর্তমান ৭টি ইউনিয়ন রূপগঞ্জ সদর, মুড়াপাড়া, কায়েতপাড়া,দাউদপুর,ভোলাবো, ভুলতা,গোলাকান্দাইল এবং কাঞ্চন ও তারাবো পৌরসভা নামে ২টি পৌর শহর রয়েছে।
এরআগে, বর্তমান গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ও তুমুলিয়া ইউনিয়ন এবং নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়ন যুক্ত ছিলো রূপগঞ্জ উপজেলা অংশে। রাজধানীর কোলঘেষা এ উপজেলার ভৌগোলিক অবস্থানের কারনে এর রূপগঞ্জ সদর, দাউদপুর ইউনিয়নের একাংশ এবং নাগরী ইউনিয়নের দুটি মৌজায় ১৯৯৬ ইং সাল থেকে নির্মাণ শুরু হয় পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প।
আর এ প্রকৃল্প ঘিরে পুরো রূপগঞ্জের আবাসন কোম্পানির হানায় স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের জমি নামেমাত্র মুল্যে ছাড়তে বাধ্য হয়। এভাবে রূপগঞ্জের ফসলের মাঠ,টেকটিলা আর বনসহ প্রকৃতির রূপ সৌন্দর্যে ভাটা পড়তে শুরু হয়৷ বর্তমানের শিল্পায়নের কারনে উপজেলার শীতলক্ষ্যার পূর্বপাড়ে প্রায় সব জমি চলে যায় শিল্প কারখানার দখলে।পাশাপাশি পূর্বাচলের প্রভাবে ওই অঞ্চলেও বাড়তে থাকে আবাসনের দৌড়াত্ন্য।
অথচ ৯০ এর দশকে রূপগঞ্জের রূপ সৌন্দর্যের তালিকায় ছিলো ধামছি,কুচিলাগড়, গুচ্চগ্রাম, কুলিয়াদি ও গোবিন্দপুরের ভাওয়াল রাজার বনাঞ্চল। এসব বনে মেছো বাঘ, বানর,হরিন,শেয়াল,বাঘডাস, বেঁজি, শাপ ইত্যাদি বন্য প্রাণীর দেখা মিলতো। ছিলো টেক,টিলা,খাল বিল আর ছোট বড় দীঘিসহ অসংখ্যা পুকুর৷ প্রাচীন স্থাপনা হিসেবে এ উপজেলায় এখনো দেখা যায় মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি, ভোলাবোর পাল বাড়ি, হিড়নালের ৪শত বছরের পুরনো বট গাছ, ভুলতার দীঘি, মাছিমপুরের দীঘি।
এখনো টিকে আছে পিতলগঞ্জ মধুখালীর সরকার টেক, গুতিয়াবোর চন্ডিতলা, জাঙ্গীরের অচিনতলা, কাঞ্চনের তালতলা, হাটাবোর কাঠবেলী বাগান, গোলাকান্দাইলের প্রাচীন হাট, আর দাউদপুরের দিগন্তজোড়া ফসলি মাঠ আর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তৈরী কর কৃত্রিম খাল,কাঞ্চন পৌরসভার বীরবট তলা, কায়েতপাড়ার বালু নদীর ঘাট।
তবে বালির আগ্রাসনে হারিয়ে গেছে ডিঙ্গামারার খাল ও বিল, হিড়নালের খাল, কাটাখালীর খাল, কালাদির খালসহ শতশত বিল আর খাল, পুকুর, ডোবা আর দীঘি। হারিয়ে গেছে পূর্বাচলের আশপাশের টেক টিলা আর নয়নাভিরাম সবুজ প্রকৃতি। বর্তমানে যেদিকে চোখ যায় সেখানেই বালির আবরনে থাকা অনেকটা মরুভুমির চিত্রই দেখা যায়।
তবে এখনো টিকে আছে দাউদপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে থাকা ফসলি মাঠ। রূপগঞ্জের প্রকৃতির স্বাক্ষী হয়ে আজো সবুজের ঢেউ খেলানো লতা পাতায় আর ফসলি মাঠে চোখ জুড়ায় প্রকৃতি প্রেমিদের।
এমন সব গ্রামের একটি ওই ইউনিয়নের জিন্দা গ্রামে প্রবেশ করতেই দেখা মেলে সাঁড়ি সাঁড়ি দাড়িয়ে থাকা ফল ফলাদির বৃহৎ গাছ। আর কুলিয়াদি এলাকায় এখনো দেখা যায় উঁচু উঁচু টেক টিলা। যা সিলেট রাঙ্গামাটি ভ্রমণের কিছুটা স্বাদ যোগায়। পাশাপাশি দাউদপুরের আগলা বাগলার মোড়ের তালতলা যেন একখন্ড স্বর্গীয় খন্ড। যেখানে সকাল বিকাল স্থানীয়দের আড্ডায় মুখরিত থাকে। একস্থানে বসে রূপগঞ্জ ও কালীগঞ্জের ১৪টি গ্রাম দেখা যায়৷ এসব গ্রামের মাঝে রয়েছে, জিন্দা, মানিকপুর, বায়াসূতি, বর্তূল, কামালকাঠি, চাইরপাড়া, টেংরা,টিওরি, হানকুর,মাধবকুর, রোহিলা, দুয়ারা,পুটিনা,আগলা,বাগলা।
স্থানীয় বাসিন্দা আশিকুল ইসলাম খোকন বলেন, রূপগঞ্জের প্রকৃতির স্বাক্ষী হয়ে আছে দাউদপুরের এ অঞ্চল। এখানে শহরের লোকজন বেড়াতে আসে। বর্ষায় শাপলা আর পদ্মবিলে নৌকা নিয়ে ঘুরে যেতে পারে। আর এখন ফসলের মাঠ দেখতেও আসে লোকজন।
রূপগঞ্জের প্রবীণ বাসিন্দা আলম হোসেন বলেন, রূপগঞ্জ এখন শিল্প নগরী। এ শিল্পের যাত্রা প্রাচীনকালেই শুরু হয়েছিলো। জগৎ বিখ্যাত মসলিন কাপড় এ অঞ্চলেই তৈরী হতো। বর্তমানে জামদানী তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। প্রকৃতি তার আপন চিত্র হারাতে বাধ্য হয়েছে শুধুমাত্র শিল্প বিপ্লবের কারণেই। দাউদপুরের বেলদী এলাকার বাসিন্দা রিফাত আহমেদ তুষার বলেন, রূপগঞ্জের আনাচে কানাচে প্রকৃতির ছোঁয়া ছিলো। যা ক্রমেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে যত্রতত্র গাছ কাটা, বসত ঘর বাড়ানো আর মানুষের প্রয়োজনে সড়ক বাড়ানোর কারনে প্রকৃতি বিলীন হয়েছে। এসব রক্ষা বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের ভুমিকা ছিলো না বললেই চলে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কর্মকর্তা (উপ পরিচালক) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, জমির মালিক তার মালিকানা ছেড়ে দিলে তা নিয়ে মন্তব্য করার সুযোগ নাই। তবে বন বিভাগ বা কোন সরকারি স্বার্থ সংশ্লিষ্টতা পেলে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে।এমই/জেসি


