৩৪ মামলার আসামীর তিন সশস্ত্র দেহরক্ষী
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২২, ০৪:৪৬ পিএম
রূপগঞ্জের শীর্ষ সন্ত্রাসী। হত্যা, ডাকাতি, রাহাজানি, ধর্ষন, চাঁদাবাজি, অপহরনসহ ৩৪ মামলার আসামী ও মোশা বাহিনীর প্রধান মোশারফের রয়েছে ৩ জন সশস্ত্র দেহরক্ষী। তারা যখন তখন আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে ও গুলি ছুড়ে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করছে। স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ এক নেতার আর্শিবাদে মোশা এখন আরও বেপরোয়া।
দেশের নতুন মেঘা সিটি পূর্বাচলে গড়ে তুলেছেন ভয়ংকর এক অপরাধের সাম্রাজ্য। গত শুক্রবার এই মোশা ও তার বাহিনী দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামকে হত্যার চেষ্টার পর সে ঘটনায় এখন আটক রয়েছেন। এদিকে একজন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীর সশস্ত্র তিনজন দেহরক্ষী নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। এই সন্ত্রাসী কিভাবে কোন নিয়মানুযায়ী পেলেন গ্যানম্যান রাখার অনুমোদন সে প্রশ্ন করছেন কেউ কেউ।
বিভিন্ন সূত্র থেকে থেকে জানা যায়, উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নাওড়া গ্রামের মোতালেবের ছেলে দূধর্ষ সন্ত্রাসী ও মোশা বাহিনীর প্রধান মোশারফ হোসেন মোশা ১৯৯৬ সালে তার আপন বড়ভাই শাহআলমের শরীরে এলোপাথারী শাবল ঢুকিয়ে নৃশংসভাবে হত্যাকান্ডের মাধ্যমে সন্ত্রাসী জীবনে আত্মপ্রকাশ করে।
এরপর গত ২৬ বছরে এই মোশা ক্রমেই হয়ে উঠেছে ভয়ংকর আর দূধর্ষ। হিন্দু নারীদের প্রকাশ্য তুলে নিয়ে ধর্ষনের ঘটনা ছিল মোশার কাছে নিত্যদিনের ঘটনা। তার অত্যাচারে নাওড়া গ্রামের ২'শ সংখ্যালঘু পরিবার এলাকা ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমিয়েছেন। জমি দখল আর পূর্বাচলের বিভিন্ন আবাসন প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদাবাজি করে মোশা গড়ে তুলেছেন ভয়ংকর এক কিলার বাহিনী।
এই বাহিনীর মধ্যে হিংস্র আর ভয়ংকর হিসেবে পরিচিত তার ভাই আনোয়ার, সাখাতুল্লাহ এবং বাহিনীর সেকেন্ড ইউ কমান্ড আব্বাস। যাদের নাম শুনলে সে এলাকার সাধারন মানুষ এখনও ঘরে খিল এটে বসে থাকেন। তারা ক্রমেই অপরাধের সাম্রাজ্য বৃদ্ধি করে যাচ্ছেন। লুটপাট, ডাকাতি, মাদক ব্যবসা আর ঘরবাড়ি ও জমি দখল তাদের অর্থের অন্যতম উৎস।২৭ বার জেলে থাকা এই ভয়ংকর সন্ত্রাসীর নামে রাজধানীর খিলক্ষেত, মোহাম্মদপুর, ভাটারা, বাড্ডা, রামপুরা, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ, আড়াইহাজার আর রূপগঞ্জে রয়েছে ৩৪ টি মামলা। অধিক সাহসী আর ক্ষতিগ্রস্ত কিছু মানুষই কেবল মামলা করতে সাহস করেছেন তার বিরুদ্ধে।
মোশার আরও শত শত অপকর্ম চাপা পরেছে কেবল মানুষ সাহস করে মামলা করতে না পারার কারণে। মোশার গ্যানম্যানেরা প্রকাশ্য আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে চলাচল করলেও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে থাকতে হয় নিরুপায় হয়ে। মোশার ক্ষমতার উৎস খুজতে গিয়ে জানা গেছে ক্ষমতাসীন দলের রূপগঞ্জের শীর্ষ নেতার হাত রয়েছে তার কাধে। এ কারণে যা খুশি করে বেড়াচ্ছেন ভয়ংকর এই সন্ত্রাসী।
গত শুক্রবার দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান ও রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের একাংশের নেতা আলহাজ্ব রফিকুল ইসলাম একটি কুলখানীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গেলে ফ্লিমি স্টাইলে তার উপড় হামলা করে মোশা ও তার বাহিনীর লোকেরা। এসময় তার ৩ দেহরক্ষীসহ ২০/২৫ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী মিলে গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণ শুরু করে । গুলি ও বোমার শব্দে প্রকম্পিত হয়ে উঠে পুরো এলাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোশা তার গডফাদারকে খুশি করতে গত বছরের অক্টোবর মাসে রাজধানীর একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অফিসে বসে রফিকুল ইসলামকে হত্যার ছক আকেন। এরপর কয়েক দফা রফিকুল ইসলামকে হত্যার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় মোশার। গত শুক্রবার সময়মতো পুলিশ ও র্যাব ঘটনাস্থলে পৌছে গেলে এ দফাও মিশন ব্যর্থ হয় তার।
এরপর থেকে আত্মগোপনে চলে গেছে গত রবিবার রাতে রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে তাকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তাকে গ্রেফতারের খবরের পর থেকেই এলাকার মানুষ বলতে শুরু করেছেন মোশার অপরাধের সাতকাহন। দিচ্ছেন একেকটি অপরাধের লোমহর্ষক বর্ণনা।
তবে সর্বাধিক আলোচিত হচ্ছে তার সশস্ত্র তিনজন দেহরক্ষী রাখার ঘটনা। অতি সম্প্রতি রূপগঞ্জ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান শাহরিয়ার পান্না সোহেল এর দেহরক্ষী প্রকাশ্য গুলি করে হত্যা করেছেন একজনকে। এরপর থেকেই রূপগঞ্জ জুড়ে রয়েছে গ্যানম্যান আতংক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার এক কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে জানান, রাষ্ট্রের কোন গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তি অথবা ব্যবসায়ী বাস্তবিক নিরাপত্তার অভাব হলে ১৮৭৮ সালের আর্মস অ্যাক্ট এবং ১৯২৪ সালের আর্মস রুলস অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শর্ট ব্যারেল অথবা লং ব্যারেল অস্ত্রের আবেদন করে কাছে রাখতে পারেন।
তবে নিজের নিরাপত্তার অভাব বোধ করলে অস্ত্রের লাইসেন্স এর আবেদন করতে পারেন। তবে তাকে অবশ্যই জেলা প্রশাসনের লিখিত অনুমতি নিয়ে থানা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করতে হবে এবং বাৎসরিক নূন্যতম ২ লাখ টাকা আয়কর প্রদান করতে হবে। তবে গ্যানম্যান নিয়োগ গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিগণের অধিক ঝুকির আশংকা থাকলেই কেবল দেয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে তাকে অবশ্যই রাষ্ট্রের অতিব গুরুত্বপূর্ন অথবা শিল্পপতি কিংবা সিআইপি পদমর্যাদার হতে হবে। তদুপরি গুলিবর্ষনের সঠিক কারন, গুলির হিসেব থানায় এবং জেলা প্রসাশককে লিখিতভাবে জানাতে হবে।
সূত্রমতে, মোশারফের তিন দেহরক্ষী যখন তখন গুলিবর্ষন করে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করলেও সে হিসেব এখন পর্যন্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কারও কাছে জানাননি তারা । তাছাড়া জেলা প্রশাসক কিংবা থানা পুলিশও জানেনা তার গ্যানম্যান পোষার বিষয়ে। একটি সূত্র জানান, সামরিক বাহিনীর অবসর প্রাপ্ত সদস্যরা এই গ্যানম্যান হিসেবে বেসামরিক ব্যক্তিদের চাকুরি করে আসছেন।
তবে সেটা কতোটুকু বৈধ উপায়ে হচ্ছে সে ব্যাপারে ধারনা নেই সংশ্লিষ্টদের। অনুসন্ধান করে জানা গেছে, রূপগঞ্জে ১৫ জন নাগরিক বর্তমানে গ্যানম্যান নিয়ে চলাচল করছেন। এরমধ্যে ১/২ জন বৈধভাবে সকল আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে গ্যানম্যান নিয়োগ দিয়েছেন কিংবা পাবার যোগ্যতা তাদের রয়েছে। তবে অধিকাংশ ব্যক্তি নেননি কোন অনুমোদন। তাছাড়া একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক, রাহাজানিসহ বিভিন্ন অপরাধে মামলা চলমান আছে।
সূত্র জানান, গ্যানম্যান নিয়োগদাতা ব্যক্তিগণের ২/১ জন শিল্পপতি কিংবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তি। বাকি সবাই সরকারি দলের সমর্থক। তারা এসব গ্যানম্যান নিয়োগ দিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় শীর্ষ নেতার শেল্টারে। সে নেতা নিজে বিভিন্ন দপ্তরে তদবির করে অবৈধভাবে এসব গ্যানম্যানকে সন্ত্রাসীদের নিরাপত্তায় রেখেছেন। এ কারণে তাদের গ্যানম্যানরাও বেপরোয়া হয়ে অপরাধ কর্মকান্ড সংঘটিত করছে।
অপরদিকে সন্ত্রাসী মোশারফ কোন ব্যবসায়ী কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তি নয়। নয় জনপ্রতিনিধি কিংবা দলীয় পদধারী। এরপরও ৩ জন সশস্ত্র গ্যানম্যান নিয়ে চলাচলের কারনে প্রশাসনের নিরপক্ষেতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সে এলাকার মানুষ।
এ ব্যাপারে রূপগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ এএফএম সায়েদ জানান, মোশারফের বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ থানায় একাধিক মামলা চলমান আছে। সে কোন উপায়ে গ্যানম্যান পেয়েছে সেটা আমরা জানি না। তিনি থানা পুলিশকে সশস্ত্র গ্যানম্যান নিয়োগের ব্যাপারে অবহিত করেন নি।
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. মঞ্জুরুল হাফিজ জানান, রূপগঞ্জে কে কিভাবে কতোজন গ্যানম্যান নিয়োগ দিয়েছেন তা তিনি সঠিকভাবে জানেন না। তবে লিখিতভাবে এ ব্যাপারে তার কাছে তথ্য চাওয়া হলে তিনি নথিপত্র বের করে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানাবেন। আলাদাভাবে সন্ত্রাসী মোশারফ অনুমতি নিয়ে গ্যানম্যান নিয়োগ দিয়েছেন কি না সে ব্যাপারেও অবগত নন তিনি।এমই/জেসি


