বারদীতে ভগবান সমাহিত মন্দিরে লোকনাথ ব্রহ্মচারীর তিরোধান উৎসব
সোনারগাঁ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২২, ০৭:৪৪ পিএম
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার বারদিতে সাধক শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর ১৩২তম তিরোধান উৎসব। বৃহস্পতিবার ভোর থেকে আশ্রমে পূজা অর্চনা, গীতা পাঠ, কীর্তন, রাজভোগ, বাল্য ভোগ ও প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। দেশ বিদেশের ভক্তরা এসেছেন লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রমে।
বাঙালি হিন্দুদের কাছে একটি অতি আদরণীয় নাম লোকনাথ ব্রহ্মচারী। তিনি বাবা লোকনাথ নামে সর্বাধিক পরিচিত। তাঁর বিখ্যাত বাণী রণে বনে জলে জঙ্গলে যখনই বিপদে পড়িবে, আমাকে স্মরণ করিও, আমিই রক্ষা করিব। হিন্দু ধর্মালম্বী লোকজন বিশ্বাস করেন বাবা লোকনাথের আশীর্বাদ সাথে থাকলে কোন বিপদ কাছে ঘেঁষতে পারেনা। জন্মাষ্টমী তিথিতেই জন্ম হয়েছিল লোকনাথ ব্রহ্মচারীর।
লোকনাথ ব্রহ্মচারী ১১৩৭ বঙ্গাব্দ বা ইংরেজি ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন যশোর জেলা আর বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগানা জেলার বারাসাত মহকুমার চৌরশী চাকলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম রামনারায়ণ ও মায়ের নাম কমলা দেবী। বাবা ছিলেন ধার্মিক ব্রাহ্মণ। পিতা-মাতার চতুর্থ সন্তান ছিলেন তিনি। লোকনাথকে সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করানোর জন্য ১১ বছরে উপনয়ন দিয়ে পাশের গ্রামের ভগবান গাঙ্গুলীর হাতে তুলে দেন। এ সময় তাঁর সঙ্গী হন তার বাল্যবন্ধু বেনীমাধব।
উপনয়ন শেষে লোকনাথ, বেনীমাধব ও ভগবান গাঙ্গুলী পদযাত্রা শুরু করেন। বিভিন্ন গ্রাম-শহর, নদ-নদী, জঙ্গল অতিক্রম করে প্রথমে কালীঘাটে এসে যোগ সাধনা শুরু করেন। এইরূপে গুরুর আদেশে বিভিন্ন স্থানে যোগ সাধনা ও ব্রত করে শেষ পর্যন্ত লোকনাথ ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেন। তারপর শুরু হয় দেশ ভ্রমণ। প্রথমে হিমালয় থেকে কাবুল দেশে আসেন। সেখানে মোল্লা সাদী নামে এক মুসলমানের সঙ্গে পবিত্র কোরআন শরীফ ও বেদ-সহ বিভিন্ন শাস্ত্র নিয়ে আলোচনা করে ইসলামধর্মের তত্ত্বজ্ঞান লাভ করেন। এবার গুরুকে বাদ দিয়ে তাঁরা দুজনে পদযাত্রায় আবার দেশভ্রমণ শুরু করেন।
প্রথমে আফগানিস্তান, পারস্য, আরব, মক্কা-মদীনা, মক্কেশ্বর তীর্থস্থান, তুরস্ক, ইতালি, গ্রিস, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, ইউরোপ-সহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে দেশে ফিরে আসেন এবং পরে দেশের ভিতর হরিদ্বার, হিমালয় তীর্থ, বদ্রীনাথ, সুমেরু পর্বত, কাশিধাম ও কাবুল পরিদর্শন করেন। দিনে দিনে গুরুর বয়স একশ বছর ও শিষ্যদের বয়স পঞ্চাশ বছর হলো। গুরুদেব ভগবান গাঙ্গুলী শিষ্য দুজনকে শ্রী তৈলঙ্গস্বামীর (হিতলাল নামে যিনি পরিচিত) হাতে তুলে দিয়ে পরলোক গমন করেন।
সোনারগাঁয়ের বারদীর জমিদার নাগ মহাশয় লোকনাথের কথা শুনে তাঁর জন্য জমি দান করেন এবং সেখানে মহা ধুম-ধামের সঙ্গে আশ্রম স্থাপন করা হয়। লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রমের কথা শুনে দেশ-দেশান্তর হতে বহু ভক্ত এসে ভিড় জমাতে থাকেন। অল্প সময়ের ব্যবধানেই বাবার আশ্রম তীর্থভূমিতে পরিণত হয়। সেদিন ছিল ১৯শে জৈষ্ঠ, রবিবার। বাবা নিজেই বললেন তার প্রয়াণের কথা।
বহু মানুষ আসেন তাকে শেষ দর্শন করার জন্য। কথিত আছে একসময় লোকনাথ মহাযোগে বসেন। সবাই নির্বাক হয়ে অশ্রুসজল চোখে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন কখন বাবার মহাযোগ ভাঙ্গবে। কিন্তু ঐ মহাযোগ আর ভাঙ্গেনি। শেষ পর্যন্ত বেলা ১১.৪৫ মিনিটে দেহ স্পর্শ করা হলে তার দেহটি মাটিতে পড়ে যায়। ত্রিকালদর্শী বাবা লোকনাথ তার ভক্তদের উদ্যেশে বলেছেন, প্রতিদিন রাতে শোবার সময় সারাদিনের কাজের হিসাব-নিকাশ করবি অর্থাৎ ভাল কাজ কী কী করেছিস আর খারাপ কাজ কী কী করেছিস, যে সকল কাজ খারাপ বলে বিবেচনা করলি সে সকল কাজ আর যাতে না করতে হয় সেদিকে খেয়াল রাখবি।
আবার তিনি বলেছেন, সূর্য উঠলে যেমন আঁধার পালিয়ে যায়। গৃহস্থের ঘুম ভেঙ্গে গেলে যেমন চোর পালিয়ে যায়, ঠিক তেমনি বার-বার বিচার করলে খারাপ কাজ করবার প্রবৃত্তি পালিয়ে যাবে। বারদী অবস্থান কালে ভক্তগণ কৃপার জন্য তার নিকট আসতেন। এক ভক্ত তার পুত্রের দুরারোগ্য যক্ষ্মার মুক্তির জন্য তার নিকট আসেন। লোকনাথ বুঝতে পারেন সেই পুত্রের আয়ু শেষ হয়ে এসেছে। তবুও ভক্তকে কৃপা করে যক্ষ্মা রোগ নিজ শরীরে গ্রহণ করেন। পুত্র ধিরে ধিরে রোগ মুক্ত হলেও কিছুদিনের মধ্যেই তার মৃত্য হয়। কিন্তু যক্ষ্মা রোগ লোকনাথের শরীরে ক্রমে ক্রমে বাড়তে থাকে।
এরপর ১৯ জৈষ্ঠ্য তিনি তার দেহত্যাগের ঘোষণা দেন। এই সংবাদ পেয়ে ভারাক্রান্ত ও অশ্রুসিক্ত ভক্তগণ দলে দলে আসতে থাকে বারদীর আশ্রমে। সেখানে তিনি সবাইকে প্রসাদ গ্রহণ করতে বললেন। এরপর ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১২৯৭ বঙ্গাব্দে ১ জুন ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দ সোনারগাঁয়ের বারদী আশ্রমে মহাসমাধি মগ্ন হলেন। এসময় তার বয়স ছিল ১৬০ বছর। ভক্তগণ উচ্চস্বরে কাঁদতে কাঁদতে বাবার দেহ মন্দির থেকে তুলে এনে বিল্বতলে রাখেন। দেহ সৎকারের জন্য আনা হয় ঘি ও চন্দন কাঠ। বাবা লোকনাথের পূর্ব নির্দেশনা মোতাবেক, বাবার দেহ আশ্রমের পাশে চিতায় রেখে দাহকার্য সমাপ্ত হয়। এভাবেই বাবা লোকনাথ অনন্তলোকের পথে যাত্রা করেন।এমই/জেসি


