# সামগ্রিকভাবে জেলার অন্যান্য থানার তুলনায় পিছিয়ে এই জনপদ
# প্রভাবশালী এমপির হাত ধরেও উন্নয়ন বঞ্চিত
# অবহেলা বলছেন বিএনপি নেতারা
সিন্দাবাদ তার সমুদ্র অভিযানে গিয়ে পতিত দুর্ঘটনার পর সকালে চোখ খোলে যেমন নিজেকে চারদিকে পানির মাঝে নিজেকে একটা দ্বীপে আবিষ্কার করেছিলেন। ঠিক তেমনিভাবে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লাবাসীও সোমবার (২৪ অক্টোবর) রাতে টানা ঝড় বৃষ্টির পর নিজেদের চারদিকে পানির মাঝে আবিষ্কার করেছিলেন।
লালপুর থেকে ফতুল্লা ষ্টেডিয়াম। ইসদাইর থেকে মাসদাইর। কিংবা কুতুবপুর। কোথায় নেই পানি। পূর্ব থেকে পশ্চিম। উত্তর থেকে দক্ষিণ। যেদিক চোখ যায়, যতদূর চোখ যায়। শুধু পানি আর পানি। মনে হয় এ যেন শহরতলীর কোন গ্রাম নয়, কোনো উপকূল সংলগ্ন গ্রাম।
সিন্দাবাদ তো তাও চারদিকে পরিষ্কার পানি পেয়েছিলেন নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে কিন্তু নারায়ণগঞ্জবাসীর ভাগ্য এতটাই খারাপ যে তারা যে পানির সাথে বসবাস করছেন তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিকর কারখানার বর্জ্য মিশ্রিত পানি, বাসা বাড়ির পয়ঃনিষ্কাশিত পানি। এসব দূষিত পানির সংস্পর্শে আসতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
এর প্রভাবে নানা প্রকার জটিল চর্ম রোগের শিকার হতে হচ্ছে এসব এলাকার অসহায় মানুষগুলোর। পূর্বের দিনগুলোতে দেখা গেছে সামান্য বৃষ্টি হলেই শহরের বিশেষ করে ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত থাকতো দিনের পর দিন। কিন্তু গতকালের ভারী বৃষ্টির ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার জন্য কতদিন পর্যন্ত ভুগতে হয় তার হিসেব করে দুশ্চিন্তায় পড়তে দেখা গেছে পুরো শহরতলীকে।
এ যেনো মরার উপর খারার ঘা। সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণে বাসাবাড়ি ও দোকানপাটেও পানি উঠতে দেখা গেছে। ফতুল্লার এমন জলাবদ্ধতার চিত্র নতুন নয়। এটা এই এলাকার জনপদের দীর্ঘদিনের সমস্যা । ফতুল্লার এমন করুণ অবস্থা দেখে যে কেউ হয়তো ভাবতে পারে এই এলাকায় কোনো জনপ্রতিনিধি নেই।
কিন্তু তাদের চোখ কপালে উঠবে যখন তারা জানবে, এই এলাকা আসলে আলোচিত সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের নির্বাচনী এলাকা। তার এলাকার এমন করুণ অবস্থা দেখে হতভম্ব হবে যে কেউ। ফতুল্লার এই করুণ অবস্থার যেন শেষ নেই। আক্ষেপ করে লালপুরের এক বাসিন্দা যুগের চিন্তা প্রতিনিধিকে জানায়, আর কতো বার বলবো আমাদের দুঃখের কথা।
আর কাকে বললে লাঘব হবে আমাদের এই দুর্দশা। পানির কারণে কেউ বাসা ভাড়া নিতে চায়না। আমরা নিজেরা ঠিক মতো চলাফেরা করতে পারি না। বিষাক্ত পানির কারণে পায়ে খোস-পাচড়া পড়ে গেছে। আমরা তীব্রভাবে দায়িত্ব প্রাপ্ত জনপ্রতিনিধিদের উপর ক্ষিপ্ত। আমরা এর সুষ্ঠ দীর্ঘমেয়াদী সমাধান চাই।
আফরিন আক্তার জান্নাত নামের এক গার্মেন্টস কর্মী জানান, প্রতিদিন ৪ বার এই রাস্তা দিয়ে চলাফেরা করতে হয়। কিছুদিন পর পরই এমন সমস্যা দেখা দেয়। এর কার বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারেনা। আমাদের পায়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। বাসায় পানি উঠে গেছে। আমরা এর স্থায়ী সমাধান চাই। মোট কথা ফতুল্লা বাসী স্থানীয় জন প্রতিনিধিদের উপর চরম ভাবে ক্ষিপ্ত।
ফতুল্লার এই দুর্ভোগের সমাধান এর ব্যাপারে ফতুল্লার চেয়ারম্যান স্বপন এর কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘ফতুল্লা মুলত নিম্নাঞ্চল, তাই পানিটা জমে যায়। এছাড়াও রেলওয়ে ফতুল্লায় একটা বাধ দিয়েছে। যার কারণে পানিটা নামতে পারেনা। এর ফলে রেললাইনের দুই পারেই জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
আমরা সাময়িক ভাবে পাম্প দিয়ে সেচে পানি নিষ্কাশন করছি। তবে এর স্থায়ী সমাধানের লক্ষে দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। আশা করি এর সমাধান হবে।’ তবে শহরবাসী আর আশার বানী শুনতে চাচ্ছেন না। তারা এর সমাধান চাচ্ছেন। কাজ দেখতে চাচ্ছেন।
এদিকে শামীম ওসমানের মতো প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা যে এলাকার সাংসদ সেখানে ফতুল্লা উন্নয়ন বঞ্চিত থাকাটাকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করছেন বিএনপির নেতারা। এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মামুন মাহমুদ যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘ডিনডি বাঁধে যতগুলো প্রজক্টে রয়েছে। একটি প্রজেক্টের এলাকায় ও আমরা ভালো কোনো উন্নয়ন লক্ষ্য করিনি।
যেমন ফতুল্লা, কুতুবপুর, এনায়েত নগর এই এলাকাগুলোর রাস্তার বেহাল দশা হয়ে থাকে। মানুষ অনেক কষ্টে আছে। মানুষ চলাচল করতে পারে না। কালকে বৃষ্টি হয়েছে এই কারণে তারা বলতে পারে এই জন্য পানি, তা কিন্তু না, এই এলাকাগুলোতে বারো মাস একই দশা লেগে থাকে। ওই এলাকাগুলোর যত খাল-বিল রয়েছে পানি নিষ্কাশণের, সেগুলো দখল করে বাড়িঘর হাঁট বাজার দোকানপাট ও অনেক গামেন্টর্স করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এই এলাকাগুলো শামীম ওসমান সাহেবের আওতাভুক্ত যে কারণে আমি একটি কথা বলতে চাই। তিনি বার বার বলেন অনেক উন্নয়ন হয়েছে। আমরা উন্নয়নের গল্প শুনি কিন্তু তা চোখে দেখতে পাই না। আমার একটা মূল কথা সেটা হল সুরম্য অট্টালিকা বিশিষ্ট বস্তি আমরা চাই না। আমরা চাই পরিকল্পিত উন্নয়ন।’
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘ফতুল্লার মানুষ অতন্ত কষ্টে আছে। সেই এলাকার প্রতিটি অলিগল্লি গুলো বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে এবং অনেকের বাসা বাড়ির মধ্যে ও পানি উঠে গেছে। এই কারণে অনেক দূর্ভোগ পোহাচ্ছে ফতুল্লাবাসী।
তাহলে এই অবস্থার জন্য এই সরকারই দায়ী এই সরকার ফতুল্লার এই জলাবদ্ধতা দূরীকরণের জন্য অনেক অর্থ বারাদ্দ করেছিলো কিন্তু এই বরাদ্দকৃত টাকা সঠিকভাবে সেখানে কাজে লাগানো হয়নি। সরকারের এত অর্থ ব্যায় করার পরে ও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। সামান্য বৃষ্টি হইলেই জলাবদ্ধতায় ভোগে সাধারণ জনগণ।
অর্থ বরাদ্দ হওয়ার পরে অনেক নেতা-কর্মীরা এই অর্থ লুটেপুটে খেয়েছে। যার কারণেই জনগণের এই দুর্ভোগ। এই দুর্ভোগ থেকে দ্রুত এই ফতুল্লাবাসীকে পরিত্রাণ দেওয়া উচিত। এই পরিত্রাণ আওয়ামী লীগে সরকারের পক্ষে দেওয়া সম্ভব না। এই কারণে সরকার পরিবর্তণের যে আন্দোলন, সেই আন্দোলনে ফতুল্লাবাসী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।’
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘শুধু ফতুল্লা ইউনিয়ন নয় পুরো বাংলাদেশের চিত্র একই। এই সরকারের লোকেরা যতটুকু উন্নয়ণ করে তার থেকে বেশি চাপা মারে। আর সঠিকভাবে উন্নয়ন করলে সেটা জনগণের চোখে পড়বে।’
আর দেশে এখন আওয়ামী লীগের আমলে যে জলাবদ্ধতা বিএনপির আমলে সেটা ছিল না। তারা অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর ড্রেজার দিয়ে খাল বিল ফসলি জমি ভরাট করেছে, তাই এই জলাবদ্ধতা। আর এগুলো যুবলীগ, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগের লোকেরাই করে। আর এই উন্নয়নের জবাব জনগণ তাদের ব্যালটের মাধ্যমে দিয়ে দেবে।’
এ বিষয়ে ফতুল্লা থানা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক রোজেল বলেন, ‘ফতুল্লাবাসীরা সবাই কিন্তু বিএনপি বা আওয়ামী লীগ নয়। এখানে সকল ধরণের লোক বসবাস করে থাকে। আর এমপি শামীম ওসমান সাহেব যে ধরণের বক্তব্যে দেয় হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ণ করেছি।
এটা মজার বিষয় আজকে প্রায় ১৫ বছরের অধিককাল অন্য একটা সরকার বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। এই ১৫ বছর পূর্বে মানুষের যে চাহিদা ছিল। বর্তমানে শতগুন বেশি চাহিদা মানুষের। আর বিএনপি কি করেছে সেটা বিএনপির সময় করেছে। এখন আওয়ামী লীগের সময় চলতেছে; এখন তারা করবে। সবাই জানে বিএনপি কি করেছে।
বিএনপি বন বিভাগের পাশ দিয়ে পানি নিষ্কাশনের জন্য ৫টি পাওয়ার পাম্প স্থাপন করেছিল। যেটা বর্তমানে নাই বিএনপিতো ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পর পাওয়ার পাম্প নিয়ে যায়নি। এখন বিএনপির ঘাড়ে দোষ চাঁপিয়ে আওয়ামী লীগ নিজেকে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। সাধারণ মানুষ সাদাকে সাদা, আর কালোকে কালো বলতে, হয় সেটা বুঝে।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এম এইচ মামুন যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘আমাদের লাষ্ট এমপি ছিল কমান্ডার সিরাজ সাহেব তার পরে ছিলেন আমাদের গিয়াস উদ্দিন সাহেব। আমি যা মনে করি, তারা ব্যাপক উন্নয়ন করেছে। আর ফতুল্লাবাসীরা যে দুর্ভোগে ভুগছে এটা আজকের সমস্যা না।
এই সরকার ১৫ বছরের মত ক্ষমতায় বহাল রয়েছে। তারা যদি এই সমস্যার সমাধান করতো। তাহলে আর এই এলাকার লোকগুলোর দুর্ভোগ থাকতো না। এই সমস্যার সমাধান এই সরকারের আমলে মনে হয় হবে না। আমরা যা মনে হয় তাদের তথাকথিত উন্নয়ন রেখে অতি দ্রুত এই এলাকার কাজে হাত দেওয়া।
এ বিষয়ে মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি শাহেদ আহম্মেদ যুগের চিন্তাকে বলেন, ফতুল্লাবাসী দীর্ঘদিন যাবৎ উন্নয়ণ বঞ্চিত হয়ে রয়েছে। এ বিষয়ে অনেক পত্র পত্রিকায় নিউজ আমরা দেখতে পাই কিন্তু কোনো কাজ হয়েছে দেখতে পেলাম না।
এই এলাকার সাধারণ জনগণ অনেক কিছু করেছে এই উন্নয়নের জন্য কিন্তু এই সরকারের আমলে উন্নয়ন হবে না এটা তারা বুঝেতে পেরেছে। তাই আমরা যতটুকু জানি, ফতুল্লাবাসী এখন এই সরকার পতনের আন্দোলনে বেশি ভূমিকা পালন করছে।’ এন.এইচ/জেসি


