সম্প্রতি বন্দর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয় বিক্রির বিষয়টি বন্দর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বিষয়টি শুধু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যেই নয়, অলোচনার খোরাক হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয়দের মাঝেও।
অনেকেই আবার বন্দরের নবীগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে বন্দর ইউনিয়ন আ'লীগ কার্যালয়টিকে গায়েবী কার্যালয় হিসেবে হাস্যরস করতেও ছাড়ছেন না। কারণ এখানে বন্দর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয়তো দূরের কথা, ওয়ার্ড কার্যালয়ও নেই।
বন্দর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যে কার্যালয় আছে তা দীর্ঘদিন যাবত ব্যবহারের অযোগ্য এবং সেটির অবস্থান নবীগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড নয়, বন্দর বাসস্ট্যান্ড এলাকায়। তাই কে বা কারা এবং কি উদ্দেশ্যে এমন মিথ্যে তথ্য দিয়েছে সেই বিষয়টি নিয়ে এলাকায় চলছে আলোচনা সমালোচনা, দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
আবার কেউ কেউ বলছেন, সামনেতো ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্মেলন, তাই হয়তো কেউ ইচ্ছে করেই এই ধরণের মিথ্যে তথ্য দিয়ে নিজেরা ফায়দা লুটে নিতে চাইছেন। তবে সঠিক তথ্য না দিয়ে মিথ্যে তথ্য দিয়ে এখন তারা হয়েছেন হাসির পাত্র। তাই বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বের করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দাবি জানিয়েছেন অভিযুক্ত নেতাসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ।
সম্প্রতি বন্দরে মদনগঞ্জ-মদনপুর সড়কের নবীগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকার পূর্ব পাশ থেকে অবৈধভাবে বন্দর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয় বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে একটি খবর প্রচার করা হয়। বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের এক নেতাকে দায়ী করা হয়।
এই কার্যালয়টি ৩/৪ বছর আগে তৈরি করা হয়েছে বলেও জানানো হয়। বিষয়টি সরেজমিনে দেখার জন্য বন্দরের নবীগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গিয়ে পাওয়া যায় ভিন্ন চিত্র। এখানে রাস্তা প্রশস্ত করার জন্য সড়কের সওজের উদ্যোগে পূর্ব পাশের রাস্তা সংলগ্ন সকল দোকান-পাটই ভেকু দিয়ে ভেঙে ফেলার কাজ চলতে দেখা গেছে।
বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, নবীগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে বন্দর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কিংবা আওয়ামী লীগের কোন অঙ্গসংগঠনের নামে কখনও কোন কার্যালয়ই ছিল না। অনেকে আবার বিষয়টিকে পুকুর খনন ও ভরাটের গল্প শুনিয়ে রসিকতাও করেন।
স্থানীয়রা বলেন এই জায়গাটিকে যারা চিনেন কিংবা এখান দিয়ে চলাচল করেছেন তারা সবাই দেখেছেন এখানে একটি টিন বিক্রির দোকান ছিল। রেলওয়ের জায়গায় থাকা সেই দোকানের সাথেই একটি ছোট রুমে শেখ কামাল স্মৃতি সংসদ নামের কার্যালয় ছিল যেখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগের বয়স্ক নেতাদের দেখা যেত।
তবে সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য রাস্তার পাশে থাকা রেলওয়ের জায়গায় নির্মিত সকল দোকান-পাট সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের উদ্যোগে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। এখানে অনেকেই চেষ্টা করছেন সম্ভব হলে নিজেদের নির্মিত ঘর সরিয়ে নিতে। তবে এখানে আওয়ামী লীগের কোন কার্যালয় আছে বলে কখনও শুনিনি।
অন্যদিকে যার কাছে মোটা অংকের টাকা অগ্রিম নিয়ে মাসিক ৫ হাজার টাকা নির্ধারন করে ভাড়া নেওয়া হতো বলে দাবি করা হয় সেই শাহজাহান জানান, কয়েক বছর আগে এই দোকান ঘরটি আমি আমার নিজের টাকা দিয়ে নির্মাণ করি। পনির ভাইসহ মুরুব্বিরা বলেছিল তুমি এখানে ঘর করে ব্যবসা করো তবে আমাদের বসার জন্য একটি রুম ছেড়ে দিও।
তখন তিন সাটার দিয়ে একটি ঘর তৈরি করে সেখানে দুটি সাটার আমি ব্যবহার করতাম এবং একটি সাটার তাদের বসার জন্য ছেড়ে দিয়েছিলাম। এখন রাস্তার জন্য সরকারের জায়গা লাগবে তাই সরকার সব ভেঙে দিচ্ছে, এখনও গেলে দেখতে পাবেন ভেকু দিয়ে দোকান ঘর ভেঙে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, সে সময় আমি যে টাকা খরচ করে ঘর বানিয়েছিলাম এখনতো আর সেই টাকা পাওয়া যাবে না। তাছাড়া এগুলো ভেঙে নিতেও খরচ আছে। সরকারী লোকেরা ভাঙলেতো আর কিছুই কাজে লাগানো যাবে না। তাই যখন ভেকু দিয়ে ভাঙতে শুরু করে তখন চেষ্টা করি যতটুকু ভাল রেখে ভাঙা যায় ততটুকুই কাজে লাগানো যাবে।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বন্দর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহবুদ্দিন আহাম্মেদ বলেন, বন্দর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয় আমাদের এই ওয়ার্ডে না, বন্দর বাসস্ট্যান্ড এর সামনে। আমরা এখানে বসার জন্য শেখ কামাল স্মৃতি সংসদ নামে একটি কার্যালয় করেছিলাম।
এখানে আগে যে ঘরটিকে কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করতাম, তা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর এখানে এত টাকা খরচ করে ঘর করার মতো ব্যবস্থা করতে পারছিলাম না। তখন এই জায়গাটা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়ে আমাদের এলাকার শাহজাহান নামের আওয়ামী লীগেরই এক কর্মীকে বললাম তার ব্যবসা করার জন্য এখানে দোকান তৈরি করতে এবং সেখানে আমাদের বসার জন্য একটি জায়গা রাখার জন্য।
পরে সেখানে শাহজাহান তার নিজের টাকায় তিনটি সাটার দিয়ে এই ঘরটি তৈরি করে। সেখান দুটি সাটার দিয়ে গড়া একটি রুমে শাহজাহান টিনের ব্যবসা করতো এবং একটি সাটার দিয়ে গড়া রুমে আমাদের বসার জন্য ব্যবস্থা করে দেয়।
যেটা আমরা শেখ কামাল স্মৃতি সংসদ এর কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করি। শাহজাহান স্বেচ্ছায়ই আমাদের অফিসের জন্য পত্রিকা ও টুকটাক খরচপাতি চালাতো। কিন্তু যেহেতু জায়গাটি সরকারী এবং বর্তমানের সড়ক প্রশস্ত করার জন্য জায়গাটি সরকারের প্রয়োজন তাই এই দোকান ঘরটিসহ আশেপাশের দোকান ঘর ভেকু দিয়ে ভেঙে দেয় কর্তৃপক্ষ।
যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, বন্দর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সেই জাকির হোসেন পনির এই বিষয়ে জানান, আমি দীর্ঘদিন যাবত (প্রায় ২৬ বছর) কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে আছি। আমি কিন্তু একবারও সিলেকশনে নির্বাচিত হইনি। আমি প্রত্যেকবারই (তিনবার) আমার এলাকার নেতাকর্মীদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছি।
এখন শুনছি আমি নাকি আওয়ামী লীগের অফিস বিক্রি করে ফেলেছি। অথচ এখানে আওয়ামী লীগের কোন অফিসই নেই। বন্দর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয় এখানে না, বন্দর বাসস্ট্যান্ড এর সামনে। সেই অফিসটিও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে।
সেই অফিস নিয়েও এর আগে মিথ্যে তথ্য দিয়ে সংবাদ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমার মনে হয় সেই লোকগুলোই এবার আবারও সাংবাদিক ভাইদের মিথ্যে তথ্য দিয়ে আমার নামে অপপ্রচার করার চেষ্টা করছে। আপনারা দয়া করে বিষয়টি সঠিকভাবে যাচাই বাছাই করে প্রকাশ করবেন।
তবে ঘটনাটি কি জানতেই চাইলে তিনি বলেন, ২০০৮ সালে যখন একেএম নাসিম ওসমান জাতীয় পার্টি থেকে এই আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন, তখন আমি ওনাকে আমাদের বসার জন্য একটি ব্যবস্থা করে দিতে বলি।
তখন সেখান থেকে শেখ কামাল স্মৃতি সংসদ নামে একটি কার্যালয় করার জন্য পরামর্শ দিয়ে আমাদের কিছু সাহায্য করতে রাজি হন এবং একটি প্রকল্পের মাধ্যমে সামান্য কিছু টাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে পরবর্তীতে আরও কিছু টাকার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।
এখানে রেলওয়ের খালি জায়গা লীজ নেয় আমার চাচা আমির হোসেন। তখন আমার চাচা এই জায়গাটা দিতে রাজি নাহলেও আমরা অনেকটা অধিকারের ভিত্তিতেই এখানে বসার জন্য একটি ঘর তৈরি করে শেখ কামাল স্মৃতি সংসদ নাম দেই।
আমরা এমপির কাছ থেকে আরও সাহায্যের আশ্বাসে নিজেরা টাকা তুলে একটি ঘর তৈরি করি। তবে পরে আমরা আর কোন টাকা পাইনি। কয়েখ বছর পর সেই ঘরটি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে ভেঙে পড়লে আমার চাচা সেই সুযোগে এই জায়গাটি আবার দখলে নিতে চায় এবং ভাড়ার উদ্দেশ্যে দোকান তৈরি করতে চায়।
তখন আমরা জায়গাটিকে হাতছাড়া থেকে বাঁচাতে আমাদেরই এক কর্মী শাহজাহানকে এখানে দোকান করার পরামর্শ দেই এবং আমাদের বসার জন্য জায়গা রাখতে বলি। সেই থেকে আমরা এখানকার তিনটি সাটারের একটি সাটার ব্যবহার করছি। এর কারণে আমাদের স্থানীয় নেতাকর্মীদের একত্রিত হওয়ার একটি জায়গা তৈরি হয়।
তিনি জানান, কিছুদিন আগে রাস্তা প্রশস্তকরণের জন্য এই জায়গা ছেড়ে দেওয়ার জন্য সওজ থেকে চাপ সৃষ্টি করা হয়, আমাদের নোটিশ দেওয়া হয়, মাইকিং করা হয়, ম্যাজিস্ট্রেট আসে এবং ভেকু নিয়ে আসা হয়। তখন শাহজাহান আমাদের ধরলে আমরা তাকে বলি, দোকান নির্মাণের খরচের টাকাতো আমরা দিতে পারবো না, তুই তোর দোকান ভেঙে নিয়ে যা।
এতে ভেঙে নিয়ে যাওয়ার টাকাও তাকে আমরা দিতে পারি নাই। এরই মধ্যে ভেকু দিয়ে ভাঙা শুরু করে দিয়েছে। তাই এই বিষয়টি নিয়ে মিথ্যে তথ্য দিয়ে আমাকে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে। এই বিষয়টি যাচাই বাছাই করে এর ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সাংবাদিকসহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির প্রতি বিশেষভাবে অনুরোধ জানান তিনি।
তার ভাই পুতুল বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুতুল দেশে নাই প্রায় ২০ বছর যাবত। বিএনপির আমলেই সে দেশ ছেড়েছে। কেউ যদি পুতুলের বিএনপি বা তার কোন অঙ্গসংগঠনের তালিকায় নাম দেখাতে পারেন তো আপনাদের শাস্তি আমি মাথা পেতে নিব। আমার আরেক ভাইয়ের নিজের সিএনজি আছে তাই সিএনজি স্ট্যান্ডে তার থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে সে কোন চাঁদাবাজির সাথে জড়িত না।


