পর্যটক মুখরিত লোক কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসব
আশরাফুল আলম, সোনারগাঁ
প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৪:০৫ পিএম
ছুটির দিনে গতকাল শুক্রবার দেশের বিভিন্নস্থান থেকে আসা পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত ছিল সোনারগাঁয়ে মাসব্যাপী লোক কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসব প্রাঙ্গণ। মাসব্যাপী এ মেলা যেন উৎসব আমেজে মেতে উঠেছে। এবারের মেলার বিশেষ আকর্ষন হলো দেশের প্রথিতযশা কারুশিল্পীদের শিল্পকর্ম নিয়ে প্রদর্শনী।
এ প্রদর্শনীতে ২৪টি ষ্টলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা ৪৮ জন কারুশিল্পী হারানো ঐতিহ্যকে আবার নতুন করে আবিস্কার করছে। প্রদর্শনীর গ্যালারীগুলো কারুশিল্পীরা তাদের স্বহস্তে তৈরি করছে সোনারগাঁয়ের দারুশিল্পের কারুকাজ, নকশীকাঁথা, হাতি ঘোড়া, মমী পুতুলের বর্ণালী-বাহারি পণ্য, রাজশাহীর মৃৎশিল্প-মাটির চায়ের কাপ, শখের হাঁড়ি, নকশীকাঁথা।
এবং আরও রয়েছে মুন্সিগঞ্জের শীতলপাটি, ঢাকার কাগজের শিল্প, বাটিক শিল্প, খাদিশিল্প, মণিপুরী তাঁতশিল্প, রংপুরের শতরঞ্জি শিল্প, ঠাকুরগাঁয়ের বাঁশের কারুশিল্প, মাগুরার শোলাশিল্প, টাঙ্গাইলের বাঁশ-বেতের কারুপণ্য,সিলেটের বেতশিল্প, জামালপুরের তামা-কাঁসা-পিতলের শৌখিন সামগ্রী।
ও সোনারগাঁয়ের বাহারি জামদানি শিল্প, বগুড়ার লোকজ বাদ্যযন্ত্র, কিশোরগঞ্জের টেরাকোটা পুতুল, কক্সবাজারের শাঁখা ঝিনুক শিল্প, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সুজনিকাঁথা, খাগড়াছড়ি ও মৌলভীবাজারের ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠীর কারুপণ্য, মৌলভীবাজারের বেতের কারুশিল্প, চট্টগ্রামের তালপাতার হাতপাখা, পাটজাত কারুপণ্য, লোকজ অলংকার শিল্পসহ ইত্যাদি কারুপন্য।
এখানে শিল্পীরা বসেই তাদের নিপুন হাতে নিজস্ব মেধা ও মননে তৈরি করছে বাহারী কারুপণ্য এবং তা প্রদর্শন ও বিক্রি করছে। এছাড়া মেলায় আবহমান বাংলার গ্রাম্য শালিশ, দাদি নাতির গল্প বলা, ঢেঁকিতে ধানভানা, নকশী পিঠা তৈরি, পালকিতে বর কনে, বর যাত্রা, গাঁয়ে হলুদ, পন্ডিত মশাইয়ের পাঠশালা, জামাইকে পিঠা খাওয়ানো ইত্যাদি জীবন্ত প্রদর্শনী চলছে।
মেলায় বাড়তি আকর্ষন হিসেবে রয়েছে, আবহমান বাংলার লৌকিক আচার এবং ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি ফুটিয়ে তোলার জন্য নাগরদোলা, বায়োস্কোপ, বিমান চড়কি, পুতুল নাচ। মেলা ঘুরে ক্লান্ত শরীরে বিকেলে বসে প্রতিদিনই শুনছেন ময়ূরাকৃতির সোনারতরী মঞ্চে লালন, হাসন, ভাওয়াইয়া, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, বাউলগান, পালাগান, কবিগান, হাছন রাজার গান।
লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক এস এম রেজাউল করিম জানান, লোক কারুশিল্পের প্রসারের জন্য প্রতি বছরের মত আকর্ষণীয় বিভিন্ন খেলা, গান, প্রদর্শনী অনুষ্ঠান ছাড়াও এবারের উৎসবে গ্রাম বাংলার প্রতিচ্ছবি উপস্থাপন করা হয়েছে বৈচিত্রময় ভাবে। মেলায় মোট ১০০টি ষ্টল রয়েছে।
এছাড়া মেলায় বসেছে মুড়ি মুড়কি, মন্ড মিঠাই থেকে শুরু করে গ্রামীণ হস্তশিল্প, বাঁশবেত, কাঠ, লোহা, পাটজাত দ্রব্যসামগ্রী বিলুপ্ত প্রায় কুটির শিল্পের পসরা। দেশের কৃষিজীবি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, গ্রামীণ ঐতিহ্য লোকজ সংস্কৃতি ও কারুশিল্পের ঐতিহ্যকে তুলে ধরার লক্ষ্যে গত ১৮ জানুয়ারী থেকে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী এ মেলা।
এবারের মেলা শুধুই লোকজ ঐতিহ্যের পণ্য নিয়ে সাজানো হয়েছে। তাই এ মেলায় লোকজ কারুপন্য ছাড়া অন্য কোন কিছুই প্রদর্শন করা হয়নি। নৃতাত্বিক গোষ্ঠীর তাঁত শিল্প থেকে শুরু করে সোনারগাঁয়ের হাতি ঘোড়া, জামদানি, রাজশাহীর শখের হাড়ি, বাঁশবেত, দারুশিল্প, নকশী কাঁথা, টেপা পুতুল, সিলেট ও মুন্সিগঞ্জের শীতলপাটি, কিশোরগঞ্জের মৃৎশিল্প, মাগুরা শোলা শিল্প সবই আছে এই মেলায়।
গতকাল শুক্রবার সরেজমিন মেলা চত্বরে গিয়ে দেখা যায় দেশের বিভিন্নস্থান থেকে আসা দর্শনার্থীদের ঢল। কিশোরগঞ্জ থেকে বার্ষিক শিক্ষাসফরে আসা একদল শিক্ষার্থীরা জানান, মাসব্যাপী লোক ও কারুশিল্প মেলায় এসে সোনারগাঁয়ের ইতিহাস ঐতিহ্য দেখার পাশাপাশি বাড়তি পাওয়া হিসেবে বাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য কারুশিল্পের অনেক নিদর্শন উপভোগ করেছি।
এক সময়ের গ্রাম বাংলার তামা,কাসা, পিতলের তৈরি তৈজস পত্র হিসেবে ব্যবহার হতো হাড়ি-পাতিল, বাঁশ বেতের তৈরি মাছের খাড়ি, ঢুলা, ওছা, মাছ ধরার চাই, পলো, মাটির তৈরি মাইট, মটকা ও ধান বানার ঢেকি এখন আর দেখা যায় না। বর্তমান প্রজন্ম আগে এগুলো কি কাজে ব্যবহার হতো তা সহজে চিনতে পারেনা।
মানুষের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত হারিয়ে যাওয়া দেশীয় ঐত্যিহ্যের সকল কারুপন্য এখানে আসলে দেখা মেলে। হারিয়ে যাওয়া সব ঐত্যিহ্যের সঙ্গে তাদের পরিচয় ঘটে। এ মেলা দেখে নতুন প্রজন্মরা আরো বেশি করে জানতে পারবে। এছাড়া মেলায় এসে খুবই ভাল লেগেছে শুধুমাত্র লোকজ কারুপন্য বিক্রি ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা দেখে।
ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে আসা ব্যবসায়ী জহিরুল হক দম্পতি বলেন, আমরা মেলায় ঘুরতে এসে বাংলার হারিয়ে যাওয়া নানা ঐতিহ্যবাহী অনেক জিনিসপত্র দেখেছি। স্ত্রীর জন্য একটি জামদানি শাড়ি ও ঘরের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য কিছু ঐত্যিহ্যবাহী পণ্য কিনেছি। মেলায় রাজশাহী থেকে এসে নকশীকাঁথার বাহারি পণ্য দিয়ে ষ্টল সাজিয়েছেন পারভীন আক্তার।
রাজশাহী নকশীঘর নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি। তবে কারুশিল্প মেলায় তার ষ্টলের নাম দেওয়া হয়েছে সন্ধ্যামালতী। পারভীন আক্তার বলেন, এবারের মেলায় আমার ষ্টলের নকশিকাঁথার মনোমুগ্ধকর কারুকার্য দেখে ক্রেতা, দর্শনার্থীরা আকৃষ্ট হয়েছেন। মেলা শুরুর হওয়ার পর অন্যদিনের চেয়ে শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় বেচা-বিক্রি অনেকটা ভাল।
তবে মেলায় ক্রেতার তুলনায় দর্শনার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। সোনারগাঁ নকশী কাঁথা শিল্পী হোসনে আরা বলেন, ছুটির দিন থাকায় দেশের বিভিন্নস্থান থেকে আসা পর্যটকদের পদচারনায় মূখোরিত ছিল মেলা প্রাঙ্গণ। আমাদের বেচা বিক্রিও ভালো হয়েছে। মেলার শেষ দিকে দর্শনার্থী ও ক্রেতার সংখ্যা আরো বাড়বে বলে আশা করছি।
রংপুর থেকে শতরঞ্জির নানা পণ্য নিয়ে মেলায় ষ্টল সাজিয়েছেন আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, শতরঞ্জির বিভিন্ন পণ্য দিয়ে আমার ষ্টল সাজানো হয়েছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত দেশীয় তৈরি ব্যাগ, নামাজের মসল্যা, পাপোশ ও টেবিল ম্যাটসহ নানা পণ্য তোলা হয়েছে। কটন সুতাসহ নানা রঙের সুতা দিয়ে এসব পণ্য তৈরি করায় বিক্রি অনেক ভাল হয়েছে।
আশা করছি মেলার শেষর দিকে বিক্রির পরিমাণ আরো বাড়বে। কারুশিল্পী রফিকুল ইসলাম বলেন, এ মেলায় কাঠের তৈরি পণ্যের কদর বেশি। প্লাস্টিকের তৈরি কোন পণ্য না থাকায় এ মেলার ঐতিহ্য ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে। ছুটির দিনে দর্শনার্থীদের পদচারনায় মুখরিত হয়ে উঠেছে মেলা প্রাঙ্গণ। এন.হুসেইন/জেসি


