বিএনপি নেতা টুন্ডা রানা গংদের শাস্তির দাবি
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৩, ১২:৫০ পিএম
# দ্বিতীয় বিয়ের জের ধরে হাতের একটি কব্জি হারায় রানা
# ৫ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় অভিযোগ
# রাত পোহালেই ঈদ, সাড়ে ৫ হাজার পরিবারের বুক ফাটা আর্তনাদ
বন্দরের নাসিক ২৪ নং ওয়ার্ডের নবীগঞ্জ এলাকার শীতলক্ষ্যা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি নামের একটি গরুর সমিতির ৫ হাজার ৩ শত গ্রাহকের প্রায় ২ কোটি লুট করে নেওয়া সদ্য নির্বাচিত ২৪ নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মাসুদ রানা ও তার সঙ্গীদের গ্রেফতারসহ এর প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সমিতির গ্রাহকসহ স্থানীয় জনগণ।
একই সাথে এই সমিতির পরিচালক মাসুদ রানা ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পরপরই কেন এই টাকা লুটের ঘটনাটি ঘটলো তা নিয়ে চলছে আলোচনা ও সমালোচনা। অন্যদিকে এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী তাদের প্রতিপক্ষের লোকদের নাম জড়িয়ে দিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিষয়টি প্রশাসনকে সতর্কতার সাথে তদন্তসহ প্রকৃত দোষীদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। এই বিষয়ে গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে এগারটার দিকে পাঁচ জনের নাম উল্লেখ করে বন্দর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন নবীগঞ্জ এলাকায় মুন্সি জামে মসজিদ কমিটির কোষাধ্যক্ষ জাকির হোসেন।
অভিযুক্তরা হলেন, নবীগঞ্জ টি হোসেন রোড এলাকার ইসলাম কাজির ছেলে মাসুদ রানা (৪৫), মৃত শাহজাদার ছেলে খোকন (৪২), আবু মিয়ার ছেলে রিজভী (২৩), মৃত শাহজাহানের ছেলে জহিরুল (৩৩) ও মৃত গোলাম মোস্তফার ছেলে নাসির (৩২)। অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্তরা নাসিক ২৪ নং ওয়ার্ডের নবীগঞ্জ এলাকায় মুন্সি জামে মসজিদের সম্পত্তিতে মাসিক ভাড়া হিসেবে নিয়ে কার্যালয় স্থাপন করে শীতলক্ষ্যা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির নামে একটি গরুর সমিতি চালিয়ে আসছে।
গত ১৫ এপ্রিল রাতে অভিযুক্তরা সমিতির জন্য গরু আনার কথা বলে সমিতিতে থাকা গ্রাহকদের সকল টাকা নিয়ে উদাও হয়ে যায়। সমিতির সেই কার্যালয়ের ভিতর কিছু মালামাল থাকলেও তা বাইরে থেকে তালা লাগানো আছে। সেখানে ভূক্তভোগী গ্রাহকরা প্রতিদিন এসে তালা ভেঙ্গে মালামাল নিয়ে যেতে চেষ্টা করছে।
তাই বাধ্য হয়েই মসজিদ কমিটির পক্ষ হতে এই বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়ে অভিযোগ করা হইল। এখানে প্রায় সাত বছর যাবত এই গরুর সমিতিটি চালু আছে। প্রত্যেক গ্রাহককে প্রতি সপ্তাহে ৭০ টাকা করে এক বছরে ৫২ সপ্তাহ জমা দিতে হয়। সে হিসেবে জন প্রতি প্রত্যেক গ্রাহকের ৩ হাজার ৬ শত ৪০ টাকা করে জমা হয়।
যেখানে ৫ হাজার ৩ শত গ্রাহক আছে এবং ১ কোটি ৯২ লাখ টাকার মতো জমা ছিল বলে অনুমান করা হয়। গত ১৬ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ও সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মাসুদ রানা ও তার সাঙ্গরা পবিত্র ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা গরুর সমিতির প্রায় দুই কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়।
একই দিন রাত সাড়ে দশটার দিকে সমিতির কার্যালয়ের সামনে হাজার হাজার গ্রাহকের ভিড় দেখা যায়। সে সময় বন্দর থানার পুলিশসহ স্থানীয় মিডিয়ার লোকদের সেখানে উপস্থিত ছিল। মাসুদ রানার আসল বাড়ি নাসিক ২৫ নং ওয়ার্ডের লক্ষণখোলা এলাকায়। কিন্তু আত্মীয় স্বজনদের সাথে তেমন একটা বনিবনা না হওয়ায় সে নবীগঞ্জ এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতো বলে জানা যায়।
মাসুদ রানা প্রথমে নবীগঞ্জ উত্তর পাড়া এলাকায় বিয়ে করে এবং সেই সংসারে এক ছেলে এক মেয়ে আছে। কিন্তু সেই বিয়ে এবং ছেলে মেয়ের বিষয়টি গোপন করে বন্দর ইউনিয়ন পরিষদের তিনগাও এলাকায় সে দ্বিতীয় বিয়ে করে। এরফলে দ্বিতীয় পক্ষের আত্মীয়স্বজন তার একটি হাতের কব্জি কেটে নেয়। এরপর থেকে মাসুদ রানার আরেক পরিচিতি হয় টুন্ডা রানা নামে।
কিন্তু এই রানাকেই কেন ২৪ নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি বানানো হলো এবং সভাপতি হওয়ার পর পরই সাড়ে ৫ হাজার হতদরিদ্রের প্রায় ২ কোটি টাকা লুট করা হলো বিষয়টি নিয়ে চলছে এলাকায় চলছে কানাঘুষো। এই টাকার ভাগ কোন কোন জায়গায় গিয়াছে সেই বিষয়টি তদন্ত করলেই সহজেই তা বের হয়ে যাবে বলে জানায় এলাকাবাসীসহ ভূক্তভোগী জনগণ।
বিভিন্ন তথ্য সূত্রে জানা যায়, এই সমিতিটি প্রায় ৭ বছর যাবত এখানে এই সমিতির কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছরই এর গ্রাহক সংখ্যা বাড়ছে। সর্বশেষ গ্রাহক সংখ্যা ৫ হাজার ৩ শত জন বলে জানা গেছে। রানার সাথে যারা পার্টনার ছিল তাদেরও অনেককে সে ফাঁসিয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
মাসুদ রানা ও তার সঙ্গীদের মাধ্যমে সমিতির নামে জাকির হোসেনের ভাগিনা আল আমিনের কাছ থেকে একটি গরু কিনে এনে তা জবাই করে কিছু গ্রাহককে মাংস দেওয়া হয়। আল আমিনের গরু ১ লক্ষ ৬৫ হাজার টাকা দরদাম করে মাত্র ১০ হাজার টাকা হাত বায়না দিয়ে বাকি টাকা পরে পরিশোধ করার কথা বলে গরু নিয়ে আসা হয়।
আর সেই টাকা পরিশোধ করার আগেই রানা কয়েক হাজার সদস্যের তীল তীল করে জমানো প্রায় দুই কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যায়। অন্যদিকে এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী চক্র ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার চেষ্টা করে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
এই বিষয়ে গৃহস্থ আল আমিনের সাথে যোগাযোগ করলে সে জানায়, গত ১২ এপ্রিল নবীগঞ্জের শীতলক্ষ্যা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির পরিচালক মাসুদ রানা আমার থেকে একটি গরু ১ লক্ষ ৬৫ হাজার টাকা দাম ধার্য্য করে মাত্র ১০ হাজার টাকা হাত বায়না দিয়ে ৫ দিন পর বাকি টাকা দেওয়ার কথা বলে নিয়ে যায় রানা।
এ সময় তার সাথে ছিল তার পার্টনার খোকন, জহিরুল ও রিজভী। এরপর গত ১৭ এপ্রিল আমি আমার টাকা জন্য তাদের শীতলক্ষ্যা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে দেখি তাদের অফিস ও গোডাউনে তালা ঝুলছে। এ ব্যাপারে থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে বলেও তিনি জানান।
এই বিষয়ে নবীগঞ্জ কবরস্থান এলাকার জাকির হোসেন বলেন, এই বিষয়টি অনেকেই এখন গেম খেলতে চাইছেন। যেখানে মাসুদ রানা গংদের টাকা আত্মসাতের কারণে হাজার পরিবারের চোখে পানি ঝরছে সেখানে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী লোক তাদের ফায়দা লুটার উদ্দেশ্যে এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত না এমন লোকদের নামও জড়িয়ে দিতে চাইছেন।
এতগুলো মানুষের আর্তনাদ যেন তাদের স্বার্থ সিদ্ধির সুযোগ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, নিম্ম মধ্যবিত্ত হাজার হাজার মানুষের পাশাপাশি আমাদের ও অনেক আত্মীয় স্বজনের জমানো টাকা এই সমিতিতে আছে। যা মাসুদ রানা গং লুট করে নিয়েছে। স্থানীয় সাথে কথা বলে জানা যায়, এই সমিতির গ্রাহক শুধু নবীগঞ্জ এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না।
১ নং ঢাকেশ^রী থেকে শুরু করে তিনগাও কুশিয়ারা, একরামপুর, বন্দর এমনকি নদীর পশ্চিম পাড়ের গ্রাহকও এই সমিতির সদস্য। তাই বিষয়টি প্রশাসন যদি সঠিকভাবে তদন্ত করে এবং মাসুদ রানার পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নিয়ে তাদের ধরতে পারলে অর্থাৎ রানাকে ধরতে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে।
তাছাড়া বিষয়টির সাথে রাজনৈতিক দলীয় নেতাদের সাথে কোন যোগাযোগ আছে কি না তা সঠিক তদন্তে বেরিয়ে আসবে। উল্লেখ্য গত ৫ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আওতাধীন নাসিক ২৪ নং ওয়ার্ড বিএনপির সম্মেলনে মাসুদ রানাকে সভাপতি হিসেবে ঘোষণা দেন মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু।
এই সময় উপস্থিত ছিলেন, সংগঠনের আহ্বায়ক এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। এই শীতলক্ষ্যা শ্রমজীবি সমবায় সমিতিতে মাসুদ রানার সাথে পার্টনার হিসেবে ছিল খোকন (৪২), রিজভী (২৩), জহিরুল (৩৩) ও নাসির (৩২)। এন.হুসেইন/জেসি


