ইসদাইরে বাল্যবিয়ের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার নানা চেষ্টা
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৩, ০১:২৬ পিএম
# সকলের বিরুদ্ধে আমি ব্যবস্থা গ্রহণ করবো : ডিসি
বাল্যবিবাহ রোধে সরকারসহ প্রশাসনের কোন ব্যবস্থাই কাজে আসছেনা কিছু অর্থলোভী আইনজীবি, পুলিশ সদস্য, ইউপি মেম্বারসহ সমাজের কতিপয় সমাজপতিদের কারণে। অল্প বয়সে মেয়েদেরকে বিয়ে দিয়ে তাদের সুন্দর জীবনটুকু চরম অনিশ্চয়তাসহ মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে তারা। তেমনি এক বাল্য বিয়ের ঘটনা ঘটেছে ফতুল্লা থানাধীন ইসদাইর এলাকায় ।
১২ বছরের এক কিশোরীকে কোর্ট ম্যারেজের আয়োজন করেন কিছু ব্যক্তি। এবং তা পাকাপোক্ত করতে ফতুল্লা ইউপি মেম্বার আবদুল আউয়াল, ফতুল্লা থানা পুলিশ এএসআই বাদল ও সমাজ পতিদেরকে টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ রাখার অভিযোগ। তেমনি সদর উপজেলায় ইসদাইরে টাকার বিনিময়ে বাল্যবিয়ে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চলছ।
গণমাধ্যমে বিষয়টি নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো: মঞ্জুরুল হাফিজ এর নজরেও এসেছে। মাত্র ২২ হাজার টাকায় বাল্য বিবাহের বিচার মিমাংসা ঘটনায়, পুলিশ ও মেম্বার এবং স্থানীয়দের জড়িত থাকার বিষয়টি তদন্ত করার জন্য বৃহস্পতিবার বিকালে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় ৩৫ বছরের ছেলে ও ১২ বছরের মেয়েকে জিজ্ঞাসা করার জন্য ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়।
তবে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা সূত্রে জানা যায়, ডিসি সাহেব তাদের ডাকলেও উপজেলা নির্বাহী অফিসার রিফাত ফেরদৌস সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তার বদলে উপজেলা চেয়ারম্যান এড. আজাদ বিশ্বাস তাদের সাথে কথা বলে তাদের পাঠিয়ে দেন। এবং যারা বাল্যবিবাহের কাজ করে তাদেও কাছ থেকে ২২ হাজার টাকা নিয়ে ভাগ কওে খেলেন তাদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহন করেননি তিনি।
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার চেয়ারম্যান এড. আজাদ বিশ^াস এর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি তাদের সাথে কথা বলেছি। তারা বলেছে, আমাদের রুবেল নামে একজন এসে টাকা নিয়েছে, আরো অনেক লোক আসছে। পরে আমি তাদের বলেছি বিয়ে যখন করে ফেলছো এখন তো কিছু করার নাই, তোমরা সংসার করো।
যারা টাকা নিয়েছে, তাদের আর কি বলবো। মেম্বার এবং পুলিশ টাকা নিয়েছে তাদের কিছু বলার নাই। তোমরা এটা নিয়ে আর বেশি কিছু করো না। তবে মিটিংয়ে ইউএনও সাহেব ছিলেন কি না সেটা বলাতে তিনি রেগে বলেন, আমি আছি, এটাই তো। সে ছিলো কি না, সেটা তোমাকে বলবো কেনো। বেশি কথা বলো বলে ফোনটি কেটে দেন তিনি। তবে উপজেলার সূত্রে জানা যায়, সেখানে ইউএনও সাহেব ছিলেন উপস্থিত ছিলেননা তারা এবং উপজেলা থেকে নাকি তদন্ত রিপোর্ট ডিসি অফিসে জমা দেওয়া হবে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো: মঞ্জুরুল হাফিজ বাল্য বিয়ের বিষয়ে বলেন, আমি সদর উপজেলা ইউএনও সাহেবকে বলেছি, সে তাদের সাথে কথা বলেছে। ইউএনও সাহেব আমাকে তদন্ত রিপোর্ট পাঠালে এ বিয়ের সাথে যারা জড়িত আছে আমি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
প্রসঙ্গত, ফতুল্লা থানার্ধীন ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নং ওয়ার্ডে সরেজমিন মেয়ের বাড়িতে গিয়ে এবং আশপাশ এলাকায় ঘুরে জানা যায়, প্রায় ১৫ দিন পুর্বে ইসদাইর এলাকার সফিকুল ইসলাম ওরফে চেয়ারম্যানের ১২ বছরের কিশোরী মেয়েকে নিয়ে একই বাড়িতে বসবাসকারী সুমন পালিয়ে যায়।
পরে তারা নারায়ণগঞ্জের আদালতে একজন আইনজীবির মাধ্যমে নোটারী করে আদালত পাড়ায় এক কাজির মাধ্যমে তারা বিয়ে করেন। মেয়েকে না পেয়ে বাবা সফিকুল ইসলাম ফতুল্লা মডেল থানায় একটি নিখোঁজের অভিযোগও দায়ের করেন। এদিকে কোর্ট ম্যারেজের প্রায় ৪ দিন পর সুমন সেই কিশোরীকে নিয়ে এলাকায় ফিরে আসলেও বাল্য বিয়ে প্রতিরোধের পরিবর্তে উল্টো স্থানীয় রুবেল, শাহআলম, সৌরভ ও হোসেন গংরা টাকার বিনিময়ে সেই বাল্যবিয়ে পাকাপোক্ত করে কিশোরী মেয়েটিকে সুমনের সাথে সংসার করার ব্যবস্থা করে দেন।
স্থানীয় রুবেল সুমনের কাছ থেকে ২২ হাজার টাকা নিয়ে সেটা শাহ আলমের হাতে তুলে দিলে শাহআলম তা সবার মাঝে বন্টন করে দেন। বর্তমানে সুমন উক্ত কিশোরীকে নিয়ে সংসার করছেন। তবে বাড়ির অন্যান্য সদস্যরা বলেন, সুমনের আগের একটি স্ত্রীও রয়েছেন যিনি বিদেশ থাকেন।
১২ বছরের কিশোরী মেয়ের বিয়ে নিয়ে পুরো ইসদাইর জুড়ে আলোচনা-সমালোচনা হলেও তা নিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্যের ভুমিকা রহস্যজনক বলে জানান স্থানীয়রা। তবে এবিষয়ে মেম্বার এর কার্যালয়ে সকলে মিলে বসলে বর সুমন সব কিছু স্বীকার করেন যে মেম্বার ও পুলিশ এর নাম বলে তার কাছ থেকে ২২ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। আর শাহ আলম মেম্বার ও পুলিশকে টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন সবাই টাকা পেয়েছে এখন তারা আপনাদের সামনে স্বীকার করছে না।
এদিকে কোর্টে অ্যাড. সম্ভুনাথ সৈকত এর সহকারী মুহুরী দুলালের মাধ্যমে একজন আইনজীবিকে দিয়ে ১২ বছরের কিশোরীকে ১৮ বছরের যুবতী বানিয়ে অ্যাড. নূরজাহানের মাধ্যমে নোটারী করানো হয়। পরে সেখানেই কাজি আরমানের মাধ্যমে সুমনের সাথে বিয়ে সম্পন্ন হয় উক্ত কিশোরীর।
১২ বছরের কিশোরীকে কিভাবে ১৮ বছরের যুবতী করা হলো এ বিষয়ে অ্যাড. নুর জাহানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মেয়ের বয়স কত সেটা আমার জানার বিষয় না। আমার কাছে একজন এ্যাডভোকেটের সহকারী নিয়ে এসেছে, আমি সেটায় স্বাক্ষর ও সিল মেরেছি।
নোটারী করার সময় সেই মেয়েটিকে আপনার কাছে আনা হয়েছিলো কিংবা জন্মনিবন্ধনের কোন কাগজ দেয়া হয়েছিলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, না আমার কাছে শুধুমাত্র কাবিনের কাগজটি আনা হয়েছিলো। মেয়ে না দেখে আপনি কিভাবে বুঝলেন এটা কিশোরী না যুবতী এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেটা আমার দেখার বিষয় না।
আমাকে টাকা দিয়েছে, আমি স্বাক্ষর দিয়েছি। এ বিষয়ে সুমনের কাছে টাকা গ্রহনকারী মো.রুবেলের ব্যবহৃত মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভাই আমার ফোন নাম্বার আপনারে কে দিছে। একজনে একটা কথা কইলো আর আপনে সেটা বিশ্বাস করলেন। আপনে সামনা-সামনি আসেন আপনার সাথে কথা বলবো। এন.হুসেইন রনী /জেসি


