চনপাড়ায় ফের গোলাগুলিতে গুলিবিদ্ধ ৪, আহত-১৫
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৩, ০৮:৪৮ পিএম
রূপগঞ্জের চনপাড়ায় মাদককারবারসহ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফের দুই গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় চারজন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। এতে করে পুরো এলাকার মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
গুলিবিদ্ধ মো. আলমগীর হোসেন (২৮), মো. হৃদয় খান (৩০), মো. ইসমাইল (৩০) এবং মো. ইলিয়াছকে (১৭) ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতরা সকলেই চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা।
ঢামেক হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ মো. বাচ্চু মিয়া জানান, গতরাতে নারায়ণগঞ্জের চনপাড়া থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় চারজনকে ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়। বর্তমানে জরুরি বিভাগে তাদের চিকিৎসাধীন রয়েছেন। শুক্রবার (২১ জুলাই) দিবাগত রাত ১টা ৩০ মিনিটের দিকে গুলিবিদ্ধের ঘটনা ঘটে। পরে তাদের উদ্ধার করে রাত ৩টা ৩০ মিনিটের দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে আনা হয়।
গুলিবিদ্ধদের হাসপাতালে নিয়ে আসা আলম জানান, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চনপাড়া বাজারে ইউপি সদস্য শমসের বাহিনীর সঙ্গে আর এই প্রতিপক্ষ জয়নাল বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় শমসের হঠাৎ এলোপাথাড়ি গুলি ছোঁড়ে। এতে ওই একই এলাকার আলমগীরের বাম পায়ে, হৃদয়ের কোমরে, ইসমাইলের হাতে এবং ইলিয়াসের পায়ে একটি করে গুলি লাগে। পরে তাদের রাত সাড়ে ৩টার দিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়। বর্তমানে জরুরি বিভাগে তাদের চিকিৎসা চলছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে , কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চনপাড়ার শীর্ষ মাদককারবারী ও ইউপি সদস্য বজলুর মারা যাওয়ায় গত ১২ জুন এখানে উপনির্বাচন হয়। এরপর থেকে চনপাড়ার আধিপত্য বিস্তার ও মাদক কারবারের দখল নিয়ে কয়েকদিন পরপর চনপাড়ার চিহ্নিত মাদক কারবারি জয়নাল ও শমসের গ্রুপের মাঝে গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটিয়ে আসছে।
১২ জুন উপনির্বাচনে শমসের ইউপি সদস্য বিজয়ী হওয়ার পর থেকে শমসের গ্রুপ ও তারিখ প্রতিপক্ষ জয়নাল গ্রুপ আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র এলাকার মাদক কারবারি থেকে শুরু করে অপরাধের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিতে উভয় গ্রুপ উঠে পড়ে লাগে। ২১ জুলাই শুক্রবার মধ্যরাতে ইতি সদস্য শমসেরসহ তার লোকজন বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এলাকায় অবস্থান নেয়। অপরদিকে শমসেরের প্রতিপক্ষ জয়নাল সহ তার লোকজনও বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পাল্টা অবস্থান নেয়।
এক পর্যায়ে উভয় গ্রুপের লোকজন সশস্ত্র অবস্থায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এসময় উভয় গ্রুপের লোকজন এক পক্ষ আরেক পক্ষকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া শুরু করে। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এলাকার অন্তত ২৫ থেকে ত্রিশটি বাড়িঘর ভাঙচুর এবং লুটপাট করা হয় বলেও স্থানীয়রা জানায়।
সংঘর্ষে উভয় গ্রুপের গুলিবিদ্ধ সহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। রাতেই গুলিবিদ্ধ মো. আলমগীর হোসেন (২৮), মো. হৃদয় খান (৩০), মো. ইসমাইল (৩০) এবং মো. ইলিয়াছ (১৭) কে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রাতে শুরু হওয়া সংঘর্ষ শনিবার দুপুর পর্যন্ত চলছিল। পরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল পরিমাণ সদস্য ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
রূপগঞ্জ থানার ওসি /তদন্ত আতাউর রহমান বলেন, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। ঘটনাস্থল অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
রূপগঞ্জ থানা ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রূপগপঞ্জ উপজেলার বিষফোড়া কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চনপাড়া পূর্নবাসন। চনপাড়ায় মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসা, নারী ব্যবসা, ভাড়াটের খুনীদের আতুরঘরসহ সকল অপরাধ সংঘঠিত হয়। চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র একসময় আলোচিত ইউপি সদস্য বজলুর রহমান বজলুর নিয়ন্ত্রণে ছিল। তখন বজলুর নেতৃত্বেই চলতো চনপাড়ার সকল অপকর্ম। বজলু ছিল চনপাড়ার অঘষোতি গডফাদার।
ইতিমধ্যে চনপাড়ায় ইউপি সদস্য বিউটি আক্তার কুট্টি ও তার স্বামী হাসান মুহুরী, আনোয়ার মাঝি, সিটি শাহীনসহ কয়েকটি আলোচিত হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের ১৮ নভেম্বর বজলু র্যাবের উপর হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়। পরে চলতি বছরের গত ৩১ মার্চ বজলু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিউতে চিকিৎসাধানীন অবস্থায় মারা যায়। বজলু মারা যাওয়ার পর থেকে চনপাড়া নতুন গডফাদার হতে উঠে পড়ে বেশ কয়েকজন।
এদের মধ্যে অন্যতম জয়নাল গ্রুপ, শাহাবুদ্দিন গ্রুপ, শমসের গ্রুপ, ইয়াছমিন গ্রুপ, রায়হান গ্রুপসহ বেশকয়েকটি গ্রুপ। আর চনপাড়ার মাদককার বাড়িসহ অপরাধের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিতে এরই মাঝে ডজন খানেকেরও বেশি সংঘর্ষ, হামলা ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বর্তমান ইউপি সদস্য শমসের বাহিনী ও তার প্রতিপক্ষ জয়নাল বাহিনীর মধ্যে কয়েকদিন পরপরই সশস্ত্র অবস্থায় গোলাগুলিও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে ।
৩ জুলাই রাতে শমসের ও জয়নাল বাহিনীর মধ্যে সংর্ঘষে হৃদয় নামের একজন গুলিবৃদ্ধসহ ৯ জন আহত হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২৩ জুন দুপুরে একই কারণে সব চনপাড়ার অফিস ঘাট এলাকায় সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে বাবলু মিয়া ও মো. মাসুম নামে দুইজন গুলিবিদ্ধ হন। গত ১২ এপ্রিল বজলুর সাম্রাজ্য দখলে নিতে জয়নাল গ্রুপের সঙ্গে শমসের গ্রুপ ও শাহাবুদ্দিন গ্রুপের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া গুলি বর্ষণ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সংঘর্ষে ৪ জন গুলিবিদ্ধসহ ১৫ জন আহত হয়।
গত ২৯ মার্চ চনপাড়ার আধিপত্য নিজেদের দখলে নিতে শমসের ও শাহাবুদ্দিনের গ্রুপের মাঝে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষেও ঘটনা ঘটে। এসময় প্রতিপক্ষ জসীম গাজী, ওসমান গণি, স্বপ্না বেগম ও রাঙ্গাসহ কয়েকজনের বাড়িতে হামলা চালিয়ে বাড়িঘর তালাবদ্ধ করে দেয়। গত ১৯ ও ২০ মে দুইদিন ব্যাপী চনপাড়ায় আধিপত্য নিতে ফের প্রকাশ্য দিবালোকে শাওন গ্রুপ ও জয়নাল গ্রুপ, রায়হান, শমসের ও শাহাবুদ্দিন গ্রুপ, ইয়াছমিন গ্রুপের সদস্য পিস্তল উচিয়ে গুলাগুলির ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় সৈয়দ নামে এক দিনমজুর গুলিবিদ্ধ হয়। এ ঘটনায় আহত হয় অন্তত ৩০ জন। ৩০ এপ্রিল রাতভর আবারো সংঘর্ষে জড়ায় মাদক কারবারিরা। পরে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী চনপাড়ায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। এসময় দেশীয় ধারালো অস্ত্রশস্ত্রসহ ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ঘটনা রূপগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। পুনরায় ১০ মে মাদক কারবারিরা সংঘর্ষে জড়ায়। পরে পুলিশ অভিযান পরিচালনা করে ধারালো অস্ত্রসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে। এস.এ/জেসি


