বিদ্রোহীতেই ধরাশায়ী কাশেমী
নানা জল্পনা কল্পনার আবসান ঘটিয়ে অবশেষে অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশী বিদেশী নানা ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ছিন্ন করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি সুষ্ঠ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে পেরেছেন। শুরু থেকেই নারায়ণগঞ্জে নির্বাচনী আমেজ বিরাজ করছিলো। যতোই দিন যাচ্ছিল ততোই নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনে প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্ধীতা উল্লেখ করার মতো ছিলো। তবে ৫টি আসনেসর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে ছিলো নানা নাটকীয়তা। বিএনপি জোটের শরীক দলের প্রার্থী জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ-এর নেতা মুফতি মনির হোসেন কাশেমী ছিলেন বরাবরের মতো আলোচনায়। বিএনপি জোট প্রার্থী হিসেবে ফতুল্লার দুইজন বহিস্কৃত নেতাকে দলে ফিরিয়ে এনেছিলেন মূলত জোটের জয় ছিনিয়ে আনার লক্ষ্যে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিএনপি দলীয় বহিস্কৃত নেতা শাহ আলম ও গিয়াস উদ্দিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া থেকে সরে দাড়াননি। যার ফল স্বরুপ নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে মুফতি মনির হোসেন কাশেমীকে পরাজয় বরণ করতে হয়েছে বলে মনে করেন বিএনপি দলীয় নেতাকর্মীরা। বিএনপি দলীয় স্বতন্ত্র দুই প্রার্থী যদি দলকে ভালোবেসে প্রার্থীতা থেকে সরে দাড়াতেন তাহলে বিপুল ভোটে এই আসন থেকে বিএনপি জোটের প্রার্থী কাশেমী জয় লাভ করতেন বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক কৌশল পরিলক্ষিত হয়েছিলো। সেই হিসেবে বিভিন্ন আসনে নির্বাচন নিয়ে ছক করে দলগুলো প্রার্থীতা নির্ধারণও করেছিলেন। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের মতো গুরুত্বপূর্ন আসনে মনোনয়ন দিয়েছিলেন মুফতি মনির হোসেন কাশেমীকে। যদিও তৃণমূল দলের এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেনি। তবুও দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত তৃণমূল মনির হোসেন কাশেমীর পক্ষে কাজ করেছন। তবে দলের মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য শাহ আলম ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব গিয়াস উদ্দিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার কারনে দল থেকে দুইজনকে বহিস্কারও করা হয়। এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জোটের প্রার্থীর জয় ছিনিয়ে আনতে ফতুল্লার বহিস্কৃত নেতা রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধূরী ও কুতুবপুরের মনিরুল আলম সেন্টুর বহিস্কারাদেশ দল তুলে নেয়। এই দুই জনের মধ্যে রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধূরী দলে ফিরেই জোটের প্রার্থীর জয়ের ব্যাপারে মাঠে কাজে নেমে যান। নিরবে কাজ করা শুরু করেন মনিরুল আলম সেন্টু। থেমে থাকেননি ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শহিদুল ইসলাম টিটু, যুবদল নেতা মশিউর রহমান রনি, রুহুল আমিন সিকদারসহ অন্যরা। ফতুল্লা বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনে ফতুল্লা থানা বিএনপির বিভিন্ন ওয়ার্ড ৩টি ভাগে ভাগ হয়ে যায়। একটি ভাগ জোটের প্রার্থী খেজুর গাছ প্রতীকের মুফতি মনির হোসেন কাশেমী, একটি ভাগ বহিস্কৃত নেতা শিল্পপতি শাহ আলম, একটি ভাগ আলহাজ্ব গিয়াস উদ্দিনের বলয়ে গিয়ে কাজ শুরু করেন। অপরদিকে সাবেক বিএনপির সাংসদ বাংলাদেশ রিপাবলিকান দলের হাতী প্রতীকেও প্রার্থী হওয়ার কিছু বিএনপি সমর্থক তার হয়েও কাজ করেছিলেন। মূলত নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির ভোট ৪ ভাগে ভাগ হওয়ার কারনে জোটের প্রার্থী মুফতি মনির হোসেন কাশেমী পরাজিত হয়েছেন বলে মনে করছেন বিএনপি নেতারা।
তথ্য মতে, এনসিপির শাপলা কলি প্রতীকে আব্দুল্লাহ আল আমিন ১ লাখ ৬ হাজার ১শত ৭১, বিএনপি জোটের মুফতি মনির হোসেন কাশেমী ৮০ হাজার ৬’শ ১৯,হরিণ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহ আলম ৩৯ হাজার ৫শ ৮৯, ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী আলহাজ্ব গিয়াস উদ্দিন ৪ হাজার ৭’শ ৭৯ ও বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির হাতী প্রতীকের মোহাম্মদ আলী ১১ হাজার ৩’শ ২৮ ভোট পেয়েছেন। মুফতি মনির হোসেন কাশেমীর চাইতে আব্দুল্লাহ আল আমিন ২৫ হাজার ৫’শ ৫২ ভোট বেশি পেয়ে জয়ী হয়েছেন। হিসেব মতে, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির দুইজন বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির রিজার্ভ ভোট ব্যাংক থেকে ৪৪হাজার ৩’শ ৬৮টি ভোট ছিনিয়ে নিয়েছেন। অপরদিকে মোহাম্মদ আলীও ছিনিয়ে নিয়েছেন ১১ হাজার ৩’শ ২৮ ভোট। বিএনপির ভোট ব্যাংক থেকে মোট ৫৫ হাজার ৬’শ ৯৬ ভোট যা মনির হোসেন কাশেমীর মূল ভোটের সাথে যোগ হলে তা গিয়ে দাড়াতো ১ লাখ ৩৬ হাজার ৩’শ ১৫ ভোটে। যা এনসিপির চাইতে অনেক বেশি ভোটে নির্বাচিত হতে পারতেন কাশেমী। কিন্তু বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারনে নাারয়ণগঞ্জ-৪ আসন বিএনপির হাতছাড়া হয়ে গেছে বলে মনে করেন বিএনপির নেতৃবৃন্দ।
এব্যাপারে ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শহিদুল ইসলাশ টিটু বলেন, তিনি বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তিনি আওয়ামীলীগ সরকারের সময় ২০১৪ সালে ঢাকা থেকে র্যাবের হাতে আটক হয়ে ৯দিন গুম হয়েছিলেন। ২০২৪ সালে ঢাকার ধানমন্ডির একটি চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডিবির হারুন তাকে আটক করে ৭দিন গুম করে রেখেছিলেন। বারবার জুলুম নির্যাতনও হয়েছিলেন। কিন্তু দল তাকে মনোনয়ন দেয়নি। তারপরেও তিনি দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে জোটের দেয়া প্রার্থীর জন্যে কাজ করেছেন। যদি বিএনপি দুই নেতা বিেেদ্রাহী না হয়ে দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিতেন তাহলে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন হাত ছাড়া হতো না। দলীয় প্রতীক ধানের শীষ না হওয়ার পরেও খেজুর গাছ প্রতীক নিয়ে বিএনপির দুই বিদ্রোহী প্রার্থীর বিপরীতে ৮০ হাজারেরও বেশি ভোট পেয়েছেন কাশেমী। এরমূলে ছিলেন বিএনপির তৃণমূল নেতৃবৃন্দ। তিনি আরো বলেন, বিদ্রোহীরা শুধু দলের ক্ষতিই করেনি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপিকে ৩টি ভাগে ভাগ করেছেন। যারা দলের ক্ষতি করেছেন তারা ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ হবেন। দল কখনো তাদের ক্ষমা করবে না বলে মনে করেন তিনি।


