আত্মগোপনে থেকে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করছে শীর্ষ সন্ত্রাসী মোঘল
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
শীর্ষ সন্ত্রাসী মোঘল
# হত্যা-চাঁদাবাজি-ভূমিদস্যুতা-চে
কার্যক্রম নিষিদ্ধ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করছে রুপগঞ্জের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিকুল ইসলাম মোঘল। তার বিরুদ্ধে আওয়ামী নেতাকর্মীদের সংগঠিত করে সরকার বিরোধী কর্মকাণ্ডে ইন্ধন দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এ কাজে সহায়তা করতে তার রয়েছে দুই-শতাধিক প্রশিক্ষিত ক্যাডার। এছাড়া হত্যা-নারী নির্যাতন-জমিদখল ও চেক জালিয়াতিসহ একাধিক মামলা থাকার পরও আত্মগোপনে থেকে এমন অপতৎপরতা চালাচ্ছেন তিনি। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ।
জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পালিয়ে গেছে দলের শীর্ষ নেতারা। দেশে আত্নগোপনে থেকেও অনেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে দলের সাধারণ কর্মীদের সাথে। ঠিক এমনই সময় ফেরারি আসামি হয়েও দেশে ফিরে এসেছে তারিকুল ইসলাম মোঘল। দেশে ফিরেই সে বিএনপির একাংশের সঙ্গে আঁতাত করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করেছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর মোঘল দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করছেন। এসব নেতাকর্মীর নির্যাতনে বিএনপির লোকজন ঘরে থাকতে পারেনি। আবার অনেকের বাড়ি ঘরও দখল করার অভিযোগ রয়েছে। নিয়মিত চাঁদা দিয়ে ঘরে থাকতে হয়েছে আবার অনেককে। সেই মোঘল এখন এলাকায় ঘুরে বেড়ালেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে।
জানা গেছে, মোঘলের বাবা হারুন অর রশীদ ছিলেন একজন রিফিউজি (শরণার্থী)। যিনি পরে আশরাফ জুট (বর্তমানে উত্তরা) মিলে কেরানি হিসেবে চাকরি নেন। এক বেলা ভাত জুটলে, অন্য বেলা অনাহারে কাটাতে হতো মোঘলের পরিবারকে। এ রকম একটি পরিবারের ছেলে হয়েও একসময় আলাদিনের চেরাগ পেয়ে আঙুল ফুল কলাগাছ হয়ে যান মোঘল। কাঞ্চন পৌর এলাকায় মোঘল বাহিনীর রয়েছে অবৈধ অস্ত্রের বিশাল ভান্ডার। দেশি-বিদেশি পিস্তল, শটগান, দা-ছুরিসহ নানা অস্ত্রে সজ্জিত থাকে এই বাহিনী। মোঘলের বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ থানায় হত্যা মামলাসহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তার ফাঁসির দাবিতে কাঞ্চন এলাকায় বহুবার বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন হয়েছে। মোঘলের ছোটভাই শফির বিরুদ্ধেও রয়েছে ট্রিপল মার্ডারের অভিযোগ। মোঘল সম্প্রতি দেশে ফিরে আসায় আতঙ্কে দিন পার করছেন স্থানীয়রা। যদিও তার ভয়ে এখনও প্রকাশ্যে মুখ খুলতে নারাজ অনেকেই।
রূপগঞ্জ থানা ও আদালত সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৪ এপ্রিল প্রতারণার অভিযোগে মোঘলের নামে নারায়ণগঞ্জ আদালতে দুটি সিআর মামলা হয়, মামলা দুটি এখনও তদন্তনাধীন। এ ছাড়া রূপগঞ্জ থানায় ২০২৩ সালেও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে একটি মামলা (মামলা নং-৩১৬) হয়। তার বিরুদ্ধে বাছির হত্যা মামলা, বাদশা মেয়রকে হত্যাচেষ্টা ও আবুল বাশার মেয়রকে মারধরের অভিযোগেও রূপগঞ্জ থানায় মামলা রয়েছে। এ ছাড়াও একই থানায় তার নামে ২০০৯ সালে মারামারির অভিযোগে অপর একটি মামলা (মামলা নং-৩৯) করেন এক ভুক্তভোগী।
কাঞ্চন পৌর এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোঘলের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগের শেষ নেই। কাঞ্চন পৌর এলাকা ও কেন্দুয়ার মানুষ যেন এই মোঘল ‘সাম্রাজ্য’-এর প্রজা! এই অপরাধী নানা যোগসাজশের মাধ্যমে স্থায়ী জামিন লাভেরও অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এক সময়ের ভূমিদস্যূ, সন্ত্রাসী ও পাট জুয়াড়ি হিসাবে পরিচিত মুঘলের রয়েছে নানা দেশে গোল্ডেন ভিসা। এরমধ্যে দুবাই, নেপাল, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও শ্রীলঙ্কায় অন্যতম। সেখানে নিয়মিত আসা যাওয়া করে। এরমধ্যে দুবাইতে ১০ বছরের গোল্ডেন ভিসা ও থাইল্যান্ডের ২০ বছরের মাল্টিপোল ভিসা রয়েছে তার। যার কারণে বিপদ আচ করতে পারলেই চোখের নিমিষে দেশ ছাড়েন। অভিযোগ রয়েছে অর্থ পাচারের পাশাপাশি ওইসব দেশে নিয়মিত ক্যাসিনিও খেলতে যান। গত দেড় বছরে ওইসব দেশে ক্যাসিনি খেলে প্রায় ৩শ কোটি টাকা হেরেছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। ওইসব টাকা দেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার রুপগঞ্জ উপজেলার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জোর-জুলুম করে আদায় করা। অন্যের বাড়ি ও জমি দখল করে বিক্রির পর সেই টাকা নিয়ে তিনি বিদেশে প্রমোদ ভ্রমণে যান।
এছাড়া চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি অর্থ উপার্জনের অন্যতম উৎস তার। অবৈধ পথে এসব অর্থ উপার্জন করে দুবাই, নেপাল, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও শ্রীলঙ্কায় যাওয়ার পর তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করে ওইসব দেশের মাফিয়ারা। ৫ স্টার হোটেলে থাকা-খাওয়া ও মনোরঞ্জনের জন্য একাধিক দেশি বিদেশি নারীও তাকে সাপ্লাই দেওয়া হয়। যদিও তার পছন্দের তালিকায় থাকে নেপাল ও আরবের নারী। রাতভর মদ ও নারী নিয়ে মেতে থাকেন রূপগঞ্জের এই শীর্ষ সন্ত্রাসী। অভিযোগ রয়েছে দুবাইতে পলাতক একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গেও তার নিয়মিত বৈঠক হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দুদক ও সিআইডি মোঘলের এসব অপকর্মের তদন্ত করলে শতভাগ সত্যতা পাবে। কিন্তু অদৃশ্য কারণে তারা এখনও তদন্তের উদ্যোগ নেয়নি।
অনুসন্ধানে আরো বেরিয়ে আসে ওইসব দেশের পাশাপাশি মালয়েশিয়ার বড় বড় ক্যাসিনোতে মোঘলের রয়েছে বিশেষ সমাদর। তার নামে বিমানের বিজনেস ক্লাসের টিকিট ও পাঁচতারকা হোটেলে বিশেষ সুইট বরাদ্দ থাকে সব সময়। বিদেশের ক্যাসিনোতে মোগলের অন্যতম সঙ্গী মিরপুর এলাকার কুখ্যাত জুয়াড়ি মনির ওরফে আমেরিকান মনির ও সোহেল খান।
সূত্র বলছে, মাঝেমধ্যে বিদেশে যেতে না পারলে দেশে বসেই বিশেষ ব্যবস্থায় ভার্চুয়ালি ক্যাসিনো খেলেন শ্রীলংকা ও মালয়েশিয়ার ক্যাসিনো কোর্টে। অনেক সময় তার দুই সহযোগী সোহেল খান ও আমেরিকান মনির বিদেশের ক্যাসিনো টেবিল থেকে ভিডিও কল দেন। প্রতিবার বিদেশে যাওয়ার আগে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা হুন্ডিতে নেওয়া হয়। কামরুল নামের বিশ্বস্ত এক হুন্ডি ব্যবসায়ীর মাধ্যমে টাকা বিদেশে পাচার করেন। মোঘলের ক্যাসিনো খেলার কথা স্থানীয় প্রশাসনের অজানা নয়।


