নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের (নাসিক) সীমানা সম্প্রসারণের জন্য জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত গণবিজ্ঞপ্তিকে ঘিরে তীব্র আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত তালিকায় কোথাও পুরো ইউনিয়ন, আবার কোথাও একই ইউনিয়নের কেবল একটি অংশ বা একটি ওয়ার্ডের অংশবিশেষ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বর্তমানে একটি পক্ষ চাচ্ছেন পুরো ফতুল্লা সিটির আওতায় আসুক আবার আরেক পক্ষ চাচ্ছেন ফতুল্লাকে সিটিতে না নিয়ে পৌরসভায় রূপান্তরিত করা হোক।
স্থানীয় এক পক্ষের অভিযোগ, এ ধরনের খণ্ডিত সীমানা নির্ধারণ কোনো সুপরিকল্পিত নগরায়ণের উদাহরণ নয়; বরং এটি স্থানীয় জনগণের সঙ্গে তামাশা করার শামিল। অন্যপক্ষ বলছে, সিটি কর্পোরেশন এমনিতে বর্তমানের ২৭টি ওয়ার্ডই নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছেন এরই মধ্যে নাসিক আরো বড় হলে কাঙ্খিত সেবা বঞ্চিত হবে সাধারণ জনগণ। এদিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ৭ জুলাই প্রকাশিত গণবিজ্ঞপ্তিতে কুতুবপুর ইউনিয়নের ১ থেকে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সম্পূর্ণ এলাকা নাসিকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
কিন্তু একই সঙ্গে ফতুল্লা, কাশীপুর ও এনায়েতনগর ইউনিয়নের ক্ষেত্রে নেওয়া হয়েছে ভিন্ন নীতি। এসব ইউনিয়নের কেবল নির্দিষ্ট ওয়ার্ড বা আংশিক এলাকা অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর থেকেই বাদ পড়া এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। আরেকটি মহল পৌরসভা চাইতে চাইতে মুখে ফ্যানা তুলছেন। যাকে ঘিরে নাসিকের সীমানা সম্প্রসারণে বাড়ছে উত্তেজনা।
বিশ্লেষক মহল বলছে, সিটি কর্পোরেশনের সীমানা বাড়া কেবল আয়তনে বৃদ্ধির ব্যাপার নয়, ভোটারের পাশাপাশি নতুন এলাকা সংযুক্ত হওয়াতে সেই এলাকার রাজনৈতিক আধিপত্য, সামাজিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এতদিন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচনের জন্য সদর, বন্দর ও সিদ্ধিরগঞ্জের তথা নারায়ণগঞ্জ মহানগরের রাজনীতির হাওয়ার খবর রাখাটাই ছিল জরুরি। এবার কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদ যুক্ত হওয়াতে সেখানের স্থানীয় রাজনীতির একটি বড় অংশই মহানগরের বাইরে, ফলে নতুন এলাকা নতুনভাবে রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করবে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেই মত অনেকের।
স্থানীয় একপক্ষের ভাষ্য, যখন একটি ইউনিয়ন সম্পূর্ণভাবে সিটি কর্পোরেশনের আওতায় নেওয়া হচ্ছে, তখন পাশের ইউনিয়নের একই ধরনের জনবসতি ও নগরায়িত এলাকাকে টুকরো টুকরো করে বাদ দেওয়ার যৌক্তিকতা কীÑএই প্রশ্নের কোনো উত্তর প্রশাসন দেয়নি। সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে এনায়েতনগর ইউনিয়ন নিয়ে। গণবিজ্ঞপ্তিতে ৮ নম্বর ওয়ার্ডকে সিটি কর্পোরেশনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব থাকলেও পাশের ৯ নম্বর ওয়ার্ড সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ফতুল্লা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কেবল একটি অংশ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, অথচ একই ওয়ার্ডের অপর অংশ আগের মতোই ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে থাকবে। এ ধরনের সিদ্ধান্তে স্থানীয়দের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, একই ওয়ার্ডের একাংশ সিটি কর্পোরেশনের আওতায় আর অন্য অংশ ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে থাকলে প্রশাসনিক কার্যক্রম, নাগরিক সেবা, কর ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি হবে।
এদিকে বর্তমানে বিএনপির একাধিক নেতা কাশীপুর, ফতুল্লা ইউনিয়ন, এনায়েতনগর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনা দেখাচ্ছেন। এমতা অবস্থায় নাসিকের সীমানা সম্প্রসারণে ইউনিয়নগুলোর একাংশ আওতায় আশার নোটিশে নাখোশ সেই পক্ষ। বর্তমানে এক পক্ষ চাইছেন পুরোই ফতুল্লা সিটি এলাকার আওতায় আসুক আরেক পক্ষ জনগণকে ভয়ভীতি দেখিয়ে সিটি কর্পোরেশনের বাহিরে ইউনিয়নই রাখতে চাইছেন।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাসিন্দাদের মতামত, আপত্তি ও পরামর্শ গ্রহণের জন্যই গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রাপ্ত আবেদনগুলো শুনানির মাধ্যমে পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে সীমানা সম্প্রসারণের বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যবসায়ী মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, ভবিষ্যতের পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সমন্বিত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে হলে চারটি ইউনিয়নের পুরো এলাকাকেই নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। অন্যথায় প্রশাসনিক জটিলতা ও বৈষম্য তৈরী হবে এই অঞ্চলগুলোতে।