ওয়াজেদ আলী খোকনে বিব্রত মহানগর আওয়ামী লীগ
যুগের চিন্তা অনলাইন
প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০৯:০৭ পিএম
অবৈধ সম্পদ থাকার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ও মহানগর আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদক এড. ওয়াজেদ আলী খোকন ও তার স্ত্রী সেলিনা ওয়াজেদ মিনুর বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলা দুটিতে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিয়েছেন স্বামী-স্ত্রী। ওয়াজেদ আলী খোকন যিনি বিজ্ঞ পিপির পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয়। নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদক হিসেবে তিনি বর্তমান কমিটিতে রয়েছেন। অবৈধ সম্পদ থাকার অভিযোগে ওয়াজেদ আলী খোকন ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা মামলার প্রভাব পড়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনেও। বিশেষ করে মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, তাদের কমিটিতে থাকা একজনের বিরুদ্ধে দুদক অবৈধ সম্পদ থাকার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন এটি তাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। দোষ-ত্রুটি কিংবা নির্দোষ যাই হোক না কেন, আপাতত তারা এব্যাপারটিতে বিব্রত। কমিটিতে থাকা বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা বলছেন, সভানেত্রী শেখ হাসিনা কখনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননা। তাই তিনি অভিযোগের পাহাড় যার বিরুদ্ধেই উঠুক ব্যবস্থা নিতে পিছপা হননা। ওয়াজেদ আলী খোকন যদি দুদকের মামলায় আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন তবে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণেরও উদ্যোগ নেবে মহানগর আওয়ামী লীগ।
মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘অবৈধ সম্পদ থাকার অভিযোগে মহানগরের আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদক ওয়াজেদ আলী খোকন ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকের মামলার ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই আমরা বিব্রত। জনগণের সাথে আমরাও বিব্রত বোধ করছি। আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে। আইনী প্রক্রিয়া নিয়ে কোন মন্তব্য আমরা না করতে পারলেও এতোটুকু বলতে পারি আমরা এঘটনায় সত্যিই বিব্রত।’
মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শেখ হায়দার আলী পুতুল বলেন, ‘যে ধরণের অভিযোগ ওয়াজেদ আলী খোকনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়েছে তাতে আমরা বিব্রত। আদালতের প্রমাণ সাপেক্ষ বিষয় যেহুতু, সেহুতু যদি আদালতে প্রমাণিত হলে আমরা ওয়াজেদ আলী খোকনের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেবো। আমরা তাঁর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠায় অবশ্যই বিব্রত বোধ করি।’
মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জিএম আরমান বলেন, ‘অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের প্রচলিত আইনে আমাদের কমিটির আইন সম্পাদক ওয়াজেদ আলী খোকনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুলে মামলা দায়ের করা হয়েছে এতে আমরা বিব্রত। শুধু আমরাই নই, এটা নিয়ে সারা শহরে নানা আলোচনা হচ্ছে। আইনী প্রক্রিয়া আইনের গতিতেই চলবে। আদালতে প্রমাণিত হলে অপরাধ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জিএম আরাফাত বলেন, ‘ওয়াজেদ আলী খোকন ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা দায়েরের ঘটনায় আমরা অবশ্যই বিব্রত। তিনি পাবলিক প্রসিকিউটর, সরকারি সর্বোচ্চ কৌঁশুলি। তার বিরুদ্ধে যদি এমন অভিযোগ হয়, তখন বিষয়টি বিব্রতকরই বটে। প্রাথমিকভাবে মামলা দায়েরের পর তিনি জামিন নিয়েছেন। অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা দায়ের হওয়াটা যেমন তার জন্য বিব্রতকর, তেমনি আমরা যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করি সবার জন্যই এটা বিব্রতকর। তবে এটা প্রমাণ সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে এতোটুকু স্পষ্ট বলতে পারি, এই ব্যাপারটিতে আমরা সবাই বিব্রত।’
প্রসঙ্গত, অবৈধ সম্পদ থাকার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ও মহানগর আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদক এড. ওয়াজেদ আলী খোকন ও তার স্ত্রী সেলিনা ওয়াজেদ মিনুর বিরুদ্ধে বুধবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম বাদী হয়ে মামলা দু’টি দায়ের করেন। সংস্থাটির জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য বিষয়টি নিশ্চিত করেন। বৃহস্পতিবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) তারা নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পান।
প্রথম মামলার অভিযোগে বলা হয়, এসএম ওয়াজেদ আলী খোকন, পাবলিক প্রসিকিউটর, নারায়ণগঞ্জ দুর্নীতি দমন কমিশনে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে তার নিজ নামে ও তার উপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের নামে ৮৫ লাখ ৩২ হাজার ৩৭৫ টাকার সম্পদের তথ্য প্রদর্শন না করে গোপনপূর্বক মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য দেন। তা স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে গোপন করা সম্পদসহ মোট ৯৯ লাখ ৪৯ হাজার ৩৫৫ টাকার জ্ঞাত-আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে দখলে রাখায় তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়।
অপর মামলায় বলা হয়েছে, মিসেস সেলিনা ওয়াজেদ মিনুর দুর্নীতি দমন কমিশনে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে তার নিজ নামে ২৭ লাখ ৩৯ হাজার ১৬১ টাকার সম্পদের তথ্য প্রদর্শন না করে গোপনপূর্বক মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য দিতো। স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে উক্ত গোপন করা সম্পদসহ মোট ১ কোটি ১ লাখ ৫৬ হাজার ১৭৪ টাকার জ্ঞাত-আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করার অভিযোগে মামলা করা হয়।
প্রসঙ্গত, গত বছরের অক্টোবর মাসে নারায়ণগঞ্জ জজকোর্টের পিপি ওয়াজেদ আলী খোকনের বাড়িতে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকের একটি প্রতিনিধি দল। পরে দলটি ওয়াজেদ আলী খোকনের স্ত্রীর ইনকাম ট্যাক্সের ফাইল অনুসন্ধানের জন্য নিয়ে যায়। এসময় পিপি এবং তাঁর স্ত্রীসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
তখন ওয়াজেদ আলী খোকন এর আগে তাঁর সম্পদের যেই বিবরণী জমা দিয়েছিলেন সেখানে বর্তমান সম্পদের সঙ্গে ব্যাপক পার্থক্য পেয়েছিলো অনুসন্ধানকারী দল।
তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তথ্যগুলো উঠে এসেছে তার স্ত্রী সম্পদ বিবরনীতে ট্যাক্স ফাইলে ব্যাপক গড়মিল পাওয়া গেছে। প্রথমে তার স্ত্রীর সম্পদগুলো তার ভাইয়ের নামে রেজিষ্ট্রি করে এবং পরে তা হেবা করে নিজের নামে ট্রান্সফার করা হয় তার ফাইলে। এছাড়া তাদের ফাইলে যেসব ব্যবসার উল্লেখ করা হয়েছে, বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি দুদক।
এর আগে ২০১৮ সালের মে থেকে নারায়ণগঞ্জ জজকোর্টেও পাবলিক প্রসিকিউটর ওয়াজেদ আলী খোকনের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠে। এরপর থেকেই তার সেই অবৈধ আয়ের অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন।
গত বছরের ২৮ মে দুদক থেকে ওয়াজেদ আলী খোকনকে চিঠি পাঠায় দুদক। পরে ২৯ মে তাকে দুদক কার্যালয়ে এক ঘন্টার মতো জিজ্ঞেসা করে।


