ইউপি নির্বাচনে উপজেলা নয়, জেলা কমিটিই তৃণমূলের ভরসা
যুগের চিন্তা অনলাইন
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২১, ০৭:৩৭ পিএম
বন্দরের ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের উপজেলা কমিটির উপর ভরসা রাখতে পারছে না ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের তৃণমূল নেতৃবৃন্দ। বন্দর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের, বিশেষ করে বয়স্ক ও অভিজ্ঞ আওয়ামী নেত্রীবৃন্দের দাবি, উপজেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কোন কমিটি গঠন বা অনুমোদন হয়নি।
তারা মনে করেন, এই কমিটিতে যারা আছেন তারা আওয়ামী লীগের স্বার্থের চেয়ে নিজেদের স্বার্থকে বেশী প্রাধান্য দিচ্ছেন। এখানে যদি সত্যিকার অর্থে আওয়ামী লীগের কাউকে চেয়ারম্যান হিসেবে অধিষ্ঠিত করতে হয়, তাহলে উপজেলা কমিটিকে বেশী আমলে নিলে হবে না। তাদেরকে এড়িয়ে যদি জেলা আওয়ামী লীগের সাথে যোগাযোগ রক্ষা এবং তাদেরকে প্রকৃত কারণ বোঝানো যায়, তাহলে এখানকার আওয়ামী লীগ পুরোপুরি পুনরুদ্ধার না হলেও অনেকটাই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তাদের দুর্বল অবস্থানে কিছুটা হলেও প্রাণ খুঁজে পাওয়া যাবে।
বিভিন্ন সূত্র যুগের চিন্তাকে জানায়, এখানকার আওয়ামী লীগের তরুণরা অর্থ ও আধিপত্যের আশায় অনেকটাই জাতীয় পার্টির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। তাদের ধারণা ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের নেতা হতে হলে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের স্নেহভাজন হওয়া টনিকের মতো কাজ করে। আর পয়সাকড়ি ভাগবাঁটোয়ারায় সহজে সামিল হওয়াসহ প্রাধান্য বিস্তার মোট কথা সহজ উপায়ে দ্রুত নেতা এবং অর্থের মালিক দুটোই হওয়া যায়। কিন্তু যারা প্রকৃত আওয়ামী লীগের কর্মী বা নেতা, যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে ধারণ এবং লালন করে, তারা কখনো তৃণমূলকে ভুলতে কিংবা তাদের অবজ্ঞা করতে পারে না।
যারা এটা করতে পারে, তারা আর-যে-যা-ই বলুক প্রকৃত আওয়ামী লীগের কর্মী হতে পারে না। তবে আওয়ামী লীগের বোদ্ধা মহলের ধারণা বন্দরের শুধু উপজেলা কমিটি নয়, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়েও এমন অনেক নেতা আছে যারা জাতীয় পার্টিসহ বিএনপি এমনকি যারা রাজাকার তাদের সাথেও একই টেবিলে খাবার খাওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধান্দার টাকার ভাগবাঁটোয়ারা করে। এটা আওয়ামী লীগকে দুর্বল করে জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী করার একটা কৌশল।
সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ যত দুর্বল হবে জাতীয় পার্টির জন্য ততটাই লাভ। তাহলে এখানকার আওয়ামী লীগের ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারক হয়ে যাবে জাতীয় পার্টি তথা একজন নেতা ও তার পরিবারের হাতে মুঠোয়। তাই এখান থেকে কেউ আওয়ামী লীগের ভবিষ্যত নেতা হইতে চাইলেও তা দলের ইচ্ছেয় পারবে না। আর এজন্য এখানকার কিছু স্বার্থ লোভী আওয়ামী লীগ নেতাদেরকে চিহ্নিত করে তাদের তার নিজের আনুগত্যে আনেন।
পরে তাদের নেতৃত্বে এখানকার তরুণ শ্রেণির যারা আওয়ামী লীগের সমর্থক তাদের হাতের মুঠোয় এনে আওয়ামী লীগকে তার হাতের মুঠোয় আনার চেষ্টা করেন এবং তাদের উপর ছড়ি ঘোরানোর দায়িত্ব দেন। আর এতে তারা মহা খুশি হয়েই নিজের স্বার্থের কথা চিন্তা করে এবং অর্থের লোভে নিজের দলের স্বার্থ, বঙ্গবন্ধু’র আদর্শ ভুলে যান। তাই এসব নেতাদের উপর কোন অবস্থাতেই ভরসা করা যাবে না বলে মনে করেন ত্যাগী ও বিভিন্ন অবহেলার শিকার তৃণমূলের এই নেতাকর্মীরা। আর এই জন্যই বন্দর আওয়ামী লীগকে ভেঙ্গে দুইটি ভাগ করে উপজেলা ও থানা কমিটি নামে দুইটি আলাদা কমিটি করার কথা বলে উপজেলা কমিটির নাম করে নেতৃত্ব ভাগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে একটি পক্ষ। আর থানা কমিটিতে তৃণমূল আওয়ামী লীগ ও স্বার্থবাজ আওয়ামী লীগের টক্কর সমানে সমান হওয়ায় স্বার্থবাজদের নিয়ে কমিটি করতে অনেকটা বেগ পেতে হচ্ছে। তাই এখনো এই কমিটি গঠনে এত কালক্ষেপণ করা হচ্ছে বলে তাদের ধারণা।
যুগের চিন্তাকে তারা আরো জানায়, কিছুদিন আগে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কমিটি গঠনের জন্য যে নামের তালিকা সুপারিশ করা হয় সেখানেও নাকি উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি থেকে তৃণমূলের আওয়ামী কর্মীদের বাদ দিয়ে তাদের জ্বী-হুজুর টাইপের নেতাকর্মীদের এখানে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এ বিষয়টি নিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের অনেকের কাছেই অভিযোগ করেন বন্দরের তৃণমূলের আওয়ামী লীগ। তাই ইউনিয়ন নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর বিষয়টি নিয়ে তারা উপজেলা কমিটির শরণাপন্ন হতে হলেও জেলা কমিটির উপরই ভরসা বেশী রাখবেন বলে জানান তারা।
সূত্র আরো জানায় এবার এখানকার আওয়ামী লীগ বিশেষ করে তৃণমূল আগের তুলনায় অনেকটাই একতাবদ্ধ। শুধু তারা এতটুকু নিশ্চয়তা চায় যে, এখানকার সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান এই নির্বাচনে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করবেন না। সেলিম ওসমান হস্তক্ষেপ না করলে এবং প্রশাসন যদি ডাইরেক্ট জাতীয় পার্টির পক্ষে কাজ না করে, তাহলে এখানকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় কেউ আটকাতে পারবে না।
তার কারণ তাদের ধারণা, সারা বাংলাদেশের উন্নয়নে এখানকার সাধারণ মানুষ এখন আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, বাঁধা শুধু জাতীয় পার্টি তথা এমপি সেলিম ওসমান। এমপি ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ছাড়া আওয়ামী লীগের সুযোগ সন্ধানীরা এখানে এর কোন হেরফের করতে পারবে না। যদি কোন কারণে এবারও তারা সফল হয়, তাহলে এখানকার আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিনের হুমকিতে পড়বে। আওয়ামী লীগের নাম থাকবে (সুযোগ সন্ধানিরা ব্যবহার করবে) কিন্তু প্রকৃত অর্থে বঙ্গবন্ধু’র স্বপ্নের আওয়ামী লীগের কোন অস্তিত্ব থাকবে না।
এর আগে এসব বিষয়ে কথা বললে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আরজু রহমান ভ‚ঁইয়া জানান, বন্দরে (নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন) বর্তমানে যে এমপি আছে তিনি আওয়ামীলীগের সমর্থিত জাতীয়পার্টির এমপি, ওসমান পরিবারের এমপি। তার মতে বন্দরে আওয়ামী পরিবার ও জাতীয়পার্টি সবই তারা। এই পরিবারকে বাদ দিয়ে বন্দর থানার নেতৃবৃন্দ কোন কাজ করতে পারবে না। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ বারবার এখানে জাতীয়পার্টির প্রার্থী দেয়ায় এখানকার আওয়ামী লীগের যে অবস্থা হয়েছে তা কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগ জানে।
বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন জানান, বন্দর উপজেলা নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের অন্তর্ভূক্ত, আর সেখানকার সংসদ সদস্য যেহেতু জাতীয় পার্টির। তাই স্বভাবতই তারা জাতীয় পার্টিকে সমর্থন করবে এবং যারা জাতীয় পার্টির সমর্থক তাদের সুযোগ বেশী দিবে। আওয়ামী লীগের মধ্যে যারা সুবিধাভোগী তারাতো সুবিধা আদায়ের জন্য অর্থ, বিত্ত, স্বার্থ আদায়ের জন্য তাদের সাথে মেলামেশা করে। যারা আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতা তারা ঐ জিনিসটা পছন্দ করে না বলে দাঁতে দাঁত কামড়িয়ে দলের নিয়মিত কর্মী হিসেবে টিকে থাকে। তারা দলের বাইরে যেতে পছন্দ করে না। আবার দলের ভাবমুর্তি নষ্ট করতেও চায় না। সেখানে দলের নেতৃত্বে যারা আছে তারাতো তাদের সুবিধার জন্য জাতীয়পার্টির সাথে আঁতাত করে তাদের মতো তারা চালিয়ে যাচ্ছে, সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে।


