# প্রস্তাবিত কমিটির তালিকা গঠনে একাধিক সিন্ডিকেটের হস্তক্ষেপ
# তারেক রহমানের কাছে রিপোর্ট জমা, সেপ্টেম্বরে আসতে পারে কমিটি
# কারো চাপের সম্মুখীন হইনি : নাসির উদ্দিন
# কমিটি চুড়ান্ত করবে তারেক রহমান : তৈমূর
জেলার প্রতিটি থানা ও পৌর কমিটিগুলো ঢেলে সাজানোর দায়িত্ব পড়েছে তৈমূর আলম খন্দকারের নেতৃত্বাধীন আহবায়ক কমিটির উপর। কমিটি গঠনে অনিয়ম রূখতে এবং যোগ্যব্যক্তিদের দ্বারা কমিটি তৈরী করতে আহবায়ক কমিটির মাধ্যমে গঠন করা হয় থানা বা ইউনিট ভিত্তিক ১০ সাব-কমিটি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় এই সিদ্ধান্ত হয়েছিলো। বর্তমান হাই কমান্ডের এই উদ্দেশ্য মহৎ হলেও ওই সাব কমিটির বেশির ভাগ নেতা নির্দিষ্ট সেন্ডিকেটকে খুশি করার মিশনে রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তাই সাব কমিটিগুলোর দায়িত্বে থাকা নেতাদের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা চলছে তৃণমূলে।
জানা গেছে, ১০টি ইউনিটের মধ্যে ৫টি থানা এবং ৫টি পৌরসভা রয়েছে। এসব থানা ও পৌরসভার কমিটি গোছানোর লক্ষ্যে আহবায়ক কমিটির মধ্যে ১০টি উপ কমিটি গঠন করা হয়েছিলো আরো কয়েক মাস পূর্বে। তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কমিটির তালিকা তৈরী করতে না পারলেও সম্প্রতি জেলা কমিটির আহয়বায়কের কাছে ১০টি ইউনিটেরই তালিকা ও রিপোর্ট জমা হয়েছে। গত ১৭ আগষ্ট দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে এই তালিকা উপস্থাপন করেছেন জেলা বিএনপির আহবায়ক তৈমূর আলম খন্দকার।
এদিকে, ইউনিট কমিটির তালিকা তৈরীকালে অধিকাংশ উপ-কমিটির নেতারা নানাকারণে সিন্ডিকেটের জালে জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য গিয়াস উদ্দিন, শাহ-আলম, নজরুল ইসলাম আজাদ, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান মনিরসহ সাবেক নেতাদের মধ্যে পৃথক ভাবে এসব সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তারা নিজেদের বলয়ের লোকদের কমিটিতে আনার জন্য উপ-কমিটির নেতাদের কার্যক্রমে সুপারিশ ও হস্তক্ষেপ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব সিন্ডিকেটকে খুশি করতে গিয়ে তালিকায় অযোগ্য ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের নামও অর্ন্তভুক্ত করার খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, সাব-কমিটির দায়িত্বে থাকা নেতারা তাদের সিন্ডিকেটকে খুশি করতে অযোগ্যদের তালিকাভুক্ত করলেও অনেক প্রার্থীর সাথে যোগাযোগই করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রার্থীরা।
জানা গেছে, আড়াইহাজার থানা কমিটি গঠন পক্রিয়ার দায়িত্ব পেয়েছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক জাহিদ হাসান রোজেল এবং আড়াইহাজারের পোরসভার কমিটির তালিকা করার দায়িত্ব পেয়েছেন যুগ্ম আহবায়ক নজরুল ইসলাম পান্না মোল্লা। কিন্তু পান্না মোল্লা কমিটি গঠন কার্যক্রমের জন্য আড়াইহাজার উপজেলায় সরেজমিনে যাননি বলে স্থানীয় নেতারা অভিযোগ করেছেন। এমনকি পৌর কমিটিতে যারা প্রার্থী হতে চান, তাদের সাথেও যোগাযোগ করেননি বলে অভিযোগ। প্রার্থীরা বলছেন, পান্না মোল্লা নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটকে খুশি করতেই অদৃশ্য ব্যক্তির ইশারায় কমিটির তালিকা তৈরী করেছেন বিধায় অন্যান্য প্রার্থীদের সাথে যোগাযোগও করেননি। এতে ক্ষুব্ধ আড়াইহাজারের দুটি পৌরসভার একাধিক নেতারা। এদিকে, সোনারগাঁয়ে কমিটি গঠনের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পূর্বেই আজহারুল ইসলাম মান্নানের বাসায় ভুরিভোজ করেছেন জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির একাধিক নেতা। জানা গেছে, গরু জবাই করে ভুরিভোজ করানো আজহারুল ইসলাম মান্নানই পাচ্ছেন সোনারগাঁ বিএনপির নেতৃত্ব।
অন্যদিকে, ফতুল্লা থানা বিএনপির কমিটি গঠনের কার্যক্রম নিয়েও চারিদিক থেকে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। একাধিক সূত্রের অভিযোগ, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য শিল্পপতি শাহ-আলম ফতুল্লা থানা বিএনপির কমিটিতে তার বলয়ের নেতাদের জায়গা করে দেয়ার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। ফতুল্লায় বিতর্কিত বিএনপি নেতা আবুল কালাম আজাদ বিশ্বাসকে কমিটিতে অর্ন্তভুক্ত করতে চাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, ফতুল্লা থানা বিএনপির কমিটির তালিকা ও রিপোর্ট তৈরীর দায়িত্ব পেয়েছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক মো. নাসির উদ্দিন। তিনি মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে আলোচনা করলেও শাহ-আলম, সাবেক সাংসদ গিয়াস উদ্দিন ও তৈমূর আলম খন্দকার সিন্ডিকেটের ত্রি-মুখি অনুরোধের মধ্যে পড়েছেন। তাই গুরুত্বপূর্ন অঞ্চল ফতুল্লার নেতৃত্বে যারাই আসতে চেয়েছেন, চাপ বা বিতর্ক এড়াতে সকলের নামই তিনি তার প্রস্তাবিত তালিকায় অর্ন্তভুক্ত করেছেন। তবে, তিনি কমিটির কার্যক্রম নিয়ে কারও চাপের শিকার হননি বলে দাবি করছেন।
এই বিষয়ে নাসির উদ্দিন যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘আমি ফতুল্লায় কারো চাপের সম্মুখিন হইনি। তবে, ফতুল্লায় যেহেতু প্রার্থী বেশি, সেহেতু যারাই নেতৃত্ব চেয়েছেন, তাদের নামই তালিকাভুক্ত করেছি। পাশাপাশি তাদের এ্যাক্টিভিটিসের বিষয়েও রিপোর্ট দিয়েছি। তাই আমি বিশ্বাস করি, যারা যোগ্য, যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে ফতুল্লায় তারাই নেতৃত্ব পাবেন। কারণ ফতুল্লা গুরুত্বপূর্ন অঞ্চল। এই অঞ্চলে শয়ং তারেক রহমান সাহেবের দৃষ্টি আছে।’ এদিকে, তৃণমূলের নেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে যেসকল কমিটি গঠনের পক্রিয়া চলছে, এসকল কমিটি যদি ব্যক্তি বিশেষকে খুশি করার লক্ষ্যে গঠন করা হয়, তাহলে প্রতিটি ইউনিটে পাল্টা কমিটি আসতে পারে। জানা গেছে, গত ১৭ আগষ্ট জেলার প্রতিটি ইউনিট কমিটির তালিকা ও রিপোর্ট তারেক রহমানের কাছে দিয়েছে তৈমূর আলম খন্দকার। আগামী মাসের শুরুতেই চুড়ান্ত কমিটি আসতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি।
এই বিষয়ে তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, আমার কাছে উপ-কমিটির নেতারা যেই রিপোর্ট দিয়েছে, “আমাদের সেই রিপোর্ট দলের চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান এগুলো পর্যালোচনা করে যা সিদ্ধান্ত দেবেন, সেটাই চুড়ান্ত হবে। আমরা আশা করছি, পহেলা সেপ্টেম্বরে আমাদের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে এসব কমিটির অনুমোদন আসবে। তবে, এটা চেয়ারম্যানের উপর ডিপেন্ড করছে। কমিটি গঠনে অর্থ বাণিজ্য ও সিন্ডিকেটের অভিযোগের বিষয়ে তৈমূর আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই ধরনের সমালোচনা রোজ হচ্ছে। এগুলোতে আমার কিছু আসে যায় না। বহু ঘাত প্রতিঘাতের পর আজ এখানে এসেছি। গুলি খেয়েছি। পাশের মানুষ মারা গেছে।’
তিনি আরো বলেন, কমিটি গঠন করতে গেলে সবাইকে খুশি করা সম্ভব হবে না, এটাই স্বাভাবিক। যার নাম দেয়া হবে না, সেই বলবে যে টাকা খেয়েছি! বিআরটিসির চেয়ারম্যান ছিলাম, তখন একহাজার লোককে চাকুরি দিয়েছি, কেউ বলতে পারেনি যে, ২টাকা কারো কাছ থেকে নিয়েছি। এখন কমিটি দিয়ে টাকা খাচ্ছি? কমিটিকি আমি একা দেই? শুধু আমার নামই কেন! বিতর্ক ছড়ায় বিধায় এখন আর আমি দায়িত্ব নেই না। চেয়ারম্যানের কাছেই কমিটির সকল রিপোর্ট দিয়ে দিয়েছি।” তৈমুর বলেন, “চেয়ারম্যান (তারেক রহমান) বলেছেন, ‘যারা বিতর্কিত তাদের এড়িয়ে চলার জন্য। তার কাছে আমাদের চাইতেও বেশি রিপোর্ট আছে।” শেষমেষ কেমন কমিটি পেতে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি থানা ও পৌরসভাগুলো, সেটাই এখন দেখার বিষয়।


