চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটি গঠন করে কেন্দ্র। জেলার প্রতিটি থানা ও পৌর কমিটিগুলো ঢেলে সাজানোর দায়িত্ব আক্ষরিক ভাবে তাদের উপর ন্যাস্ত থাকলেও কমিটি গঠনে অনিয়ম রুখতে গঠন করা হয় ইউনিট ভিত্তিক উপ-কমিটি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এই উদ্দেশ্য মহৎ হলেও এসব উপ-কমিটির সিংহভাগ নেতা সেন্ডিকেটে ঝুঁকে পড়েছেন- এমন অভিযোগ দলীয় নেতাকর্মীদেরই।
ইতিমধ্যেই একাধিক উপ-কমিটির নেতাদের ভূমিকা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা চলছে তৃণমূলে। বিশেষ করে ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জে ক্ষোভে ফুঁসছে পোড় খাওয়া বিএনপি নেতারা। কেননা, থানা ও পৌরসভা বিএনপির আসন্ন কমিটিতে প্রার্থী হতে চান- এমন অনেকের সাথে যোগাযোগই করেননি উপ-কমিটির নেতারা। জেলা কমিটির শীর্ষ পদে থাকা দুই নেতার গোপন প্রেসক্রিপশনে কমিটি গঠনের প্রচেষ্টা চলছে বলে বিএনপির নেতারা চারিদিক থেকে অভিযোগ তুলছেন।
এমনকি, যাদের হাতে ইউনিট কমিটির তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তারাও সিন্ডিকেটের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন বলে বিএনপি অঙ্গণে চাউর হচ্ছে। তৃণমূলের ভাষায় এটিকে সর্ষের মধ্যে ভুত বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এমনকি আওয়ামী লীগের সাথে মিলেমিশে গা বাঁচিয়ে যারা কর্মসূচির নামে ফটোসেশন করেছেন, বিগতে সময়ে তারা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিলেও প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী তাদেরকেই কমিটিতে অর্ন্তভুক্ত করার সুক্ষ্ম প্রচেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে, মামলার বোঝা কাঁধে নিয়ে পোড় খাওয়া নেতারা হচ্ছেন বঞ্চিত। এতে করে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বার্তা উপেক্ষিত হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির আসন্ন কমিটিতে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে শাহ-আলম হীরাকে। তাঁকে সদস্য সচিব পদে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অথচ, শাহ-আলম হীরা আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান। তার মা রাশেদা বেগম সিদ্ধিরগঞ্জ থানা মহিলা আওয়ামী লীগের সম্পাদিকা। তার আপন বড় ভাই মো. সালাম মাহমুদ নাসিক ৫নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ছোট ভাই বাপ্পি নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। যিনি কিছুদিন আগেও মাদকসহ র্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়।
পরিপূর্ন আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান এই শাহ-আলম হীরাকে জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য করার পরও তা নিয়ে তুমুল সমালোচনা হয়েছিলো জেলাজুড়ে। এবার সব সমালোচনা কাঁধে নিয়েও রহস্যজনক কারণে সেই শাহ-আলম হীরাকেই সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সদস্যসচিব করার মিশনে নেমেছেন জেলা কমিটির শীর্ষ এক নেতা, যিনি সিদ্ধিরগঞ্জের বাসিন্দা এবং বিলুপ্ত হওয়া জেলা বিএনপির পূর্বের কমিটিতেও ওই শীর্ষ পদে ছিলেন।
জানা গেছে, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা কমিটির তথ্য ও তালিকা গঠনের দায়িত্ব পেয়েছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক অ্যাড. হুমায়ুন। ইতিমধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জের তথ্য ও প্রতিবেদন তিনি জমা দিয়েছেন। তবে, কার্যক্রম সম্পাদনকালে তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক এবং জেলা বিএনপির ১ম যুগ্ম আহবায়ক মনিরুল ইসলাম রবির সাথে যোগাযোগই করেননি। অথচ, মনিরুল ইসলাম রবি সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির আহবায়ক পদপ্রার্থী ছিলেন।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, কেবল মনিরুল ইসলাম রবিই নন, কমিটিতে আসার যোগ্যতা রাখা আরো একাধিক নেতার সাথেও যোগাযোগ করা হয়নি। এমনকি সরকার দলীয় মামলার বোঝা কাঁধে নিয়ে কয়েক মাস ধরে জেল হাজত খাটা কাউন্সিলর ইকবালকেও মাইনাস করার গোপন প্রচেষ্টা চলছে বলে বিএনপির একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। সিদ্ধিরগঞ্জের দায়িত্ব পাওয়া জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক অ্যাড. হুমায়ুনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি গোপন প্রতিবেদন করেছি। এটা আপনারা জানলেন কীভাবে? আর আমি কমিটি করার দায়িত্ব পাইনি। তথ্য সংগ্রহ করে রিপোর্ট করতে বলা হয়েছে, আমি সেই রিপোর্ট তৈরী করে জমা দিয়েছি। যারা প্রার্থী হতে চায়, তাদের মধ্যে যতদুর সম্ভব হয়েছে, ততজনের সাথে কথা বলেছি এবং প্রতিবেদনে তথ্য উপস্থাপন করেছি।’
এদিকে, ফতুল্লাতেও সৃষ্টি হয়েছে সমালোচনা। নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী এক নেতা ও পরিবারের পোষ্যতা স্বীকার করা আবুল কালাম আজাদ বিশ্বাসের হাতে ফতুল্লার নেতৃত্ব তুলে দেয়ার সুক্ষ্ম প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিলো। তবে, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে আজাদ বিশ্বাসের অবিশ্বাসী কর্মকান্ডের তথ্য প্রমাণ থাকায় পদবীর দৌড়ে আজাদ বিশ্বাস ছিটকে গেছেন বলে দলীয় সূত্রে খবর পাওয়া গেছে। কিন্তু শাহ-আলম হীরার ক্ষেত্রে কী অপেক্ষা করছে, সেটাই এখন দেখার বিষয় বলে মন্তব্য করছেন বিএনপির পোড় খাওয়া নেতারা।
তবে, অযোগ্যদের হাতে যদি থানা বা পৌরসভা বিএনপির কমিটিগুলোর নেতৃত্ব তুলে দেয়া হয়, তাহলে চরম অস্থিরতা দেখা দিবে নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে। এমনকি নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটবে বলেও বার্তা পাওয়া গেছে। বোদ্ধামহল বলছেন, খাদের কিনারায় থাকা নারায়ণগঞ্জ বিএনপিকে টেনে তোলার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তৈমুর আলম খন্দকারের কাঁধে। তবে, কমিটি গঠন নিয়ে নেতাকর্মীদের নানা অনিয়মের অভিযোগ এখন তৈমুরের পাশাপাশি জেলা কমিটির সদস্য সচিব মামুন মাহমুদের দিকে। তাই অযোগ্যদের হাতে যদি কমিটি তুলে দেয়া হয়, তাহলে নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের বিস্ফোরণে পুড়তে হবে জেলা বিএনপির এই দুই শীর্ষ নেতাকেই।


