Logo
Logo
×

রাজনীতি

দানে দানে তিন দান

Icon

যুগের চিন্তা অনলাইন

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২১, ০৬:৩৩ পিএম

দানে দানে তিন দান
Swapno

# বিতর্কিত হলেও নির্বাচনের আগে হন দুধে ধোয়া তুলসী পাতা


# বিএনপি-জাতীয় পার্টির রাজনীতিবিদরাও হাইব্রীড আওয়ামী লীগার


# কর্ম-জনপ্রিয়তার চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ প্রাধান্য পায়



নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন গঠিত হয়েছে ২০১১ সালে। দেশের সবগুলো সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন বিবেচনায় অন্যতম স্থানে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন। নাসিকের ২৭টি ওয়ার্ডেই ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। তবে এসব উন্নয়ন হলেও অনেক কাউন্সিলররা হয়েছেন বিতর্কিত। সিটি এলাকার দুইবারের নির্বাচনে ২৭ ওয়ার্ডের অধিকাংশ কাউন্সিলররাই দ্বিতীয় মেয়াদে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকেই বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন ডিসেম্বরে নাসিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার খবর জানালে তৃতীয় মেয়াদে আবারো নির্বাচিত হওয়ার জন্য তোরজোর শুরু করেছেন এসব কাউন্সিলর।

 

সূত্র জানিয়েছে, ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাংসদ শামীম ওসমানের অনুসারী বলে পরিচিত মোট ১৩ জন কাউন্সিলর পদে জিতেছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে বোমা, মাদক ও হত্যা মামলা রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২৭টি কাউন্সিলর পদের মধ্যে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ১৩ জন এবং বিএনপি-সমর্থিত ১২ জন, জাতীয় পার্টির ১ জন ও বাসদ-সমর্থিত ১ জন প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। আর সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরের ৯টি পদের ৬টিতে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ও এবং বাকি ৩টিতে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। অর্থাৎ মোট ৩৬ জন কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে আওয়ামী লীগের ১৯ জন, বিএনপির ১৫ এবং জাপা ও বাসদের একজন করে প্রার্থী জয়ী হয়েছিলেন। এদের মধ্যে ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সিটি কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ১৫ জন।

 

সূত্র জানিয়েছে, নানা অভিযোগ, বিতর্কিত ও মাদক মামলায় শ্রীঘর দর্শন করলেও এসব কাউন্সিলরা এবারও যে কোন মূল্যে তৃতীয়বারের মতো মাঠে নামবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এমনকি বিএনপি এবার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন এমনকি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে না আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এখন পর্যন্ত। কাউন্সিলর পদে কোন দলীয় প্রতীক না থাকার কারণে বিএনপির রাজনীতি করা অনেকেই ভোল পাল্টে সরকারদলীয় নেতাদের সাথে আতাঁত করে কাউন্সিলরের মসনদে বসার নকশা আকঁছেন। তবে এতে নাখোঁশ সরকারদলীয় নেতারা।

 

তারা বলছেন, যদি বিএনপি রাজনীতিতে না আসে তবে আওয়ামী ত্যাগী প্রার্থীদের এবার নির্বাচনে কাউন্সিলর হওয়ার ব্যাপারটি আরো সহজতর হবে। তবে আওয়ামী লীগের একটি অংশ তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিত্রার্থ করতে বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ অন্য মতের রাজনীতিবিদদের লালনপালন করছে। এতে আওয়ামী লীগের ত্যাগীরা সরকারের এই দীর্ঘসময়েও নানাভাবে বঞ্চিত হয়ে আছেন। এবার সত্যিই যদি বিএনপি নির্বাচনে না আসে তবে হাইব্রিড আওয়ামী লীগারদের শক্তভাবে মোকাবেলা করাই হবে আওয়ামী রাজনীতিতে প্রকৃত বিশ্বাসীদের প্রধান কাজ।



সূত্র জানায়, ২০১১ ও ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২৫নং ওয়ার্ডে বিএনপির রাজনীতিতে বিশ্বাসী এনায়েত হোসেন, ২৪নং ওয়ার্ডে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে বিশ্বাসী আফজাল হোসেন , ২৩নং ওয়ার্ডে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং মাদক মামলায় শ্রীঘর দর্শন করা কাউন্সিলর সাইফুদ্দিন আহমেদ দুলাল প্রধান, ২২নং ওয়ার্ডে সিটি করপোরশেনের প্রথম নির্বাচনে জাতীয় পার্টির যুগ্ম আহবায়ক এবং দ্বিতীয় নির্বাচনে মহানরগ বিএনপির পদে থাকা সুলতান আহমেদ, ২১নং ওয়ার্ডে মহানগর বিএনপির দপ্তর সম্পাদক হান্নান সরকার, ১৯নং ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের ফয়সাল মো. সাগর দ্বিতীয় মেয়াদে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।

 

একমাত্র বাসদ প্রার্থী হিসেবে ১৫নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর অসিত বরণ বিশ্বাস দুই মেয়াদে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ৬২নং উপদেষ্টা এড. তৈমূর আলম খন্দকারের ছোট ভাই মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি এবং একদিন আগে ধর্ষণ মামলার আসামি কাউন্সিলর খোরশেদ ১৩নং ওয়ার্ডে দুইবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। সিটি করপোরেশনের দুই দফার নির্বাচনে টানা দুইবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন মহানগর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক শওকত হাশেম শকু। তিনি ২০০১ সালের ১৬ জুন নগরীর চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বোমা হামলায় ২০ জন খুনের ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত (চার্জশিট) আসামি। জেলহত্যা মামলার আসামি ক্যাপ্টেন কিসমত হাশেমের ছোট ভাই শকু। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিশেষ ক্ষমতা আইনে পুলিশ নাশকতার অভিযোগে কাউন্সিলর শওকতকে গ্রেফতার করে এবং পরবর্তী সময়ে তাঁকে ঢাকায় নিয়ে টিএফআই সেলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। নারায়ণগঞ্জের র‌্যাব ও পুলিশের সন্ত্রাসীর তালিকার প্রথম ১০ জনের মধ্যে ১ জন ছিলেন এই শওকত। অবশ্য তিনি এখন জামিনে আছেন। যদিও শওকত হাশেম শকু বলে আসছেন, তাঁর বিরুদ্ধে যত মামলা হয়েছে তার সবই রাজনৈতিক। সবগুলোতেই তিনি জামিনে আছেন। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি কখনোই অপরাধী নন।

 

যদিও বলা হয়ে থাকে মহানগর যুব লীগের সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন সাজনুকেও পিছপা হতে হয়েছে শুধুমাত্র বিএনপি প্রার্থী শওকত হাশেম শকুর কারণে। ১১নং ওয়ার্ডে বিএনপি ঘেঁষা জমসের আলী ঝন্টুও টানা দুই মেয়াদে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৯নং ওয়ার্ডে বিএনপির ইস্রাফিল প্রধান দুইবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। ৮নং ওয়ার্ডে আওয়ামী রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ক্লীন ইমেজের রুহুল আমিন মোল্লা টানা দুইবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৭নং ওয়ার্ডে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আলী হোসেন আলা দুইবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন।

 

সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরিফুল হক হাসানের বিরদ্ধে মাদক মামলায় ২০১৫ সালের ২৮ মে অভিযোগ গঠন করা হয়। আরিফুল স্থানীয়ভাবে নূর হোসেনের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০১৬ সালের ২৮ এপ্রিল র‌্যাব-১১-এর সদস্যরা আরিফুলসহ ৪ জনকে মাদকসহ গ্রেফতার করেন। পরে আরিফুল হক হাসানসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তাঁকে সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদ থেকে বরখাস্ত করে। নূর হোসেনের কাউন্সিলর পদ শূন্য হওয়ার পর উপনির্বাচনে তাঁর সহযোগী আরিফুল হাসান কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসারও অভিযোগ আছে। তাঁর নামে থাকা দুটি অস্ত্রের লাইসেন্সও জেলা প্রশাসন বাতিল করে। যদিও তিনি সব মামলা থেকে জামিন নিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে ২০১৬ সালে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।

 

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরশন নির্বাচনে ৩নং ওয়ার্ডে টানা দুইবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন শাহজালাল বাদল। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের আহবায়ক শাহজালাল বাদল সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের আপন ভাতিজা। তাঁর বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির ৮টি মামলা এবং যশোরের কোতোয়ালি থানায় ১টি প্রতারণা মামলা রয়েছে। তাঁর নামে থাকা ২টি অস্ত্রের লাইসেন্স জেলা প্রশাসন ২০১৪ সালে বাতিল করেছে। সাত খুনের ঘটনার পর শাহজালাল এলাকা  ছেড়ে পালিয়ে যান। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এলাকায় ফেরত এলে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর নির্বাচনে আবারও কাউন্সিলর নির্বাচিত হন বাদল।

 

সূত্র জানিয়েছে, বারবার নির্বাচিত হয়ে নানা অপকর্মের কারণে বিতর্কিত হয়েছেন অনেক কাউন্সিলর। অপরাধ করেও বারবার ছাড় পেয়ে গিয়ে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করেছেন কয়েক কাউন্সিলর। নানা অপকর্মে বিতর্কিত এসব ব্যক্তিকে তৃতীয় মেয়াদে কাউন্সিলর নির্বাচিত করতে প্রতিটি ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের নতুন করে ভাবনার বিষয়। তবে টানা দুই মেয়াদে নির্বাচিত কাউন্সিলদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি অনেকটা দানে দানে তিন দানের মতো।
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন