নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী। যিনি নগরবাসীর কাছে এক আস্থা ও ভালোবাসার নাম। বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পে বদলে দিচ্ছেন নারায়ণগঞ্জ শহরের চিত্র। তাছাড়া, নারায়ণগঞ্জ’বাসীকে রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নিজ গতিতে চলার সাহসও জুগিয়েছেন এই প্রতিবাদী জনপ্রতিনিধি।
তবে, প্রতিবাদ ও নগরবাসীর জনপ্রিয়তায় একটি মহলের চক্ষুশূল হয়েছেন তিনি। বরাবরের মত এবারও আসন্ন সিটি নির্বাচনে মেয়র আইভীকে ঠেকাতে ওই মহলটি উঠে পড়ে লেগেছেন। কখনো তারা বলছেন মেয়র আইভীকে ভোট না দিতে, আবার কখনো তারা চাইছেন পরিবর্তন। তবে, কোন স্বার্থের জন্য তারা মেয়র ডা. আইভীর পরিবর্তন চাইছেন, সেই প্রশ্ন উঠেছে জনমনে।
ঘটনাসূত্রে জানা গেছে, গত ৩০ আগস্ট সিদ্ধিরগঞ্জে অনুষ্ঠিত শোক দিবসের এক আলোচনা সভায় মেয়র আইভীর পরিবর্তন চেয়ে তাকে আক্রমণ করে বক্তব্য রাখেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমানের অনুসারী মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বাবু চন্দনশীল ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. খোকন সাহা।
এর মধ্যে, চন্দনশীল মেয়র আইভীকে ইঙ্গিত দিয়ে নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘নারায়ণগঞ্জে রব উঠেছে একটা পরিবর্তনের। হাইকমান্ড যদি পরিবর্তনের নির্দেশ দেন সেই নির্দেশ আমরা বাস্তবায়ন করবো। আমরা শামীম ওসমানের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ আছি।’ চন্দনশীল পরিবর্তন বলতে প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের প্রার্থী মেয়র আইভীকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ আগামী নির্বাচনে মেয়র আইভীর পরিবর্তন চান তারা।
অন্যদিকে, খোকন সাহাও পরিবর্তন দাবি করার পাশাপাশি মেয়র আইভীকে ব্যক্তিগত ভাবেও আক্রোমণ করে বক্তব্য রেখেছেন। তিনি মেয়র আইভীর পৈত্রিক সম্পত্তিতে করা নতুন বাড়ি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী এরকম সুন্দর বাড়ীতে থাকার সুযোগ পায় না। উনি সেই বাড়িতে বসবাস করেন। টাকা এলো কোথা থেকে?’ যদিও মেয়র আইভী ইতিপূর্বে জানিয়েছিলেন, তিনি তার কিছু জমি বিক্রি করে পৈত্রিক ভিটায় ওই বাড়ি নির্মান করিয়েছেন। এর আগে, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহীদ বাদলও মেয়র আইভীকে ভোট না দেয়ার জন্য আহবান জানিয়েছিলেন প্রকাশ্যেই।
তবে, মেয়র আইভী ও শামীম ওসমান অনুসারীদের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থাকায় প্রশ্ন উঠেছে, কোন স্বার্থের জন্য মেয়র আইভীর পরিবর্তন কামনা ও বিরোধীতা করছেন তারা? যদিও এই প্রশ্নের উত্তরও নগরবাসীর কাছে অজানা নয়। উত্তর মেরু থেকে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আগামীতে উত্তর মেরুর এই তিন নেতা সিটি করপোরেশনের মেয়র হওয়ার বাসনা দেখছেন বলেই তারা মেয়র আইভীর পরিবর্তন চাইছেন।
ঘটনাসূত্রে জানা যায়, মেয়র আইভী ও সাংসদ শামীম ওসমানে দু’ভাগে বিভক্ত নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি। নারায়ণগঞ্জে তা উত্তর ও দক্ষিন মেরু হিসেবে পরিচিত। দুই মেরুর নেতারা কখনো কখনো নিজেদের উপস্থাপন করেন সাপ-নেউলের চরিত্রে। বিশেষ করে সাংসদ শামীম ওসমানের নেতৃত্বাধীন উত্তর বলয়ের নেতারা মেয়র আইভীর বিরোধীতায় সরব থাকেন সর্বদা। অথচ, উত্তর মেরুর প্রধান শামীম ওসমানও মেয়র আইভীর সাথে নির্বাচনী লড়াইয়ে মাঠে নেমে লক্ষাধীক ভোট ব্যবধানে সোচনীয় ভাবে পরাজয় বরণ করেন। নগরবাসীর দৃশ্যপটে তা আজও অমলীন।
বোদ্ধা মহল বলছেন, আইভীর জনপ্রিয়তার কাছে সাংসদ শামীম ওসমানের পরাজয় বরণের ক্ষত এখনো শুকোয়নি। তাই শামীম ওসমান ও তার অনুসারীরা মেয়র আইভীর প্রতি প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে পড়েছেন। কিন্তু নির্বাচন করে মেয়র আইভীকে পরাজিত করার সমতুল্য জনপ্রিয়তা ও স্বামর্থ শামীম ওসমান এবং তার অনুসারীদের নেই। তাই মেয়র আইভীর মনোয়ন ঠেকাতে তারা ঘাম ঝড়ালেও তা বৃথা গিয়েছে।
নগরবাসী বলছেন, গত নির্বাচনেও একই উদ্দেশ্যে ঘাম ঝড়িয়ে ছিলেন উত্তর মেরুপন্থিরা। তা কাজে আসেনি। উল্টো প্রথম সিটি নির্বাচনে স্বতন্ত্রপ্রার্থী হয়ে শামীম ওসমানকে পরাজিত করা মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর হাতে দ্বিতীয় সিটি নির্বাচনে নৌকা তুলে দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতে শামীম ওসমান ও তার অনুসারীদের হৃদয়ে পূর্বের ক্ষতস্থানে যেন লঙ্কার দহন শুরু হয়। তাই আসন্ন তৃতীয় সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে মেয়র আইভীর বিরোধীতা করে বিভিন্ন ইস্যু তৈরী করলেও এসব ইস্যু নগরবাসীর কাছে পরিস্কার হয়েছে। তবে, মেয়র আইভী আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল পদে থাকায় এবং আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতারাই মেয়র আইভীর বিরুদ্ধাচারণ করায় নারায়ণগঞ্জে দলিয় নেতাকর্মীদের মাঝে সৃষ্ট বিভক্তি আরো প্রকট হচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।


