Logo
Logo
×

রাজনীতি

‘গাঞ্জার নৌকা’ বলে কটাক্ষ করায় সেলিম ওসমানে ক্ষুব্ধ আ’লীগ

Icon

যুগের চিন্তা অনলাইন

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২১, ১০:৫৩ পিএম

‘গাঞ্জার নৌকা’ বলে কটাক্ষ করায় সেলিম ওসমানে ক্ষুব্ধ আ’লীগ
Swapno

# স্বাধীনতা বিরোধীরা তার পাশে মিশে আছে, তাই এগুলো বলছে : আনিসুর রহমান দিপু


# নৌকার আশ্রয়ে জাতীয় পার্টি, জাতীয় পার্টির আশ্রয়ে নৌকা নয় : আব্দুল হাই


# না’গঞ্জে আ’লীগ নেতারা উদাসীন, তাই জাতীয় পার্টির নেতা এমন বক্তব্য দেয় : আরজু ভূইয়া


# ওনার পরিবারে যারা নৌকার রাজনীতি করেন, তারাও কি গাঞ্জা খেয়েছিলো ? : জাহাঙ্গীর আলম


# তিনি এই বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীকে কটাক্ষ এবং সার্বভৌমত্বে আঘাত হেনেছে : আবু সুফিয়ান


 
আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক নৌকা মার্কাকে ‘গাঞ্জার নৌকা’ বলে কটাক্ষ করেছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের জাতীয় পার্টির সাংসদ সেলিম ওসমান। গতকাল বন্দরের নবীগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নবনির্মিত ভবন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তব্যের একপর্যায়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমএ রশিদ এবং সাধারণ সম্পাদক নৌকার প্রার্থী কাজিম উদ্দিন প্রধানকে উদ্দেশ্য করে সেলিম ওসমান বলেছেন, ‘কলাগাছিয়ায় একজন গাঞ্জার নৌকা তাল গাছে উঠাইয়া ফেলতেছেন। কোনো লুটেরাকে চেয়ারম্যান বানিয়ে আপনার লাভ হবে না। গাঞ্জার নৌকা কখনও তাল গাছে উঠবে না।’ আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতিক নিয়ে এমন কটাক্ষ করায় সেলিম ওসমান ও তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা।

 

কেননা, সেলিম ওসমানের বাবা প্রয়াত সামসুজ্জোহা নৌকার প্রতীক নিয়েই সাংসদ হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। সেলিম ওসমানের ছোট ভাই শামীম ওসমান নৌকার প্রতীক নিয়ে তিন তিনবার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। শুধু কী তাই? বিগত সময়ে এই সেলিম ওসমানের মুখেই শোনা গিয়েছিলো নৌকার দল আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জয়গান। সময়ক্রমে সেই সেলিম ওসমানই এবার আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকা মার্কাকে নিয়ে কটাক্ষ করেছেন প্রকাশ্য সভামঞ্চে। তার এমন বক্তব্যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে আওয়ামী লীগ নেতাদের হৃদয়ে। অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, অনেকেই হয়েছেন বিস্মিত। আবার এমন বক্তব্যের পর অনেকেই প্রশ্নের তীর ছুঁড়ছেন সেলিম ওসমানকে নিয়েই।



এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য এড. আনিসুর রহমান রহমান দিপু সেলিম ওসমানের এমন বক্তব্যে বিষ্ময় প্রকাশ করেন এবং বলেন, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। উনি নিজেকে আওয়ামী ঘরনার লোক হিসেবে দাবী করে। উনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নেত্রী নেত্রী বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। আমাদের চেয়েও নেত্রীর প্রতি বেশি শ্রদ্ধা দেখান। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে নেত্রী নৌকা প্রতিক দেয়নি বিধায় তিনি লাঙ্গল মার্কা নিয়ে পাশ করেছেন। আমরা জানি যে, উনি নেত্রীকে পছন্দ করে, শ্রদ্ধা করে। নেত্রীর ও জাতীর জনকের জন্মদিন ঘটা করে পালন করে। এই নৌকাটা কার প্রতীক? নেত্রী যাদের যোগ্য মনে করেছেন, তাদেরকে নৌকা প্রতিক দিয়েছেন। সেখানে সেলিম ওসমানের মত ব্যক্তি নৌকার প্রতীক নিয়ে এমন কথা বলতে পারে, সেটা আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। যেহেতু তিনি নেত্রীর নৌকা প্রতীক নিয়ে সমালোচনা করেছেন, সেহেতু মনে করতে হবে, ‘মুখে শেখ ফরিদ বোগলে ইট!’



তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করতে চাই না যে, সেলিম ওসমানের মত একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা যিনি জাতীর জনকের ডাকে সাড়া দিয়ে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে গিয়েছিলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তিনি নৌকা নিয়ে এমন কটাক্ষ করতে পারে। কারণ, নৌকা মানেই স্বাধীনতা, নৌকা মানেই মুক্তিযুদ্ধ, নৌকা মানেই মুক্তিযোদ্ধা, নৌকা মানেই বঙ্গবন্ধু, নৌকা মানেই শেখ হাসিনা। আসলে ওনার আশেপাশে রাজাকার, আল-বদর ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিরা এমন ভাবে মিশেছে এবং ঘেরাও করে আছে, আমার মনে হয় ওদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মুখ ফঁসকে এই কথা বলে ফেলেছে। এটা ওনার কথা হতে পারে না। রাজাকার আল-বদর অথবা স্বাধীনতা বিরোধী চক্র বন্দর ও নারায়ণগঞ্জে যারা বিভিন্ন সময়ে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে কটাক্ষ করেছে, বঙ্গবন্ধুর পোষ্টার ছিড়েছে, ১৫ই আগস্টের খিচুরির ড্যাগ লাথি মেরে ফেলে দিয়েছে, তারাই এখন ওনার আশেপাশে উপবিষ্ট। আমার মনে হয়, এরাই সেলিম ভাইকে বিভ্রান্ত করে তার মুখ থেকে বাজে বা অশালিন কথা বলিয়েছে।



দিপু আরো বলেন, ‘আমি নিশ্চিত যে, সেলিম ভাই প্রধানমন্ত্রীকে অবজ্ঞা করেন না। তবে, উনি একটি দল করে। তার একটি মার্কা আছে। সামরিক সৈরাচারের দল। সেই দলের মার্কা হচ্ছে লাঙ্গল। এখানে আমাদের কোন আপত্তি নেই। লাঙ্গল যাদের মনোনয়ন দেবে, উনি তাদের পক্ষেই কথা বলবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নৌকা মার্কাকে কটাক্ষ করে উনি যেই কথা বলেছেন, এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। আসলে স্বাধীনতা বিরোধী, দেশ বিরোধী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধীরা তার আশপাশে থাকে বলেই হয়তো তিনি এমনটা বলে ফেলেছেন। কথায় আছে সৎ সঙ্গে সর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। হয়তো সেটাই হচ্ছে।’



নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই দৈনিক যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘আমি তার বক্তব্যটা এখনো শুনিনি। তবে, যদি এমনটা বলেই থাকে, তাহলে এটা আমরা তার কাছ থেকে কখনই প্রত্যাশা করি না। নৌকা মার্কা গাঁজার হয় কিভাবে? নৌকার আশির্বাদ নিয়েইতো আছে জাতীয় পার্টি। জাতীয় পার্টির আশ্রয়ে নৌকা নয়। এমন কথা বলে থাকলে, আমরা সেটা উপরে জানাবো। এটা কোন বক্তব্য হলো? এটা কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য না। আমাদের ছায়ায় তারা পাশ করেছে, এমপি হয়েছে। তাদের ছাঁয়ায় আমরা পাশ করিনি। নৌকা ছাড়া জাতীয় পার্টির লাঙ্গলের ভোট নারায়ণগঞ্জে নেই। তিনি এমন মন্তব্য করে বঙ্গবন্ধুর নৌকাকেই অপমান করলেন। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই।’



নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এড. আসাদুজ্জামান আসাদ দৈনিক যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘সেলিম ওসমানের মত ব্যক্তির কাছ থেকে আমরা এই ধরনের বক্তব্য আশা করিনি। তিনি যেই পরিবারের সন্তান, সেই পরিবারের সন্তান হিসেবে তিনি অন্তত নৌকার বিরুদ্ধে তিনি এমন কথা বলবে, তা আমাদের ধারণার বাইরে। এটা সমুচিন হয়নি। আমি এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’



জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আরজু রহমান ভূইয়া বলেন, ‘যেই জেলায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব আব্দুল হাই ও বাদল সাহেব দেয় এবং মহানগর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব খোকন সাহা দেয়, সেই জেলায় সেলিম ওসমানের মত ব্যক্তি এমন বক্তব্য দিবেই। নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের এমন নেতৃত্বের কারণেই এই বক্তব্য আসছে। নারায়ণগঞ্জ সম্পর্কে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতারা উদাসীন, নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব উদাসীন। তাই নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পার্টির নেতা এই বক্তব্য রাখতে পারছে। বাংলাদেশের অন্যকোথাও এমন বক্তব্য রাখার সাহস জাতীয় পার্টির কেউ দেখায়নি।’



জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম আলম বলেন, ‘গাঞ্জার নৌকা বলতে উনি কি বুঝাতে চাচ্ছেন? এর অর্থ কী গাঞ্জাখোররা এই নৌকার সাপোর্ট করে সেটা বুঝালেন? উনি যদি সেটাই বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে আমার প্রশ্ন থাকবে তার প্রতি যে, ওনার পরিবারে যারা আওয়ামী লীগ করেন এবং নৌকার রাজনীতি করেন, তারা কি গাঞ্জা খেয়েছিলো? ওনার বাবা একজন নৌকার প্রতীক নিয়ে এমএলএ এমপি হয়েছিলেন। ওনার ছোট ভাই শামীম ওসমান নৌকার প্রতীক নিয়ে এমপি হয়েছেন।’  



তিনি আরো বলেন, ‘ওনার পার্টি হচ্ছে যাত্রাপার্টি। সেই যাত্রাপার্টির একজন লোক বলে যে, গাঞ্জার নৌকা। সে কিভাবে নৌকাকে কটাক্ষ করে। এই নৌকা যদি না থাকতো, তাহলে তাদের পরিবারের অস্তিত্ব থাকতো না। নৌকা মার্কার কারণেই তারা আজ প্রতিষ্ঠিত। এই নৌকা মার্কা কার? এটা ৬ দফার নৌকা, নৌকা ১১ দফার নৌকা, নৌকা ৬৬’র ৬ দফার নৌকা, এটা ৫২ সালের নৌকা, এটা ১৯৭০ সালের সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচনের নৌকা, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি এই নৌকা। সেই নৌকাকে নিয়ে যারা কটাক্ষ করে, তাদেরকে আমরা মনেপ্রাণে ঘৃণা করি। তাদের মুখে থুথু ফেলি। এই নৌকার কারণেই তাদের পরিবার আজকে ঢর্নাঢ্য। সেই নৌকাকে নিয়েই আজ তিনি কটাক্ষ করে। আমারতো মনে হয়, উনি নিজেই গাঞ্জা সেবন করে এমন কথা বলেছে।’  



জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সুফিয়ান দৈনিক যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘নৌকার বিরোধীতা করা বা নৌকাকে কটাক্ষ করার এমন ইতিহাস ওসমান পরিবারের আছে। নাজমা আপা যখন নির্বাচন করেন, তখন নাজমা আপার ব্যালট পেপার ছিনতাই হয় এই পরিবারের মাধ্যমেই। এই পরিবারের মাধ্যমেই চাষাঢ়া গোলচত্ত্বর থেকে নৌকা নামিয়ে লাঙ্গল তোলা হয়েছে। অতএব তাদের মাধ্যমে এই ধরনের বক্তব্য অস্বাভাবিক কিছুই না। আর সেলিম ওসমান নৌকা প্রতীক নিয়ে যেই বক্তব্য দিয়েছেন, এটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অবমাননা করা হয়েছে। স্বাধীনতার সার্বভৌমত্বে তিনি আঘাত হেনেছেন। কারণ, নৌকা মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক, নৌকা স্বাধীনতার প্রতীক এবং সর্বপরি নৌকা প্রতীক যিনিই পাক না কেন তাকে সেই প্রতীকটা বরাদ্ধ দিয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উনি তার বক্তব্যের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে কটাক্ষ করেছেন, অপমান করেছেন। আমি তার এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। পাশাপাশি অতিসত্বর তাকে আওয়ামী লীগ এবং জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহবান জানাই।’



জানতে চাইলে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এড. খোকন সাহা দৈনিক যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘সেলিম ওসমান ভাই নৌকা মার্কাকে নিয়ে এমন কথা বলেছে কিনা, তা আমি এখনো শুনিনি।’
 
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন