# প্রথম দেখায় তৈমূর পান ৭ হাজার, আইভী পান পৌঁনে ২ লাখ ভোট
# তৈমূর খুঁটি খুঁজে বেড়াচ্ছে, আইভী ঐক্যের চেষ্টা চালাচ্ছেন
# দশবছর পর দলের সাথে খুনসুঁটি তৈমূরের
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিরুদ্ধে কোন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় অনেকটা একপেশে নির্বাচনের দিকেই এগুচ্ছিল। কেননা বিএনপি শুধু নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নয়, সারা দেশের স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলো থেকেই নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে। আগের সিদ্ধান্ত অটুট রাখতে শুধু নাসিক নির্বাচনে বিকল্প চিন্তা করার কোন সুযোগ ছিলনা বিএনপির। হয়েছেও তাই। বিএনপি নির্বাচনে কোন প্রার্থী দেয়নি। তবে বিএনপি না এলেও বিএনপির কয়েকনেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র কেনায় অনেকেই ভেবেছিল বিএনপি হয়তো নির্বাচনে আসবে। কিন্তু তা আর নয়, বিএনপি নেতা সাবেক সাংসদ গিয়াসউদ্দিন, গত সিটি নির্বাচনের বিএনপির প্রার্থী এড.সাখাওয়াত হোসেন খান, মহানগর বিএনপি নেতা এটিএম কামাল শেষ অবধি নিজেদের নির্বাচন থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। তারা প্রত্যেকেই দাবি করেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোন সিগন্যাল মেলেনি। তবে বিএনপির হাইকমান্ড সিগন্যাল দিবে এমন দাবি করে নির্বাচনে স্বতন্ত্র্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলা বিএনপির আহবায়ক ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এড. তৈমূর আলম খন্দকার। কিন্তু বিএনপি নেতারা তৈমূরের কথাকে পাত্তা দিচ্ছেননা। গত সিটি নির্বাচনে বিএনপির হয়ে অংশগ্রহণ করা প্রার্থী এড.সাখাওয়াত হোসেন খান দাবি করে বলেছেন, ‘বিএনপির হাইকমান্ড এবং নীতিনির্ধারকরা তাকে জানিয়েছেন, এই নির্বাচনে বিএনপির কোন প্রার্থী থাকছেনা। যদি প্রার্থী দেয়া হত, তবে তাকেই প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়া হত।’
এদিকে স্বতন্ত্র হিসেবে প্রার্থী হওয়া তৈমূর আলম খন্দকার বিএনপির বিষয়টি পরিষ্কার করতে পারছেননা, তিনি সেটি সময়ের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি প্রচারণায় নেমে বলেছেন, সময় হলে দেখতে পাবেন। আবার অপরদিকে তিনি বলছেন, এবারের সিটি নির্বাচনে তিনি জনগণের চাপের কারণেই প্রার্থী হয়েছেন। তার সাথে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ সকলেই আছেন। তিনি নির্বাচনে সিটি করপোরেশনের আগামী ১০০ বছরের প্ল্যান উপস্থাপন করে নির্বাচনী নানা প্রতিশ্রুতি দেয়া শুরু করেছেন। নির্বাচনে ট্যাক্স কমানো, ফুটপাতে হকার বসানোসহ নানা ধরণের প্রতিশ্রতি দিচ্ছেন তৈমূর। তবে বিএনপির একটি অংশ এবং সমালোচকদের দাবি, আইভীকে পছন্দ করেননা এমন একটি পক্ষের ইন্ধনে দলের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন তৈমূর। তবে তৈমূর এখন পর্যন্ত এবিষয়ে কোন মন্তব্য করেননি। তিনি এর উত্তরটি ‘সময়ের উপরে ছেড়ে দিয়েছেন’।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিএনপি নেতা তৈমূর নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর উপর চাপ বেড়েছে। তার অনুগত একনিষ্ঠ নেতাকর্মীরা প্রচারণায় বলছেন, নির্বাচন সহজ মনে করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। সবাইকে সিরিয়াসলি নির্বাচনে আইভীর পক্ষে নামার জন্য তার অনুগতকর্মীদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। এদিকে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমও এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি এক সভায় বলেছেন, নির্বাচনকে মোটেই সহজভাবে নেয়া যাবেনা। নির্বাচন কঠিন হবে। নির্বাচনকে ঠিকভাবে আমলে নিয়েই প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামতে হবে।
রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, গত ৩ ডিসেম্বর ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার পর অনেকেই ধারণা করছিলেন এবার অনেক সহজভাবেই টানা তৃতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হবেন ডা.আইভী। কিন্তু সেটি যে অতো সহজে হচ্ছেনা তা মোটামোটি পরিষ্কার হয়ে গেছে। কারো ইন্ধনে হোক, আর নির্বাচনে দাঁড়ানোর বাসনাই হোক তৈমূর আলম খন্দকার এবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবরের নির্বাচনেও মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে লড়েছিলেন তৈমূর আলম খন্দকার। দলীয় প্রতীক না থাকলেও তৈমূর আলম খন্দকার বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। নির্বাচনে আনারস প্রতীকে তৈমূর আলম খন্দকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শুরুর মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে বিএনপির হাইকমান্ডের নির্দেশে মাঝরাতে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান তৈমূর। ফলাফলে আনারস প্রতীকে তৈমূর পেয়েছিলন ৭ হাজার ভোট। এদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও দোয়াত কলম প্রতীকে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ১ লাখ ৮০ হাজার ৪৮ ভোট পেয়ে প্রথমবারের মতো মেয়র নির্বাচিত হন আইভী। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী শামীম ওসমান দেয়াল ঘড়ি প্রতীকে ৭৬ হাজার ৭০৫ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন। ওই নির্বাচনে শামীম ওসমানের সাথে আইভীর ভোট ব্যবধান ছিল ১ লাখ ১ হাজার ৩৪৩ ভোট।
রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, ২০১১ সালের নির্বাচনে তৈমূর ভোট গ্রহণের আগে সরে গিয়ে বলেছিলেন, দল তাকে কোরবানি দিয়ে দিয়েছে। এর ঠিক দশবছর পর ২০২১ সালে দল নির্বাচনে না এলেও প্রার্থী হয়েছেন তৈমূর। অনেকে মজা করে বললেন, এবার জিততে না পারলে তৈমূর হয়তো বলবে, আমি নিজেই কোরবানি হয়েছি। তৈমূরের এবারের নির্বাচনকে তার দলের সাথে খুনসুঁটি বলে মনে করছেন অনেকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর হওয়ার কারণেই আইভী বলয়সহ আওয়ামী লীগে আলাদা গরজ তৈরি হয়েছে। নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য আলাদা চিন্তা করার আভাস মিলেছে। তৈমূর শেষ অবধি নির্বাচনে টিকে থাকতে পারলে মেয়র পদে জমজমাট একটি নির্বাচন পেতে পারে নগরবাসী। উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া একটিকে যেমন আইভীর ভিশন, তেমনি তৈমূর আলম খন্দকারের আগামী ১০০ বছরের সিটি মাস্টাপ্ল্যানের স্বপ্ন কোনটিকে মানুষ আমলে নেয় সেটিই এখন দেখার বিষয়।


