সিংহপুরুষের ডিমোশন, অগ্নিকন্যার প্রমোশন
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২১, ০৩:৫৫ পিএম
# নারায়ণগঞ্জে এসে হতবাক কেন্দ্রীয় নেতারা
# আইভীও উন্নয়নেও প্রথম, সংগঠক হিসেবেও প্রথম
# গুরুত্ব বেড়েছে আইভীর, আওয়ামী লীগের নতুন মাত্রা
১৯৯৬ সালে এমপি হিসেবে শামীম ওসমান যখন দায়িত্ব নেন সারাদেশে তখন তার জয়জয়কার। তার হাত ধরে বহু আওয়ামী লীগ নেতা বড় নেতা হয়েছেন। ঝাঁকে ঝাঁকে লোক থাকায় শামীম ওসমানকে কর্মীবাহিনী তৈরির মেশিন বলা হত। সময় যত গড়িয়েছে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে তার কর্মীদের জড়িয়ে পড়া শামীম ওসমানকে বিতর্কিত করেছে।
অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নারায়ণগঞ্জের সিংহপুরুষ হিসেবে খ্যাত শামীম ওসমান পত্রিকার পাতায় শিরোনাম হতে শুরু করেন। আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে বিদেশে অবস্থান করেন তিনি ও তার সমর্থকরা। এরপর দেশে ফিরে নির্বাচনটুকুও করতে পারেননি ২০০৮ সালে। তার জায়গায় শুন্যতা পূরণ করেন প্রয়াত এমপি সারাহ বেগম কবরী। দেশে যখন ফিরেন তখন জনপ্রতিনিধির কোন দায়িত্ব নেয়ার অবস্থার কোন সুযোগ ছিলনা তার। সুযোগ আসে ২০১১ সালে।
এমপি হিসেবে নয়, নবগঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র হওয়ার হাতছানি তার কাছে। কিন্তু সময় গড়িয়েছে, প্রকৃতি শুন্যতা পছন্দ করেনা। আপন গতিতে যোগ্য ব্যক্তি দিয়েই পূরণ করে নেয়। একসময় নারায়ণগঞ্জে শামীম ওসমান মানেই ছিল হার না মানা নেতা। কিন্তু সেটি যে নিছক কল্পনা তা মানুষ বুঝতে পারে ২০১১ সালে। একদিকে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা শামসুজ্জোহার ছেলে প্রতিষ্ঠিত নেতা শামীম ওসমান। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন আওয়ামী লীগ নেতা পৌরপিতা আলী আহাম্মদ চুনকার মেয়ে। আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে যে সারাদেশে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
কেউ যা ভাবতে পারেনি তাই করে দেখিয়েছে আলী আহাম্মদ চুনকার মেয়ে আইভী। ১ লাখ ভোটের ব্যবধানে নির্বাচনে হারিয়ে দেন সিংহপুরুষ শামীম ওসমানকে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ডাক্তার গৃহবধূ থেকে অগ্নিকন্যাতে পরিণত হয়েছেন এই আইভী। ত্বকী-চঞ্চল-বুলু থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জে সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে অনেকের রক্তচক্ষুশূলে পরিণত হন আইভী।
তবে জনপ্রিয়তাও বাড়তে থাকে আইভীর। শামীম ওসমান এমপি হিসেবে ক্ষমতায় আসেন ২০১৪ সালে। তবে আগের সেই দাপট তার ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ে। শামীম ওসমানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হন মেয়র আইভী। সাধারণ মানুষ তো বটেই আওয়ামী লীগের তৃণমূলকেও দারণভাবে আকর্ষণ করেন আইভী। কিন্তু তখনও দলের কোন পদে তিনি ছিলেননা। সময়টা ২০১৬। ২০১১ সালে আইভীর কাছে শামীম ওসমানের হারের ক্ষতটা তখনো শুকোয়নি। আইভীকে থামানোর জন্য উঠে পড়ে লেগে পড়েন শামীম ওসমান। তবে আইভীর কর্মকান্ড আর সত্য বলার সাহস যেভাবে তৃণমূলকে স্পর্শ করেছিল ঠিক তেমনি স্নেহভাজন হয়ে উঠেছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে। আর তিনি আইভীর অভাবটা বুঝতে পেরে সিটি নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়ার আগে জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি হিসেবে আইভীকে দায়িত্ব দেন। নিরাশ করেনননি এবারও।
বিপুল ভোটে বিএনপির সাখাওয়াত হোসেন খানকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন দ্বিতীয়বারের মতো। এদিকে জেলায় আইভীর কী পরিমাণ জনপ্রিয়তা বেড়েছে তা কেউ ঠাওর করতে পারেনি। যেটি বুঝতে পেরেছে তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হওয়ার পর। ২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি নির্বাচনের জন্য আইভীকে নৌকার প্রার্থী করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরআগে পুরো বছর ধরে আইভীর কঠোর সমালোচনা ও কুৎসা রটনা করে শামীম সমর্থকরা। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভানেত্রী সেসবে কর্ণপাত করেননি। আইভীকে মনোনয়ন দিয়ে তার পক্ষে কাজ করার জন্য কঠোরভাবে নির্দেশ দেন তিনি।
শেখ হাসিনার কথায় তাল মেলান কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা বলা শুরু করেন, দলের জন্য শেখ হাসিনা ছাড়া আর কেউ অপরিহার্য নয়। তার অর্থ দাঁড়ায় হয় আইভীর পক্ষে কাজ কর, বিপক্ষে গেলে ছাড় পাবেনা। তবে শামীম ওসমানও নাছোড় বান্দা। কিন্তু ঢাকায় যৌথসভায় যোগ দেননি। কেন্দ্রীয় নেতারাও সেসব আমলে নেয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আইভীর পক্ষে তারা নারায়ণগঞ্জে আসেন। জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ সকল বিভেদ-দ্বন্দ্ব ভুলে আইভীর হয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন। ২৪ ডিসেম্বর শেখ রাসেল পার্কে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের বিজয় সমাবেশে কেন্দ্রীয় নেতারা এসে হতবাক। এতোদিন তারা জানত, আইভী শুধু উন্নয়নের কারিগর। কিন্তু তারা এসে দেখল, পুরো শেখ রাসেল পার্ক আওযামী লীগের ত্যাগী কর্মীতে ঠাসা।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্যসহ সব কেন্দ্রীয় নেতা শুধু আইভী বন্দনাই করে গেলেন। এমনকি বলেও ফেললেন, শুনলাম কী আর এসে দেখলাম কী? এছাড়া অনেক কেন্দ্রীয় নেতা আইভীকে নারায়ণগঞ্জের চন্দ্র-সূর্য্য হিসেবে আখ্যা দিয়ে গেলেন। কবিতার ঢংয়ে বলে গেলেন, আইভী হল নারায়ণগঞ্জে সমুদ্রের মোহনা। এই সভায় যোগ দেননি শামীম ওসমানসহ তার অনুসারী গুটিকয়েক নেতা।
উপস্থিত থাকলে হয়তো তাদের কেন্দ্রীয় নেতাদের আইভী বন্দনায় স্থির থাকতে পারার কথা নয় বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সিটি নির্বাচনের আগে আইভীর পক্ষে নেতাকর্মীদের এই উচ্ছ্বাস আর কেন্দ্রীয় নেতাদের বাধভাঙা প্রশংসা আইভীর সামনের নেতৃত্ব যে আরো কয়েকগুন শক্তিশালী করবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শুক্রবারের বিজয় সমাবেশ যেন এক সিংহপুরুষের ডিমোশন আর এক অগ্নিকন্যার প্রমোশন।
তারা এটিও বলছেন, নারায়ণগঞ্জে এসেও কেন্দ্রীয় নেতারা স্পষ্ট করে বলে গেলেন, কেউ অপরিহার্য নয়। তার মানে আইভীর পক্ষেই কাজ করতে হবে, এর কোন বিকল্প নেই। আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা যেমন দয়ালু তেমনি কঠোরহতেও জানে। সম্প্রতি এক প্রতিমন্ত্রী এবং এক মেয়রকে ছেঁটে ফেলে তিনি সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ ও নজির স্থাপন করেছেন। এরআগে অনেক বিতর্কিত মন্ত্রী, যুব লীগ নেতা, ছাত্র লীগ নেতাকে ছেঁটে ফেলতেও তিনি কার্পণ্য করেননি। রাজনৈতিক মহল বলছে, আওয়াম লীগের যারা এখনো আইভীর নেতৃত্ব মেনে নিতে পারছেননা, তাদের হাতে পরোক্ষভাবে একটি অপশনই দিয়ে দেয়া হয়েছে। আর তা হলো আইভীর পক্ষেই কাজ কর, নচেৎ বড় কোন সিদ্ধান্ত নিতে কঠিন হবেনা।
বিজয় সমাবেশের প্রধান অতিথি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য ও নাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহবায়ক এড. জাহাঙ্গীর কবির নানক অনুপুস্থিত আওয়ামী লীগের একাংশের নেতাদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘কোন উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে পা দেবেননা। আবারও বলি, আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। আমি, আবদুর রহমান, বাহাউদ্দিন নাসিম অপরিহার্য বিষয় নয়। অপরিহার্য হল শেখ হাসিনা, অপরিহার্য হল দল।দলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, তবে সেটি যেন প্রতিহিংসায় পরিণত না হয়।’
বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেন, ‘শুনলাম কি আর এসে দেখলাম কি। এই যে মিছিল পদ্মার স্রোতের মতো আসতাছে, পদ্মার স্রত সাগর হয়ে গেছে। নাম নাম বলেন আইভী আইভী। এই দিনের বেলা সূর্য্য উঠে পৃথিবীকে আলোকিত করে না, আর রাতে যে চাঁদ উঠে অন্ধকারকে কি আলোকিত করে না। আইভী হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের সেই চাঁদ, চাঁদ। ১৬ জানুয়ারি মানে বিজয় বিজয় বিজয়। আইভীর বিজয়, শেখ হাসিনার বিজয়, নৌকার বিজয়।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের সিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে অগ্নিকন্যা আইভীর নতুন পথ চলা হবে। তার সাথে সাথে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও আরো প্রাণোচ্ছ্বলভাবে সংগঠনে মত দেবে। আইভী যে দারুণ সংগঠক তার প্রমাণ শুক্রবারের বিজয় সমাবেশ। তারা বলছেন, নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের ইতিহাসে এতো সুশৃঙ্খল কর্মীবান্ধব সমাবেশ এরআগে অনুষ্ঠিত হয়নি। এতোটা সুশৃঙ্খল বলার কারণ, প্রায় অর্ধালক্ষাধিক মানুষ শেখ রাসেল পার্কে সমাবেশে অংশগ্রহণ করলেও কেউ একটি গাছের পাতাও ছিঁড়েনি।


