দলীয় বড় নেতারা তাদের বক্তব্যে বলে থাকেন নেতার চেয়ে দল বড় এবং দলের চেয়ে রাষ্ট্র বড়। দীর্ঘ কর্য়েক যুগ ধরে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতে একচেটিয়া শাসন এবং শোষণ করে যাচ্ছে একটি প্রভাবশালী মহল। যাদেরকে গডফাদার, ভন্ডামী, বিশ্ববেহায়াসহ বিভিন্ন উপাদিতে আখ্যায়িত করেছে নগরের রাজনৈতিক বোদ্ধামহল। এই প্রভাবশালি মহল নিজেদের বলয় দিয়ে জেলার ব্যবসয়ী সংগঠন থেকে শুরু করে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের টেন্ডার পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করেন।
সেই সাথে শহরের পরিবহন সেক্টরের চাদাঁবাজি, নগরীর বিভিন্ন স্টান্ডে চাদাঁবাজির সিংহভাগের একটি অংশ পর্যন্ত তাদের পকেটে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতো কিছুর পরেও তাদের সকল অপকর্মের বিরুদ্ধে নাসিক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ছাড়া দুই একজন ব্যতিত তেমন কেউ কোন রাও করেন না। তাই নাসিক নির্বাচনের পরে এই প্রভাবশালি মহলের দাপট অনেকাট কমে এসেছে মনে করেন সচেতন মহল। সেই সাথে তারাও নিজেদের পতন বুঝতে পেরে নীরব হয়ে আছে। তাই এবার শহরময় আলোচনা হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ব্যক্তি কেন্দ্রিক প্রভাব রোধ করার জন্য এবার দলে নতুন নেতৃত্ব তৈরীর মাধ্যমে দলীয় কেন্দ্রিক করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানাযায়, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকার দলীয় নৌকার প্রার্থী ও নাসিক হ্যাট্রিক মেয়র নির্বাচিত আইভীকে হারানোর জন্য খোদ নিজ দলীয় একটি অংশ ওসমান বলয় প্রভাব বিস্তার করেও ব্যর্থ হন। তাকে হারানোর জন্য বিএনপি থেকে তারা তৈমূরকে প্রার্থীতা বানান বলেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও তা এক সভায় অস্বীকার করে মন্তব্য করেছেন সাংসদ শামীম ওসমান। কিন্তু নগরবাসি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহল তা মানতে নারাজ। নাসিক নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বরত কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের সভামন্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক শামীম ওসমানকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, দলের হয়ে দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কলছেন আগামীতে আমি বেঁচে থাকতে নৌকা পাবেন না। গত কয়েকদিন আগে এক কর্মী সভায় শামীম ওসমান বলেছেন আমি শেখ হাসিনা ছাড়া কাউকে গোনায় ধরি না। অথচ শামীম ওসমান তার বক্তব্যে একাধিকবার বলেছেন নারায়ণগঞ্জের ছোট একটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কেন্দ্রী আওয়ামীলীগের বাঘা বাঘা নেতারা এসে কাজ করছেন। তাদের আমি আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেছি।
তার এই বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা সমালোচনা তৈরী হয়েছে। সেই সাথেই রাজনীতিবিদরা প্রশ্ন ছুঁড়ে বলেন, শামীম ওসমান কি দলের চেয়ে বড় কিছু হয়ে গেলেন যা তার বক্তব্যে বুঝাতে চেয়েছেন। একটা দল চেইন অফ কমান্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই সাংসদ সেই দলের প্রতীক নৌকা পেয়ে এমপি হয়েছেন। অথচ দলের যোগ্য নেতাদের গোনায় ধরেন না। তাহলে তিনি দলের কি এমন ব্যক্তি হয়ে গেলেন যার জন্য কাউকে গণায় ধরেন না তা জানতে চান ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতারা।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জেলা আওয়ামীলীগের অবস্থা ভালো ভাবে পর্যালোচনা করে গেলেন নির্বাচন পরিচলনার দায়িত্বরত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি। তারা নারায়ণগঞ্জে এসে থাকার মাধ্যমে অনেক কিছু জেনে গেছেন। যা আগে জানত না। অভিযোগ রয়েছে নাসিক নির্বাচনের প্রভাবশালী ওসমান মহল দলীয় নির্দেশনাকে অবজ্ঞা করে নৌকার পক্ষে কাজ করেন নাই। আর এজন্য জেলা আওয়ামীলীগের অঙ্গ সংগঠনের কয়েকটি কমিটি পর্যন্ত বিলুপ্ত করা হয়। তৃণমূল পর্যায় থেকে অভিযোগ রয়েছে ওসমান বলয়ের মহলটি তাদের নির্দেশনা না পাওয়ায় তারা নৌকার পক্ষে প্রচারনায় নামেন নাই। উল্টো ওসমান অনুসারীদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে হাতির পক্ষে ভোট চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে পর্যন্ত প্রকাশ হয়। প্রধানমন্ত্রী মনোনীত নৌকার নাসিক নির্বাচনে নৌকার বিজয়ী প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী অভিযোগ করে বলেছেন হাতী মার্কার তৈমূর আলম ওসমানদের প্রার্থী। যা জাতীয় পার্টির জনপ্রতিনিধিরা হাতীর প্রচারণায় সরাসির নামার মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
স্থানীয় একাধিক নেতা জানান, নারায়ণগঞ্জে নাসিক নির্বাচনের পর এবার ক্ষমতাসীন দলকে ঢেলে সাজানোর জন্য কাজ করছে কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগ। সরকার দলীয় স্থানীয় নেতাদের থেকে অভিযোগ উঠেছে দীর্ঘদিন যাবৎ আওয়ামীলীগের অঙ্গ সংগঠনের নেতৃত্বে একচেটিয়াভাবে নিজেদের অনুগত ব্যক্তিদের পদ পদবী দিয়ে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন ওসমান পরিবার।তাদের অনুগত ব্যক্তিরা এমপি শামীম ওসমান ও সাংসদ সেলিম ওসমানের নিদের্শের বাহিরে যান না বলে অভিযোগ রয়েছে। এই তালিকায় রয়েছেন, শামীম ওসমানের প্রধান খলিফা হিসেবে পরিচিত মহানগর আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম।
এই সাংসদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত মো. শহীদ বাদল। মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক এড. খোকন সাহা, সহ সভাপতি বাবু চন্দ শীল, সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল, ও মহানগর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন সাজনু, মহানগর স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাবেক সভাপতি জুয়েল হোসেন, বাংলাদেশ নিটিং ওনার্স এসোশিয়নের সভাপতি মাহবুবুর রহমান স্বপন। ফতুল্লা থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি এম সাউফ উল্লাহ বাদল, সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী, নারায়ণগঞ্জ সদর থানা আওয়ামীলীগের সাবেক সেক্রেটারি আল মামুন।
এছাড়া জেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাবেক সেক্রেটারি গোলাম কিবরিয়া খোকন, মহানগর স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাবেক সেক্রেটারি সাইফ উদ্দিন প্রধান দুলাল, বন্দর উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি এম এ রশিদ, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি মজিবুর রহমান, শহর শ্রমিকলীগের সাবেক সেক্রেটারি কামরুল হাসান মুন্না, জেলা শ্রমিকলীগের আহবায়ক আবদুল কাদির, সদস্য সচিব কামাল হোসেন, মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান রিয়াদ, সেক্রেটারি হসানাত রহমান বিন্দু, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আজিজুর রহমান আজিজ, সেক্রেটারি আশরাফুল ইসলাম রাফেল। ক্ষমতাসীন দলের একটি অংশ অভিযোগ করে বলেন, তারা প্রত্যেকেই ওসমান পরিবারের অনুসারী। তারা দলের চেয়ে ওসমানদের প্রাধান্য দেন। এই প্রভাবশালি নেতা শামীম ওসমানকে তাদের গুরু হিসেবে মানেন। এবং বিভিন্ন সভায় তাদের বক্তৃতায় তা বলেন।
রাজনৈতিক বোদ্ধা মহলের মতে, আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামীলীগকে শক্তিশালী করতে হলে দলকে ব্যক্তি কেন্দ্রিক নেতৃত্ব থেকে সরাতে হবে। সেই সাথে তৃণমূল পর্যায়ের যোগ্য ব্যক্তিদের নেতৃত্বের মাধ্যমে দলকে গোছাতে হবে। সেই সাথে তৃণমূল পর্যায়ে দলকে শক্তিশালি করতে হবে। সর্বোপরি নারায়ণগঞ্জে ক্ষমতাসীন দলকে সুসংগঠিত করতে হবে।


